ডিমকে স্বাস্থ্যকর ও সহজলভ্য প্রোটিনের অন্যতম উৎস হিসেবে ধরা হয়। ওজন কমানো বা পেশি গঠনের লক্ষ্যে অনেকেই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় ডিম রাখেন। তবে কোনটি বেশি উপকারী—পুরো ডিম নাকি শুধু ডিমের সাদা অংশ—এ নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে।
অনেকের ধারণা, ডিমের কুসুমে ফ্যাট ও কোলেস্টেরল থাকায় ওজন কমানোর সময় তা এড়িয়ে চলা উচিত। আবার কারও কারও মতে, কুসুমের পুষ্টিগুণের কারণে পুরো ডিমই ভালো। আসলে কোনটি কার্যকর, তা নির্ভর করে ব্যক্তির লক্ষ্য, মোট ক্যালোরি গ্রহণ এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসের ওপর।
ডিমের সাদা অংশে কী থাকে?
ডিমের সাদা অংশে ভালো পরিমাণে প্রোটিন থাকে। একটি বড় ডিমের সাদা অংশে প্রায় ৩.৬ গ্রাম প্রোটিন এবং মাত্র ১৮ ক্যালোরি থাকে। এতে ফ্যাট ও কোলেস্টেরলের পরিমাণও খুব কম। তাই কম ক্যালোরিতে প্রোটিন পেতে চাইলে সাদা অংশ কার্যকর।
বিশেষ করে যারা ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ করে ওজন কমানোর চেষ্টা করছেন, তাদের জন্য সাদা অংশ সুবিধাজনক হতে পারে। কারণ একই পরিমাণ খাবারে প্রোটিন মিললেও ক্যালোরি ও ফ্যাট তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
তবে শুধু সাদা অংশ খেলে কুসুমের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি থেকে বঞ্চিত হতে হয়।
কুসুমে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি
ডিমের কুসুমে শুধু ফ্যাট ও কোলেস্টেরলই থাকে না। এতে ভিটামিন এ, ডি, বি১২, কোলিন, সেলেনিয়াম এবং চোখের জন্য উপকারী লুটেইন ও জিয়াজ্যান্থিনের মতো উপাদান রয়েছে। পুরো ডিমে উচ্চমানের প্রোটিনের পাশাপাশি বিভিন্ন ভিটামিন ও খনিজ পাওয়া যায়।
তাই শুধু প্রোটিনের জন্য ডিম খেলে সাদা অংশ সুবিধাজনক হলেও সামগ্রিক পুষ্টির বিবেচনায় কুসুমেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
ওজন কমাতে কোনটি?
ওজন কমানোর ক্ষেত্রে একক কোনো খাবারকে দায়ী বা কৃতিত্ব দেওয়া ঠিক নয়। দিনের মোট ক্যালোরি গ্রহণ, শারীরিক পরিশ্রম, ঘুম এবং সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসই এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কম ক্যালোরিতে বেশি প্রোটিন নেওয়াই যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে ডিমের সাদা অংশ কিছুটা সুবিধা দিতে পারে। কারণ এতে ক্যালোরি ও ফ্যাট কম, অথচ প্রোটিন থাকে।
অন্যদিকে, পুরো ডিম খেয়েও স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন কমানো সম্ভব। একটি বড় ডিমে প্রায় ৭০ ক্যালোরি এবং প্রায় ৬ গ্রাম প্রোটিন থাকে। তাই কুসুমে কোলেস্টেরল আছে বলে ওজন কমানোর সময় পুরো ডিম বাদ দেওয়ার কোনো সার্বজনীন নিয়ম নেই।
পেশি গঠনে কোনটি?
