ওজন কমানো নিয়ে অনেকেই খুব চিন্তিত থাকেন। নিয়মিত জিম করেন ও কঠোর ডায়েট মেনে চলেন, তবুও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত ফল মেলে না। অথচ খুব কঠোর কোনো ডায়েট বা জিম করা ছাড়াই খাবারের দিকে একটু খেয়াল রাখলে ওজন কমানো সহজ হয়ে যায়। ওজন কমাতে খাবার তালিকায় প্রথমেই ডিম থাকে। তবে ডিম কুসুমসহ খাবেন নাকি শুধু সাদা অংশ খাবেন তা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান।

একসময় মনে করা হতো, কুসুম খেলেই বোধহয় কোলেস্টেরল বেড়ে যাবে, আর হার্টের ক্ষতি হবে। কিন্তু আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান ও গবেষকরা কী বলছেন? ওজন কমানো ও হৃদযন্ত্রের সুরক্ষায় ডিমের সাদা অংশ খাবেন নাকি কুসুমসহ পুরো ডিম খাবেন চলুন জেনে নিই।

পুষ্টির দিক দিয়ে কোনটি এগিয়ে

ডিমকে পুষ্টির পাওয়ারহাউস বলা হয়। তবে ডিমের দুই অংশের বৈশিষ্ট্য দুই রকম- ডিমের সাদা অংশে মূলত প্রোটিন ও পানি থাকে। একটা বড় ডিমের সাদা অংশে মাত্র ১৭ ক্যালরি আর জিরো ফ্যাট থাকে। সাদা অংশ খেলে প্রায় ৩.৬ গ্রাম প্রোটিন মিলবে। অন্যদিকে, ডিমের কুসুমকেই আসল পুষ্টির খনি মনে করা হয়। ভিটামিন এ, ডি, ই, কে, ভিটামিন বি১২, ফোলেট, আয়রন এবং কোলিন (যা মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়) - এর সবই পাবেন এই কুসুমে। তবে এতে প্রায় ৫৫ ক্যালরি, ৪.৫ গ্রাম ফ্যাট আর প্রায় ১৮৬ মিলিগ্রাম কোলেস্টেরল থাকে।

সাদা অংশ ক্যালরি ছাড়াই আপনার প্রোটিনের চাহিদা মেটাবে। আর কুসুম খেলে শরীরের জন্য দরকারি ভিটামিন ও মিনারেলস পাবেন।

ওজন কমাতে কোনটি বেছে নেবেন?

আপনি যদি দ্রুত ওজন কমাতে চান আর ক্যালরি মেপে খাবার খাওয়া শুরু করেন, তবে আপনার জন্য ডিমের সাদা অংশ ভালো হবে। সাদা অংশ খেলে পেট অনেকক্ষণ ভরা থাকে, কম ক্যালরিতেই বেশি প্রোটিন পাওয়া যায়।

ধরুন, আপনি ৪টি ডিমের সাদা অংশ খেলেন- তাতে আপনি প্রায় ১৪.৪ গ্রাম প্রোটিন আর ৬৯ ক্যালরি পাবেন। কিন্তু ৪টি আস্ত ডিম খেলে শরীরে যাবে প্রায় ২৮৬ ক্যালরি। তাই ক্যালোরি নিয়ে চিন্তিত হলে ডিমের সাদা অংশ খেতে পারেন।

তাহলে কি কুসুম ওজন বাড়ায়?

সরাসরি বাড়ায় না। বরং কুসুমে থাকা ফ্যাট ও নিউট্রিয়েন্ট দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখে, ফলে বারবার অন্যান্য খাবার খাওয়ার ইচ্ছা কমে যায়।

তবে ওজন কমানোর ডায়েটে প্রোটিন বাড়াতে চাইলে ২টি ডিমের সাদা অংশের সঙ্গে ১টি আস্ত ডিম মিশিয়ে ওমলেট বা সেদ্ধ করে খেতে পারেন। এতে ক্যালরি নিয়ন্ত্রণে থাকবে, আবার পুষ্টিও বাদ যাবে না। তবে একাধিক ডিম কুসুমসহ না খাওয়াই ভালো।

হার্টের স্বাস্থ্য ও কোলেস্টেরল নিয়ে পুরোনো ধারণা

একসময় কুসুমে প্রচুর কোলেস্টেরল আছে বলে হার্টের রোগীদের কুসুম খেতে নিষেধ করা হতো। কিন্তু আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এই ধারণাকে অনেকাংশেই ভুল প্রমাণ করেছে।

খাবারের কোলেস্টেরল ও রক্তের কোলেস্টেরল এক না। চিকিৎসকরা বলছেন, আমরা খাবারের মাধ্যমে যে কোলেস্টেরল খাই, তা রক্তের কোলেস্টেরলের মাত্রা খুব একটা বাড়ায় না। বরং অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্স ফ্যাট আর মিষ্টি বা প্রসেসড ফুড রক্তের খারাপ কোলেস্টেরল বাড়াতে মূল ভূমিকা রাখে।

একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত আস্ত ডিম খেলে শরীরে ভালো কোলেস্টেরল বাড়ে। পাশাপাশি খারাপ কোলেস্টেরলকেও তুলনামূলক কম ক্ষতিকর রূপ দেয়।

তবে যাদের আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস আছে- তারা আস্ত ডিম বা কুসুম খাওয়ার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন অথবা কুসুমের পরিমাণ সীমিত রাখবেন।

পেশি গঠন ও ফিটনেস

যারা জিমে যান বা বডি বিল্ডিং করেন, তারা প্রোটিনের জন্য ডিমের সাদা অংশ প্রচুর পরিমাণে খেয়ে থাকেন। তবে গবেষণায় দেখা গেছে, ব্যায়ামের পর শুধু সাদা অংশ খাওয়ার চেয়ে আস্ত ডিম খেলে শরীরের পেশি দ্রুত গঠন হয়। কারণ কুসুমে থাকা স্বাস্থ্যকর ফ্যাট ও নিউট্রিয়েন্ট শরীরে প্রোটিনকে ভালোভাবে শোষণ হতে সাহায্য করে।

তাহলে কোনটি আপনার জন্য ভালো?

কোনোটিই খারাপ না, আসল বিষয় হলো আপনি কী চান। যদি দ্রুত ওজন কমানো ও ক্যালরি কম গ্রহণ করাই আপনার লক্ষ্য হয়, তাহলে ডিমের সাদা অংশকে প্রাধান্য দিন। আর যদি সার্বিক পুষ্টি, শক্তি ও সুস্থতা বজায় রাখাকে প্রাধান্য দেন, তবে প্রতিদিন একটি করে আস্ত ডিম নিশ্চিন্তে খেতে পারেন।

সবচেয়ে ভালো হয়, ২ থেকে ৩টি ডিমের সাদা অংশের সঙ্গে ১টি কুসুম মিশিয়ে খেলে। এতে প্রোটিনও বেশি পাবেন, কুসুমের পুষ্টিও মিস হবে না, আবার ক্যালরি ও ফ্যাটও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। আপনার শরীরের প্রয়োজন বুঝে সঠিক সিদ্ধান্ত নিন। কোনো শারীরিক জটিলতা থাকলে ওজন কমানোর আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

তথ্যসূত্র

Health: Egg Whites vs. Whole Eggs: Which Is Better for Weight Loss and Heart Health

NDTV: Woman Who Lost 6 Kg In Two Months Eats 6 Egg Whites A Day