সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে (৩৮) পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে ‘অ্যাক্সিডেন্ট’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী। আজ রোববার বেলা তিনটার দিকে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) সদস্যরা তাঁকে সদর থানায় নিয়ে এলে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

থানা ভবনে প্রবেশের আগমুহূর্তে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ফজলুল হক আমিনী বলেন, ‘আইনের দৃষ্টিতে আমি অপরাধী। আমি যে কাজটি করেছি, আপনারা দেখছেন সোশ্যাল মিডিয়ায়, এটা আল্লাহপাক ফয়সালা করবেন।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে আমিনী বলেন, ‘পিটিয়ে মারার তো ওয়ে (উদ্দেশ্য) ছিল না, হয়ে গেছে অ্যাক্সিডেন্টে। আইনের দৃষ্টিতে আমি অপরাধী, তবে এমনিতে নিজেকে অপরাধী মনে করি না।’

ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, শামীমকে পিটিয়ে হত্যার আগে আমিনী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দুইবার লাইভ (সরাসরি সম্প্রচার) করে লোকজন জড়ো করেন। এরপর দফায় দফায় তাঁকে পিটিয়ে হত্যার পর মরদেহের ছবি দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন আমিনী।

গতকাল শনিবার রাত ১১টার দিকে জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ফরিদপুর গ্রামের এক আত্মীয়ের বাসায় অভিযান চালিয়ে ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ ও এসআরবি-৬। এরপর আজ রোববার বেলা তিনটার দিকে তাঁকে সদর থানায় নিয়ে আসেন এসআরবির সদস্যরা। পরে আদালতের মাধ্যমে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ফজলুল হক আমিনী পুলিশের কাছে শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেবেন বলেও জানিয়েছেন। এ জন্য তাঁকে রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি পুলিশ। আদালতের নির্দেশে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

গত সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শামীমের একটি অডিও কথোপকথন ছড়িয়ে পড়ে। অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য আছে—এমন অভিযোগ উঠলে তাঁর বাড়িতে হামলার চেষ্টা করা হয়। ওই দিন স্থানীয় একটি বাজারে শামীমকে প্রথম মারধর করা হয়। এ ঘটনার পর শামীম বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। স্বজনেরা তাঁকে স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে চিকিৎসা দেন। পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে একদল লোক ওই পল্লিচিকিৎসকের চেম্বার থেকে শামীমকে বের করে আবার মারধর করেন। পুলিশ উদ্ধার করে তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। পরে ফজলুল হকের নেতৃত্বে রাতে মিছিল নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে গিয়ে শামীমকে আবার পেটানো হয়। পরে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে শামীম মারা যান। নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামসুর রহমানের ছেলে।

এই নৃশংস ঘটনায় শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে দেবহাটা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় ফজলুল হক আমিনীকে প্রধান আসামি করে ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয় আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে। পরদিন মামলার এজাহারভুক্ত দুই আসামি মোখতার হোসেন খান ও আসাদুল ইসলাম মোল্লাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়।

রোববার দুপুরে দেবহাটার সুবর্ণাবাদ গ্রামে শামীমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির পেছনে বাবা শামসুর রহমানের কবরের পাশে শামীমকে দাফন করা হয়েছে। কবরের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন শামীমের ভাই তাওহিদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘মারা যাওয়ার পর শামীমের জানাজা-দাফন নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছেন। জানাজা-দাফনে বাধা দেওয়ার কথাও শোনা গিয়েছিল। তারপরও আমরা জানাজা-দাফন করেছি। পরিচিত অনেকেই জানাজায় আসেননি। কিন্তু পরে লোকজন বাড়িতে এসে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।’

ঘরের সামনে আট মাস বয়সী সন্তানকে কোলে নিয়ে মনমরা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন শামীমের স্ত্রী নাজমা খাতুন। তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তাঁকে নিয়মিত ওষুধ খেতে হতো। সাতক্ষীরা শহরে একটি হোটেলে কাজ করতেন। স্বামীর আয়ে সংসার চলত। এখন ছোট দুই সন্তানকে নিয়ে আমি কোথায় যাব, কীভাবে চলব, কিছুই বুঝতে পারছি না। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়েও আমি চিন্তিত। বাড়িতে থাকতেও এখন ভয় লাগে।’ তিনি সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকার জন্য সবার সহযোগিতা কামনা করেন।