সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামে এক যুবককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিও ফুটেজে ঘটনাস্থলে স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াতের কয়েকজন নেতাকর্মীকে দেখা গেছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, ভিডিওতে দেখা যাওয়া কিংবা কৌতূহলবশত দাঁড়িয়ে থাকার অর্থ এই নয় যে তারা সরাসরি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। নিহতের ঘটনায় সুনির্দিষ্ট ভূমিকা চিহ্নিত করতে তদন্তের প্রয়োজন।

গত ১৩ অক্টোবর শামীমকে প্রথমে মারধর করা হয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পরও হামলার ঘটনা ঘটে। স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের একটি অংশ তাকে হাসপাতালের ভেতর থেকে বের করে বাইরে নিয়ে মারধর করে। পরে তার মৃত্যুর খবর এবং ঘটনার বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও পর্যালোচনার ভিত্তিতে জানা যায়, দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের ফজলুল হক আমিনী তার ‘Fh Ameni’ নামের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে লোকজনকে জড়ো করতে দুই দফা লাইভ করেন।

১৩ অক্টোবর বিকেল ৫টা ৩১ মিনিটে করা একটি লাইভে কুলিয়ার একটি পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারের সামনে শামীমকে রাস্তায় ফেলে মারধরের দৃশ্য দেখা যায়। ভিডিও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে দাবি করা হয়েছে, সেখানে ফজলুল হক আমিনীকে শামীমের বুকের ওপর পা দিয়ে আঘাত করতে দেখা গেছে। একই সময় পারুলিয়া ইউনিয়নের যুবদলের নেতা হিসেবে পরিচিত সাদিকুল ইসলামকেও শামীমের বুকে পা দিয়ে আঘাত করতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

ওই স্থানে আরও কয়েকজনকে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে জামায়াতের যুব বিভাগের সঙ্গে যুক্ত আজহারুল ইসলাম ছিলেন বলে প্রতিবেদকের ভিডিও পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। এ ছাড়া শামীমকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান জানান কুলিয়া ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি সাদেকুল ইসলাম এবং হামলাকারীদের তিনি থামানোর চেষ্টা করেন বলে বর্ণনায় উঠে এসেছে।

একই দিন সন্ধ্যায় ‘Md Azharul Satkhira’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ২৫ মিনিট ২৭ সেকেন্ডের একটি লাইভ প্রচার করা হয়। ওই লাইভের শুরুতে পারুলিয়া বাজার এলাকা থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হতে দেখা যায়। মিছিলটি ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে হয়েছিল বলে দাবি করা হচ্ছে।

মিছিলে আমিনীর পাশাপাশি পারুলিয়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক গোলাম রসুল, সাদিকুল ইসলাম, জামায়াতের আইবিডব্লিউএফ শাখার সদস্য হিসেবে পরিচিত মিজানুর রহমান মিজান, যুব বিভাগের আজহারুল ইসলাম এবং শিবিরকর্মী হিসেবে পরিচিত জাবির আকরামকে স্লোগান দিতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। মিছিলটি হাসপাতালের প্রাঙ্গণে প্রবেশের পর স্লোগান জোরালো হয়। ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্যরা বাধা দেন। এ সময় উত্তেজনা তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে আনসার সদস্যরা পিছু হটতে বাধ্য হন বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবেদকের ভিডিও পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ফজলুল হক আমিনী কয়েকজনকে হাসপাতালের দুটি প্রবেশপথে অবস্থান নিতে নির্দেশ দেন বলে দাবি করা হচ্ছে। এর কিছু সময় পর হাসপাতালের বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে শামীমকে শয্যা থেকে বারান্দায় এনে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে পুলিশ উপস্থিত হলে হামলাকারীদের একটি অংশ সরে যায় বলে জানা গেছে

