সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা মামলায় এজাহারভুক্ত প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী ফেসবুকে সরব থাকলেও তাকে এখনও গ্রেপ্তার করা যায়নি। পুলিশ বলছে, মামলা দায়েরের পর দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধান আসামিসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভ করে লোকজন জড়ো করা হয়। এরপর দফায় দফায় তাকে পেটানো হয়। পুলিশ উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানেও তাকে মারধর করা হয়। এরপর টেনেহিঁচড়ে হাসপাতালের বাইরে নিয়ে আবারও পেটানো হয়। শেষে তার মরদেহের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করা হয়।
ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হক আমিনী তার ফেসবুকের ‘Fh Ameni’ প্রোফাইল থেকে লোকজন জড়ো করতে দুই দফা লাইভ করেন।
গত ১৩ অক্টোবর (মঙ্গলবার) বিকেল ৩টা ৩১ মিনিটে প্রথমবার ফেসবুক লাইভে আসেন তিনি। ১৯ মিনিট ১৯ সেকেন্ডের ওই লাইভে তিনি একটি অডিও শোনান। লাইভে বলা হয়, অডিও কথোপকথনটি শামীমের। এরপর ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তার উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানান ফজলুল হক। লাইভে শামীমের বাড়ির ঠিকানাও দেন তিনি।
একই দিন বিকেল ৫টা ৩১ মিনিটে আবার লাইভে আসেন ফজলুল হক। এবার তিনি লাইভ করেন একজন পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারের সামনে। সেখানে তখন চিকিৎসা নিচ্ছিলেন শামীম। ৬ মিনিট ১৬ সেকেন্ডের এই লাইভে ফজলুল হক সবাইকে চেম্বারের সামনে আসার আহ্বান জানান। লাইভ করার সময় আশপাশে জড়ো হওয়া লোকজনকে উসকে দিচ্ছিলেন তিনি। একপর্যায়ে সেখানে কয়েকশ মানুষ জড়ো হন। পরে শামীমকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য পল্লিচিকিৎসককে চাপ দেওয়া হয়।
পরে মারধরের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মাটিতে লুটিয়ে পড়া শামীমকে ঘিরে রয়েছেন বহু মানুষ। কয়েকজন তার বুকের ওপর পা দিয়ে আঘাত করছিলেন। আরেকটি ভিডিওতে শামীমের শাস্তির দাবিতে দেবহাটা উপজেলা সদরে মিছিল করতে দেখা যায়। মিছিলের সামনে ফজলুল হককে দেখা গেছে।
এরপর ওইদিন রাত ১১টা ১১ মিনিটে ও রাত ১২টা ৮ মিনিটে ফেসবুকে দুটি পোস্ট করেন ফজলুল হক। প্রথম পোস্টে শামীমকে ‘কই মাছের জান’ বলে উল্লেখ করেন এবং দ্বিতীয় পোস্টে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামসুর রহমানের ছেলে। হত্যার ঘটনায় শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
এদিকে মামলা দায়েরের পর শুক্রবার সকালে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট দেন ফজলুল হক। সেখানে তিনি লেখেন, ‘আমি আপনাদের মাঝে থাকব না, যে কোনো সময় আমাকে এরেস্ট করা হবে, কিন্তু মোনাজাতে আমাকে শামিল রাখবেন, তামাম বিশ্ববাসী আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করলেও কিছু যায় আসে না যদি আল্লাহ পাক আমাকে মাফ করে দেন, এ যুগের গাজী ইলমুদ্দিন হিসেবে আমাকে এবং এই অপারেশনে যারা অংশগ্রহণ করেছিল সকলকে যেন কবুল করে নেন। হে আল্লাহ আমার পরিবারকে আপনার কুদরতি হাতে সোপর্দো করলাম তাদের ওপর রহম করুন সবর করার তৌফিক নসিব করুন, বিশেষ করে আমার বড় পুত্র মাওলানা মুফতি শেখ সাদী ডেঙ্গু পজেটিভ আক্রান্ত তাকে আপনি পরিপূর্ণ সুস্থতা দান করুন এবং আমাকে ঈমানের উপরে অবিচল রাখবেন আমরণ, আল্লাহুম্মা আমীন।’
এরপর বিকেল ৫টা ৮ মিনিটে আরও একটি ফেসবুক পোস্ট করেন তিনি। সেখানে লেখেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেন, শহীদের সমস্ত গোনাহ মাফ কিন্তু ঋণ। মার্কেটে রড সিমেন্ট, কাপড়, মুদিখানা ঔষধসহ এক লাখ ৫৪ হাজার ৬০০ টাকার মতো দেনা আছি। আল্লাহপাক এগুলো পরিশোধ করার তাওফিক দান করেন, আর যাদের নিকট আমি পাবো এই নম্বরে ....... বিকাশ বা নগদ এ প্রদান করবেন ইনশাআল্লাহ ।’
এদিকে নিহত শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান বলেন, তার ভাই দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। কখনো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেন, আবার কখনো অসংলগ্ন আচরণ করতেন। এলাকার মানুষও তার অসুস্থতার বিষয়টি জানতেন। মঙ্গলবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফজলুল হকের নেতৃত্বে একদল লোক তার ভাইকে মারধর করেন। পরে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানেও দলবল নিয়ে হামলা চালিয়ে তার ভাইকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
তাওসিফ আরও বলেন, তার ভাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। পাশাপাশি কামিল পাস করেছেন এবং হোমিওপ্যাথি নিয়েও পড়াশোনা করেছেন। তার স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে।
নিহত শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিলের ভাষ্য, গত সোমবার শামীম ও তার স্ত্রীর কথোপকথনের একটি অডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে ঝগড়ার সময় অন্য কেউ কথাগুলো রেকর্ড করেছিলেন। ওই অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর বক্তব্য রয়েছে—এমন অভিযোগ উঠলে স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা তৈরি হয়। এরপর তাদের বাড়িতে হামলা করে দরজা ও দেয়াল ভাঙচুরের চেষ্টা করা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর শামীমকে প্রথমে বাড়ির পাশের সুবর্ণাবাদ বাজারে মারধর করা হয়। সেখান থেকে বাড়িতে ফিরে তিনি বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে তাকে পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে নেওয়া হয়। পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে ফজলুল হকের নেতৃত্বে লোকজন ওই চেম্বার থেকে তাকে বের করে আবার মারধর করেন। খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। সেখানেও তাকে মারধর করা হয়।
দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, শতাধিক লোক হাসপাতালে ঢুকে শামীমকে মারধর করেন। পরে তাকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আবার মারধর করা হয়। পরে তাকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে শামীমের মৃত্যু হয়।
শামীমকে পিটিয়ে হত্যার বিষয়ে দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইমদাদুল হক বলেন, কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তাকে আইনের হাতে তুলে দেওয়া উচিত ছিল। তিনি বলেন, এ ঘটনাকে জামায়াত-শিবিরের দলীয় কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রচার করা ঠিক হবে না। আমি শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় নিন্দা জানাই এবং জামায়াত এ ধরনের সহিংসতা সমর্থন করে না।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বলেন, নিহত শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে মামলা করেছেন। মামলায় ফজলুল হকসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার দুজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ফজলুল হকসহ অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।