বাজারে ডিম কিনতে গেলে অনেকেই ভাবেন, সাদা ডিম ভালো, নাকি বাদামি ডিম? অনেকেই মনে করেন, বাদামি ডিম বেশি প্রাকৃতিক, এতে পুষ্টিগুণ বেশি এবং দামও বেশি হওয়ায় এটি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো। অন্যদিকে, সাদা ডিমকে তুলনামূলক কম পুষ্টিকর বলে মনে করেন কেউ কেউ। কিন্তু এই ধারণার কি বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিমের খোসার রং দেখে তার পুষ্টিগুণ বিচার করা ঠিক নয়। সাদা ও বাদামি, দুই ধরনের ডিমেই উচ্চমানের প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান থাকে। একই আকারের ডিমের পুষ্টিগুণ সাধারণত প্রায় একই রকম হয়। বরং মুরগির খাবার, ডিমের আকার, সতেজতা এবং সংরক্ষণের পদ্ধতি ডিমের গুণমান বোঝার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সাদা ও বাদামি ডিমের খোসার রং আলাদা হয় কেন

ডিমের খোসার রং মূলত নির্ভর করে ডিম পাড়া মুরগির জাতের ওপর। কিছু জাতের মুরগি সাদা খোসার ডিম পাড়ে, আবার কিছু জাতের মুরগি বাদামি বা লালচে খোসার ডিম পাড়ে।

ডিম তৈরি হওয়ার সময় মুরগির শরীরে নির্দিষ্ট রঞ্জক পদার্থ খোসায় যুক্ত হয়। এর ফলেই খোসার রং আলাদা হয়। তবে এই রং ডিমের ভেতরের পুষ্টিগুণ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয় না।

অর্থাৎ, বাদামি খোসা মানেই বেশি পুষ্টিকর ডিম নয়। একইভাবে সাদা খোসার ডিমও কম পুষ্টিকর নয়।

সাদা ও বাদামি ডিমের পুষ্টিগুণ কি আলাদা?

সাধারণভাবে সাদা ও বাদামি ডিমের পুষ্টিগুণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। দুই ধরনের ডিমেই শরীরের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান পাওয়া যায়।

উচ্চমানের প্রোটিন

ডিম শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিনের ভালো উৎস। একটি বড় ডিমে সাধারণত প্রায় ৬ থেকে ৭ গ্রাম প্রোটিন থাকে। এই প্রোটিন শরীরের পেশি তৈরি ও মেরামত, কোষের গঠন এবং বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় কাজে সাহায্য করে।

সাদা ও বাদামি ডিমের ক্ষেত্রে খোসার রং নয়, ডিমের আকারই প্রোটিনের পরিমাণে পার্থক্য তৈরির অন্যতম কারণ।

ভিটামিন ও খনিজ

ডিমে ভিটামিন বি১২, ভিটামিন এ, ভিটামিন ডি, রিবোফ্লাভিন, সেলেনিয়াম ও ফসফরাসের মতো পুষ্টি উপাদান রয়েছে। এগুলো শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম, হাড়ের স্বাস্থ্য, স্নায়ুর কাজ এবং রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে সহায়তা করে।

সাদা ও বাদামি ডিমে এসব পুষ্টি উপাদানের পরিমাণ সাধারণত কাছাকাছি থাকে। তবে মুরগির খাদ্যাভ্যাস ও পালনপদ্ধতির কারণে কিছু পার্থক্য হতে পারে।

কোলিন

ডিমে কোলিন নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান রয়েছে। মস্তিষ্ক ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং কোষের গঠনে এটি ভূমিকা রাখে।

খোসার রং দেখে ডিমে কোলিন বেশি বা কম রয়েছে, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

বাদামি ডিমের দাম বেশি কেন?