ঘটনার আগে ও চলাকালে ‘Md Azharul Satkhira’, ‘Serajul Live’, ‘Fh Ameni’ এবং ‘SD Sadikul Islam’ নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে লাইভ প্রচার করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে এসব ভিডিওর পূর্ণাঙ্গ কপি, সময়ের ধারাবাহিকতা এবং মূল উৎস স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। মামলা হওয়ার পর কয়েকজন তাদের ফেসবুক পোস্ট, ভিডিও বা লাইভ মুছে দিয়েছেন বলেও দাবি করা হচ্ছে।

ভিডিওতে জামায়াতের কয়েকজন নেতাকর্মীকে দেখা যাওয়ার বিষয়ে দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি এইচএম এমদাদুল হকের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ভিডিওতে যাদের দেখা যাচ্ছে, তাদের মধ্যে কেউ কেউ ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন; তবে সবাই মারধরের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন, এমন নয়।

তার ভাষ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ায় এলাকার কিছু তরুণ কৌতূহলবশত সেখানে গিয়েছিলেন। তাদের কেউ দাঁড়িয়ে ছিলেন, কেউ পরিস্থিতি দেখতে বা জানতে চেয়েছিলেন। তবে সরাসরি মারধরে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিষয়ে তিনি আলাদাভাবে দুজনের নাম উল্লেখ করেন।

এইচএম এমদাদুল হকের দাবি অনুযায়ী, ভিডিওতে মারধরে সরাসরি অংশ নিতে দেখা গেছে এমন দুজন হলেন শফিউল আলম আনিস ও সাদিকুল ইসলাম। তবে তার বক্তব্যে উল্লেখ করা ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং তাদের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

এর আগে ১৫ অক্টোবর রাতে দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের এক বিবৃতিতে শামীম হত্যার ঘটনায় সংগঠনের কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মীর সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করা হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। ভিডিওতে জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত বলে পরিচিত কয়েকজনকে দেখা যাওয়ার দাবি এবং সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক বক্তব্যের মধ্যে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার উত্তর পেতে প্রত্যেকের ভূমিকা পৃথকভাবে তদন্ত করা জরুরি।

বিষয়টি নিয়ে দেবহাটা উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শেখ সিরাজুল ইসলামের সঙ্গেও কথা হয়। তিনি বলেন, ভিডিও ফুটেজে ঘটনাটি দেখা যাচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এলাকার কিছু তরুণ ঘটনার খবর পেয়ে সেখানে যোগ দিয়েছিলেন। তবে ভিডিওতে থাকা সবার উদ্দেশ্য বা ভূমিকা সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত নন।

পারুলিয়া ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক গোলাম রসুলকে ভিডিওতে দেখা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে শেখ সিরাজুল ইসলাম বলেন, তিনি ভিডিওতে তাকে দেখেছেন। এ বিষয়ে যুবদলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেন বলেও জানান তিনি।

অন্যদিকে সাদিকুল ইসলাম বিএনপির সঙ্গে যুক্ত নন বলে দাবি করেন এই বিএনপি নেতা। তিনি বলেন, অন্যায়কে কেউ সমর্থন করবেন না। তবে ভিডিওতে উপস্থিতি, রাজনৈতিক পরিচয় এবং হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশগ্রহণের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করে দেখা প্রয়োজন।

শামীম হত্যার ঘটনায় তার বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে ফজলুল হক আমিনীসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছেন। মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী ফেসবুকে সক্রিয় থাকলেও তাকে এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। মামলা হওয়ার পর ১৬ অক্টোবর বিকেল ৫টা ৮ মিনিটে তার প্রোফাইলে একটি পোস্টও দেখা গেছে। ওই পোস্টে তিনি নিজের কিছু দেনার কথা জানিয়ে তা পরিশোধের জন্য সহযোগিতা চেয়েছেন।

সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার আবু সালেহ মো. আশরাফুল আলম বলেন, দুজন ইতিমধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। বাকিদের গ্রেপ্তার করা হবে। আর ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি কোন দলের, সেটি বিবেচনা না করে অপরাধী হিসেবেই তাদের বিবেচনা করা হবে।