সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে (৩৮) পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে (৪৫) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল শনিবার রাত ১১টার দিকে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার ফরিদপুর গ্রামে এক আত্মীয়ের বাসভবন থেকে তাঁকে আটক করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, এই নৃশংস ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

একটি যৌথ অভিযানের মাধ্যমে আমিনীকে গ্রেপ্তার করা হয়, যেখানে দেবহাটা সার্কেল, কালীগঞ্জ থানা, দেবহাটা থানা এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)-৬-এর সদস্যরা অংশ নেন। উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার দেবহাটার সুবর্ণাবাদ গ্রামের বাসিন্দা শামীমকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার অভিযোগে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।

ঘটনা প্রসঙ্গে দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন আজ রোববার সকালে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “গোপন সংবাদ ও প্রযুক্তির সহায়তায় আমিনীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় তাঁর নিজস্ব মুঠোফোন সঙ্গে ছিল না। তিনি অন্য সিম ও মুঠোফোন ব্যবহার করছিলেন। ওই সিম ব্যবহার করে একজনের সঙ্গে নিজের পরিচয় দিয়ে কথা বলেন। যোগাযোগের সূত্র ধরেই তাঁকে শনাক্ত করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এখনো উল্লেখযোগ্য তথ্য মেলেনি। আজ আদালতে সোপর্দ করে সাত দিনের রিমান্ডের আবেদন করা হবে।”

গত বৃহস্পতিবার রাতে নিহত শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় আমিনীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে এবং ১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। গত শুক্রবার ভোরে পুলিশ এজাহারভুক্ত ৫ ও ৬ নম্বর আসামি মোক্তার হোসেন খান (৫৩) ও আসাদুল ইসলাম মোল্যাকে (৪৬) গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। ওসি আরও জানান, সিসিটিভি ফুটেজ এবং মুঠোফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে আরও কয়েকজনকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

নিহত শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান বলেন, “প্রধান আসামি গ্রেপ্তারের খবরে আমরা কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। এখন আমাদের একটাই চাওয়া, আমার ভাইয়ের সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে, রাষ্ট্র যেন তার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করে। প্রচলিত আইন ও বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হোক। পাশাপাশি আমার ভাইয়ের দুই এতিম সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে সরকার যেন তাদের পাশে দাঁড়ায়।”

মামলার অন্যান্য আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে তাওসিফ আরও বলেন, ২ ও ৩ নম্বর আসামি কামরুল গাজী ও সাদিকুলকে গ্রেপ্তার করা গেলে এই ঘটনায় কারা মূল ভূমিকা পালন করেছেন, সে বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, কামরুল গাজী পুলিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি। তবে সাদিকুলের রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কে তাঁরা নিশ্চিত নন।

অন্যদিকে, দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইমদাদুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।” তিনি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, “জামায়াত এ ধরনের সহিংসতা সমর্থন করে না।”

মামলায় ৮ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সভাপতি কামরুল গাজীর নাম আসার বিষয়ে জানতে চাইলে ইমদাদুল হক বলেন, তাঁকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আসামি করা হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন। তাঁর দাবি, “কামরুল গাজী ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তাঁর নাম উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেওয়া হয়েছে।” ইমদাদুল হক আরও দাবি করেন, এই ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক ইন্ধন রয়েছে।

নিহত শামীমের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শামীম দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। গত সোমবার তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটির একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য রয়েছে—এমন অভিযোগ ওঠার পর তাঁর বাড়িতে হামলার চেষ্টা করা হয় এবং স্থানীয় একটি বাজারে তাঁকে মারধর করা হয়। পরিবার জানিয়েছে, এরপর তিনি বিষপান করেন। স্থানীয় পল্লিচিকিৎসক মো. সবুরের চেম্বারে চিকিৎসা চলাকালীন পরদিন শতাধিক মানুষ ভিড় করে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বের করে মারধর করে। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।

দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, হাসপাতালে ভর্তির পর শতাধিক লোক ওয়ার্ডে ঢুকে শামীমকে পুনরায় মারধর করেন। আনসার সদস্য, নিরাপত্তাকর্মী ও হাসপাতালের কর্মীরা তাঁদের থামাতে ব্যর্থ হন। পরবর্তীতে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। হাসপাতালের কয়েকটি ক্যামেরার সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সব ফুটেজ দেখা সম্ভব হয়নি। পুলিশ এখনো তাঁদের কাছে ফুটেজ চায়নি, তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ফুটেজ সংরক্ষণের চেষ্টা করছে।