অনেক বাজারে বাদামি ডিমের দাম সাদা ডিমের তুলনায় বেশি দেখা যায়। এর একটি কারণ হলো, বাদামি ডিম পাড়া মুরগির কিছু জাত আকারে বড় হয় এবং তাদের খাবারের চাহিদাও বেশি হতে পারে। ফলে উৎপাদন খরচ বাড়তে পারে।

এ ছাড়া বাজারজাতকরণও দামের পার্থক্যে ভূমিকা রাখে। বাদামি ডিমকে অনেক সময় প্রিমিয়াম বা বিশেষ মানের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে ক্রেতাদের মধ্যে ডিমটি বেশি স্বাস্থ্যকর হওয়ার ধারণা তৈরি হতে পারে।

কিন্তু দাম বেশি হলেই পুষ্টিগুণ বেশি হবে, এমন নয়। তাই শুধু বাদামি খোসার কারণে বেশি দাম দিয়ে ডিম কেনার প্রয়োজন নেই।

ডিমের পুষ্টিগুণ কোন কোন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে?

খোসার রং ছাড়াও কয়েকটি বিষয় ডিমের পুষ্টিমান ও গুণমানকে প্রভাবিত করতে পারে।

মুরগির খাদ্যাভ্যাস: মুরগির খাবারে নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান যোগ করা হলে ডিমে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড বা কিছু ভিটামিনের পরিমাণ বাড়তে পারে।

ডিমের আকার: বড় ডিমে সাধারণত ছোট ডিমের তুলনায় মোট প্রোটিন, চর্বি ও ক্যালরির পরিমাণ বেশি থাকে।

মুরগির পালনপদ্ধতি: মুরগি কী পরিবেশে বড় হচ্ছে এবং কী ধরনের খাবার পাচ্ছে, তা ডিমের কিছু পুষ্টি উপাদানে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শুধু খোলা জায়গায় পালন করা হয়েছে বলেই ডিমের সব পুষ্টিগুণ বেশি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

সতেজতা ও সংরক্ষণ: ডিম ঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না এবং খোসা অক্ষত রয়েছে কি না, তা খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ডিম কেনার সময় কী কী দেখবেন?

সাদা বা বাদামি, যে ডিমই কিনুন না কেন, কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখুন-

খোসায় ফাটল আছে কি না দেখুন। ফাটা ডিমে জীবাণু প্রবেশের ঝুঁকি বেশি হতে পারে।

ডিম যতটা সম্ভব সতেজ ও পরিষ্কার উৎস থেকে কিনুন।

ডিম কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, সেদিকে নজর দিন। ঘরে এনে আবহাওয়া ও সংরক্ষণের পরিবেশ অনুযায়ী নিরাপদভাবে রাখুন।

ডিম ভালোভাবে রান্না করে খান। কাঁচা বা আধা সেদ্ধ ডিমে সালমোনেলার মতো জীবাণু থাকার ঝুঁকি থাকে।

ডিমের খোসার রং নয়, দাম, আকার, সতেজতা ও নির্ভরযোগ্য উৎস বিবেচনা করে কিনুন।

কোন ডিম খাওয়া ভালো?

স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় সাদা ও বাদামি, দুই ধরনের ডিমই রাখা যায়। যদি দুই ধরনের ডিমের আকার, সতেজতা এবং মুরগির খাদ্যাভ্যাস প্রায় একই হয়, তাহলে শুধু খোসার রংয়ের কারণে একটিকে অন্যটির চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যকর বলার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

ডিমের পুষ্টিগুণের পাশাপাশি কীভাবে রান্না করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত তেল, মাখন বা লবণ দিয়ে রান্না করলে খাবারের মোট ক্যালরি ও সোডিয়ামের পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে। তাই সেদ্ধ ডিম বা পরিমিত তেলে রান্না করা ডিম স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।

যাদের ডিমে অ্যালার্জি রয়েছে বা চিকিৎসক নির্দিষ্ট খাদ্যনিয়ন্ত্রণের পরামর্শ দিয়েছেন, তাদের সেই নির্দেশনা মেনে চলা উচিত।

সাদা ডিম নাকি বাদামি ডিম, কোনটি বেশি স্বাস্থ্যকর? সহজ উত্তর হলো, খোসার রং দিয়ে ডিমের পুষ্টিগুণ নির্ধারণ করা যায় না। দুই ধরনের ডিমই প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজের ভালো উৎস।

তাই ডিম কেনার সময় রং বা দামকে একমাত্র বিবেচ্য না করে সতেজতা, আকার, সংরক্ষণ এবং উৎপাদনের তথ্যের দিকে নজর দিন। সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও রান্না করা ডিম সুষম খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর সংযোজন হতে পারে।

সূত্র: টিভি ৯