সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে লাইভ (সরাসরি সম্প্রচার) করে পরিকল্পিতভাবে লোকজন জড়ো করা হয় বলে জানা গেছে। এরপর দফায় দফায় তাঁকে মারধর করা হয়। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও সেখানে হামলাকারীরা তাঁকে পুনরায় মারধর করে এবং টেনেহিঁচড়ে হাসপাতালের বাইরে নিয়ে গিয়ে পেটানো হয়। সবশেষে তাঁর মরদেহের ছবি ফেসবুকে পোস্ট করা হয়।
ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হক আমিনী তাঁর ফেসবুক (Fh Ameni) প্রোফাইল থেকে লোক জড়ো করার উদ্দেশ্যে দুই দফা লাইভ করেন।
গত মঙ্গলবার বেলা ৩টা ৩১ মিনিটে প্রথমবার ফেসবুক লাইভে আসেন তিনি। ১৯ মিনিট ১৯ সেকেন্ডের ওই লাইভে তিনি একটি অডিও শোনান এবং দাবি করেন যে, অডিও কথোপকথনটি শামীমের। এরপর ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে তাঁর উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানান ফজলুল হক। লাইভে তিনি শামীমের বাড়ির ঠিকানাও প্রকাশ করেন।
একই দিন বিকেল ৫টা ৩১ মিনিটে ফজলুল হক দ্বিতীয়বার লাইভে আসেন। এই লাইভটি তিনি একজন পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারের সামনে থেকে করেন, যেখানে তখন চিকিৎসা নিচ্ছিলেন শামীম। ৬ মিনিট ১৬ সেকেন্ডের এই লাইভে ফজলুল হক সবাইকে চেম্বারের সামনে আসার আহ্বান জানান এবং সেখানে জড়ো হওয়া লোকজনকে উসকে দিতে থাকেন। একপর্যায়ে সেখানে কয়েক শ মানুষ জড়ো হয়। পরে শামীমকে তাঁদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য পল্লিচিকিৎসককে চাপ দেওয়া হয়।
মারধরের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মাটিতে লুটিয়ে পড়া শামীমকে ঘিরে অসংখ্য মানুষ দাঁড়িয়ে আছে এবং কয়েকজন তাঁর বুকের ওপর পা দিয়ে আঘাত করছিলেন। আরেকটি ভিডিওতে শামীমের শাস্তির দাবিতে দেবহাটা উপজেলা সদরে মিছিল করতে দেখা যায়, যার সামনেই ছিলেন ফজলুল হক।
নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামসুল রহমানের ছেলে। গত মঙ্গলবার দফায় দফায় তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, ফজলুল হকের নেতৃত্বে একদল লোক এই হত্যাকাণ্ডের কথা পরিকল্পনা করে তাঁকে পিটিয়ে মেরেছে।
গত মঙ্গলবার রাত ১১টা ১১ মিনিটে ও রাত ১২টা ৮ মিনিটে ফেসবুকে দুটি পোস্ট করেন ফজলুল হক। প্রথম পোস্টে শামীমকে ‘কই মাছের জান’ এবং দ্বিতীয় পোস্টে হত্যা করার বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “তাঁর ভাই দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। কখনো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেন, আবার কখনো অসংলগ্ন আচরণ করতেন। এলাকার মানুষও ভাইয়ের অসুস্থতার বিষয়টি জানতেন। মঙ্গলবার চিকিৎসাধীন অবস্থায় ফজলুল হকের নেতৃত্বে জামায়াতের সমর্থক হিসেবে পরিচিত একদল লোক তাঁর ভাইকে মারধর করেন। পরে তাঁকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানেও দলবল নিয়ে হামলা চালিয়ে ভাইকে পিটিয়ে মেরে ফেলে।”
তাওসিফ আরও জানান, তাঁর ভাই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করেছেন। পাশাপাশি তিনি কামিল পাস করেছেন এবং হোমিওপ্যাথি বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে।
নিহত শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিলের ভাষ্য অনুযায়ী, গত সোমবার শামীম ও তাঁর স্ত্রীর কথোপকথনের একটি অডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁদের মধ্যে ঝগড়ার সময় কথাগুলো অন্য কেউ রেকর্ড করেছিলেন। ওই অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর বক্তব্য আছে—এমন অভিযোগ উঠলে স্থানীয়ভাবে উত্তেজনা তৈরি হয়। এরপর তাঁদের বাড়িতে হামলা করে দরজা ও দেয়াল ভাঙচুরের চেষ্টা করা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, অডিও ছড়িয়ে পড়ার পর শামীমকে প্রথমে বাড়ির পাশের সুবর্ণাবাদ বাজারে মারধর করা হয়। সেখান থেকে বাড়িতে ফিরে তিনি বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরে তাঁকে পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয়। পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে ফজলুল হকের নেতৃত্বে লোকজন ওই চেম্বার থেকে তাঁকে বের করে পুনরায় মারধর করেন। খবর পেয়ে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। তবে সেখানেও হামলাকারীরা তাঁকে মারধর করে।
দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক মো. সাইফুল ইসলাম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, শতাধিক লোক হাসপাতালে ঢুকে শামীমকে মারধর করে। পরে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আবার মারধর করা হয়। পরে উদ্ধার করে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে শামীমের মৃত্যু হয়।
অভিযুক্ত ফজলুল হকের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। তিনি বলেন, “আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে মারধর করা অপরাধ। তবে মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কেউ কটূক্তি করলে শরিয়তের বিধান ভিন্ন। অতীতে এ ধরনের অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রশাসনের পদক্ষেপে তিনি সন্তুষ্ট নন।”
এক প্রশ্নের জবাবে ফজলুল হক বলেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তবে ধর্ম, কোরআন ও মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কেউ বিরূপ মন্তব্য করলে প্রতিবাদ করার জন্য তিনি নিজ থেকে এগিয়ে যান। এ ধরনের ঘটনায় বিভিন্ন এলাকার প্রতিবাদ কর্মসূচিতে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে জানান।
ফজলুল হক আরও জানান, তিনি একসময় মসজিদের ইমাম ছিলেন। বর্তমানে গ্রামের বাজারে পশু জবাই করতে তাঁকে ডাকা হয় এবং তিনি মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহনের কাজ করেন।
লোক জড়ো করে শামীমকে পিটিয়ে হত্যা করার বিষয়ে দেবহাটা উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ইমদাদুল হক মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “কাউকে পিটিয়ে হত্যা করা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়। কারও বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে আইনের হাতে তুলে দেওয়া উচিত ছিল। এ ঘটনাকে জামায়াত-শিবিরের দলীয় কর্মকাণ্ড হিসেবে প্রচার করা ঠিক হবে না। আমি শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় নিন্দা জানাই এবং জামায়াত এ ধরনের সহিংসতা সমর্থন করে না।”
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীনের সঙ্গে আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে ও সন্ধ্যায় কথা বলেছে মুক্তকণ্ঠ। তিনি বলেন, শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ফজলুল হক আমিনীর উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পুলিশ গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর কর্মকাণ্ড ও বক্তব্য পর্যালোচনা করছে পুলিশ। তাঁর আচরণের ব্যাপারে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে। তাঁকে আটক করতে অভিযান চলছে।
ওসি জানান, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলো পুলিশ সংরক্ষণ করেছে। ভিডিও পর্যালোচনা ও প্রযুক্তির সহায়তায় হামলা ও মারধরে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।
ওসি আরও বলেন, হাসপাতালে হামলার ঘটনায় থানায় অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া হত্যার ঘটনায় শামীমের পরিবার মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
মামলা করার বিষয়ে শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান বৃহস্পতিবার বিকেলে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ময়নাতদন্ত শেষে বুধবার রাতে ভাইয়ের লাশ হস্তান্তর করে পুলিশ। এরপর জানাজা শেষে দাফন করা হয়। তাঁরা এ ঘটনায় মামলা করবেন।