সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ এনে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে দলবদ্ধভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ গ্রীন পার্টি। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে রাজনৈতিক দলটি।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দলটির পক্ষ থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে এই দাবি জানানো হয়। বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো অভিযোগের ভিত্তিতেই কোনো ব্যক্তি, সংগঠন কিংবা জনসমষ্টির হাতে আইন তুলে নেওয়ার বা কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার নেই। অপরাধের সত্যতা যাচাই, দোষ সাব্যস্ত করা এবং শাস্তি প্রদানের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচারব্যবস্থার। সেই আইনি প্রক্রিয়াকে উপেক্ষা করে একজন মানুষকে বারবার মারধর করা এবং এমনকি চিকিৎসাধীন অবস্থায় হাসপাতাল থেকে বের করে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার মতো ঘটনা সভ্য সমাজ, আইনের শাসন ও মানবিক মূল্যবোধের চরম পরিপন্থী বলে মনে করে দলটি।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে শামীমের বিরুদ্ধে উত্তেজনা ছড়ানো হয়। একপর্যায়ে তাকে প্রথমে মারধর করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার ওপর আবারও হামলা চালানো হয়। স্বজনদের অভিযোগ, তাকে হাসপাতাল থেকে বের করে নিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’
বাংলাদেশ গ্রীন পার্টি তাদের বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করে যে, ধর্ম মানুষকে নৈতিকতা, সংযম, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধার দোহাই দিয়ে কোনো মানুষকে হত্যা করা কিংবা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক। ধর্ম অবমাননার অভিযোগটি সত্য হোক বা মিথ্যা, তা কোনোভাবেই গণপিটুনি কিংবা হত্যাকাণ্ডের বৈধতা দেয় না। কোনো বক্তব্য বা আচরণে আপত্তি থাকলে তার প্রতিকার চাওয়ার জন্য আইনসম্মত পথ বিদ্যমান। সেই পথ পরিহার করে সংঘবদ্ধ সহিংসতা চালানো একটি গুরুতর অপরাধ।
নিহত শামীমের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তার স্বজনদের দেওয়া বক্তব্যের দিকেও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে দলটি। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘শামীমের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তার স্বজনদের বক্তব্যও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি সত্য হলে তার প্রতি আরও বেশি সংবেদনশীলতা ও মানবিক আচরণ প্রত্যাশিত ছিল। মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কোনো সমস্যা থাকলেও একজন মানুষের জীবন, মর্যাদা ও নিরাপত্তার অধিকার অক্ষুণ্ন থাকে। তার আচরণ নিয়ে কোনো অভিযোগ থাকলে প্রয়োজন ছিল পরিস্থিতি শান্ত রাখা এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। কোনো অবস্থাতেই তাকে জনতার হাতে তুলে দেওয়া কিংবা সহিংসতার শিকার হতে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়।’
বাংলাদেশ গ্রীন পার্টির মতে, ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে সংঘবদ্ধ সহিংসতা প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে অত্যন্ত দৃঢ় ও নিরপেক্ষ অবস্থান নিতে হবে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, উসকানি কিংবা যাচাইহীন অভিযোগ ছড়িয়ে জনতাকে উত্তেজিত করার প্রবণতা রোধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা প্রয়োজন। তবে একই সঙ্গে অপরাধ মোকাবিলার নামে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে হয়রানি করা, মতপ্রকাশের অধিকার সংকুচিত করা কিংবা কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে দায়ী করা যাবে না। অপরাধের দায় অবশ্যই ব্যক্তির নিজস্ব ভূমিকা ও প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে।
নিহত শামীমের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাদের ভয়ভীতি ও প্রতিশোধমূলক হামলা থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং মামলার সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দলটি। পাশাপাশি নিহতের পরিবারের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রক্ষা এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে গণপিটুনি ও মব সহিংসতার বিরুদ্ধে কোনো আপস করা যাবে না। ধর্ম, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা সামাজিক প্রভাবের ভিত্তিতে বিচারপ্রক্রিয়ায় কোনো বৈষম্য চলতে পারে না। শামীম হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের আইনানুগ বিচার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন রক্ষা করা; জনতার নামে সংঘবদ্ধ সহিংসতার কাছে সেই দায়িত্ব বিসর্জন দেওয়া চলবে না।