সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগের জেরে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক ব্যক্তিকে দুই দফায় গণপিটুনি দিয়ে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। প্রকাশ্য স্থানে গণপিটুনি এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তির ওপর হামলা চালানোকে দেশের আইনের শাসন ও নাগরিক নিরাপত্তার ওপর চরম আঘাত হিসেবে অভিহিত করেছে দলটি।

প্রাপ্ত তথ্যানুসারে, গত ১৩ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শামীমের বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার একটি অডিও ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে তাকে মারধর করা হলে ৯৯৯-এ খবর দেওয়া হয়। পুলিশ দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে তাকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। তবে রাতের দিকে একদল বিক্ষুব্ধ মানুষ হাসপাতালে প্রবেশ করে তার ওপর পুনরায় হামলা চালায়।

অভিযোগ উঠেছে, এই হামলায় নেতৃত্ব দেন কারী ফজলুল হক আমিনী। তাকে সহযোগিতা করেন স্থানীয় যুবদল কর্মী সাদিকুল ইসলাম এবং সরকারি খান বাহাদুর আহসান উল্লাহ কলেজ ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোহাম্মদ নাজমুল। পুলিশ ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বাধা দেওয়ার চেষ্টা সত্ত্বেও দ্বিতীয় দফার এই নৃশংস হামলায় গুরুতর আহত হয়ে শামীম মৃত্যুবরণ করেন।

এই ঘটনার কঠোর সমালোচনা করে বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে এনসিপি জানিয়েছে, "প্রথম দফায় উদ্ধারের পরও হাসপাতালের ভেতর একজন আহত ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত না করতে পারা চরম ব্যর্থতা। শত শত মানুষ কীভাবে হাসপাতালে ঢুকে হামলা চালাল সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তার জবাব দিতে হবে।"

নিহতের পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শামীম মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং তার চিকিৎসা চলছিল। এই প্রসঙ্গে এনসিপি স্পষ্ট করে বলেছে যে, অডিওর সত্যতা বা অভিযোগ যাই হোক না কেন, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে পিটিয়ে হত্যার অধিকার কারও নেই। বিচার করার দায়িত্ব একমাত্র রাষ্ট্র ও আইনানুগ বিচারব্যবস্থার। ধর্মের নামে এ ধরনের সহিংসতা ও বিচারহীনতা ইসলামের মূল চেতনারও পরিপন্থী বলে মনে করে দলটি।

ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এনসিপি ৪ দফা দাবি উত্থাপন করেছে:

১. ভিডিও ফুটেজ ও প্রমাণের ভিত্তিতে দুই দফার হামলায় জড়িত ও উসকানিদাতাদের অবিলম্বে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।

২. চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা ও দায়িত্বে অবহেলাকারীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

৩. সহিংসতার পেছনে থাকা অডিওর সত্যতা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানি ও গুজব ছড়ানোদের কঠোর হস্তে দমন করতে হবে।

৪. নিহতের পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে আইনি সহায়তা প্রদান করতে হবে।

এনসিপি সতর্ক করে জানিয়েছে, কোনো অভিযোগ উঠলেই উত্তেজিত জনতাকে শাস্তিদানের সুযোগ দিলে দেশের বিচারব্যবস্থা অর্থহীন হয়ে পড়বে। তাই ধর্মীয় অনুভূতির সুরক্ষার পাশাপাশি প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও আইনি অধিকার রক্ষা করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।