পেশি তৈরির জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিনের পাশাপাশি নিয়মিত রেজিস্ট্যান্স বা শক্তিবর্ধক ব্যায়াম প্রয়োজন। শুধু বেশি ডিম খেলেই পেশি তৈরি হবে না।
ডিমের সাদা অংশে প্রোটিনের ঘনত্ব বেশি থাকায় এটি পেশি গঠনের খাদ্যতালিকায় সহজেই রাখা যায়। তবে পুরো ডিমও উচ্চমানের প্রোটিনের ভালো উৎস এবং এতে কুসুমের অতিরিক্ত পুষ্টি পাওয়া যায়।
বিভিন্ন গবেষণার মধ্যে একটিতে ব্যায়ামের পর পুরো ডিম খেলে পেশি তৈরির প্রক্রিয়ায় বাড়তি সুবিধার ইঙ্গিত মিলেছিল। আবার আরেকটি ১২ সপ্তাহের গবেষণায় পুরো ডিম ও শুধু সাদা অংশ খাওয়ার ক্ষেত্রে পেশি বৃদ্ধির ফলাফলে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি। তাই পেশি তৈরির জন্য কুসুম বাদ দেওয়া বাধ্যতামূলক—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।
তাহলে কী করবেন?
এটি মূলত খাদ্যাভ্যাস ও লক্ষ্যের ওপর নির্ভর করে।
যদি প্রধান লক্ষ্য কম ক্যালোরিতে বেশি প্রোটিন নেওয়া হয়, তাহলে ডিমের সাদা অংশ বেশি উপযোগী হতে পারে। অন্যদিকে, সামগ্রিক পুষ্টি গ্রহণকে গুরুত্ব দিলে এবং খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত ক্যালোরির সমস্যা না থাকলে পুরো ডিমও রাখা যেতে পারে।
অনেকের ক্ষেত্রে দুই ধরনের ডিম একসঙ্গে খাওয়াও বাস্তবসম্মত। যেমন, কয়েকটি ডিমের মধ্যে কিছু পুরো ডিম এবং কিছু শুধু সাদা অংশ রাখা যায়। এতে কুসুমের পুষ্টি পাওয়া যায়, আবার মোট ক্যালোরিও নিয়ন্ত্রণে থাকে।
ডিমের পাশাপাশি আরও কী?
ওজন কমানো বা পেশি গঠনের জন্য শুধু ডিমের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়। খাদ্যতালিকায় ডাল, মাছ, মাংস, দুধ, টক দই, বাদাম ও বীজের মতো অন্যান্য প্রোটিনের উৎসও রাখা দরকার। পাশাপাশি শাকসবজি, ফল, স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট এবং প্রয়োজনীয় ফ্যাটও থাকা উচিত।
প্রোটিনের প্রয়োজন ব্যক্তিভেদে আলাদা হয়। বয়স, শরীরের ওজন, শারীরিক পরিশ্রম, ব্যায়ামের ধরন এবং স্বাস্থ্যের অবস্থার ওপর তা নির্ভর করে।
কোলেস্টেরল নিয়ে ভয় কতটা?
ডিমের কুসুমে কোলেস্টেরল থাকে। তবে বর্তমানে পুষ্টিবিজ্ঞানে শুধু খাবার থেকে পাওয়া কোলেস্টেরলকে হৃদ্রোগের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হয় না। মোট খাদ্যাভ্যাসে স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণও গুরুত্বপূর্ণ। অধিকাংশ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে পরিমিত ডিম খাওয়া স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।
তবে যাদের উচ্চ কোলেস্টেরল, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ডিমের পরিমাণ ব্যক্তিগতভাবে ঠিক করা প্রয়োজন হতে পারে।
ওজন কমানোর জন্য শুধু সাদা অংশ আর পেশি গঠনের জন্য শুধু পুরো ডিম—এমন কোনো বাধ্যতামূলক নিয়ম নেই। ডিমের সাদা অংশ কম ক্যালোরিতে প্রোটিন দেয়, আর কুসুম যোগ করে গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন, খনিজ, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও অন্যান্য পুষ্টি।
তাই লক্ষ্য যদি ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাহলে সাদা অংশ বাড়ানো যেতে পারে। আর সামগ্রিক পুষ্টির কথা বিবেচনা করলে পুরো ডিমও খাদ্যতালিকায় রাখা যায়। শেষ পর্যন্ত ডিমের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পুরো দিনের খাদ্যতালিকা, পর্যাপ্ত প্রোটিন, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মোট ক্যালোরির ভারসাম্য।
সূত্র: টিভি ৯