সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে এবং আজ শুক্রবার সকালে এই অভিযান চালিয়ে তাঁদের আটক করা হয়। তবে মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী এখনো পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে এবং পলাতক রয়েছেন। অবাক করা বিষয় হলো, পলাতক থাকা অবস্থাতেই তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিয়মিত পোস্ট দিচ্ছেন।

গ্রেপ্তারকৃত দুই আসামির নাম মোক্তার হোসেন মোড়ল ও আসাদুল মোল্লা। তাঁদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন। আজ সকালে ওসি মুক্তকণ্ঠকে জানান, দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রাম থেকে মোক্তারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে, আজ সকাল সাড়ে নয়টার দিকে নাজিরের ঘের নামক স্থান থেকে আসাদুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। ওসি আরও জানান, গ্রেপ্তারকৃত দুজনই এজাহারভুক্ত আসামি এবং মামলার অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশি তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।

নিহত শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান আজ সকালে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আমরা জানতে পেরেছি, এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য যাঁরা জড়িত, তাঁদেরও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে জেনেছি। আমরা চাই এ ঘটনায় জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনা হোক।”

মামলার এজাহারে ঠিক কী উল্লেখ করা হয়েছে, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে তাওসিফ জানান, মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া এবং আসামিদের গ্রেপ্তারের স্বার্থে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করার জন্য পুলিশ তাঁদের অনুরোধ করেছে। এই কারণে তিনি এখনই সব তথ্য প্রকাশ করতে রাজি নন। তবে মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তাওসিফ। তাঁর অভিযোগ, আমিনী বর্তমানে ফেসবুকে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে সক্রিয় রয়েছেন।

দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হক আমিনীর ফেসবুক প্রোফাইলের নাম ‘Fh Ameni’। আজ শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৬ মিনিটে ওই প্রোফাইল থেকে একটি পোস্ট দেওয়া হয়। সেখানে ফজলুল হক লিখেছেন, “আমি আপনাদের মাঝে থাকবো না, যেকোনো সময় আমাকে এরেস্ট করা হবে, কিন্তু মোনাজাতে আমাকে শামিল রাখবেন। তামাম বিশ্ববাসী আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করলেও কিছু যায় আসে না, যদি আল্লাহ পাক আমাকে মাফ করে দেন। এ যুগের গাজী ইলমুদ্দিন হিসেবে আমাকে এবং এই অপারেশনে যারা অংশগ্রহণ করেছিল সকলকে যেন কবুল করে নেন।”

এর আগে গতকাল রাত ১০টা ২২ মিনিটে শামীমকে নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন ফজলুল হক আমিনী, যার সাথে শামীমের একটি কথোপকথনের অডিও যুক্ত ছিল। তার আগে বৃহস্পতিবার দুপুর ১টা ২৬ মিনিটে দেওয়া আরেকটি পোস্টে শামীমের মানসিক অসুস্থতার দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন তিনি।

ঘটনার সূত্রপাত গত সোমবার, যখন শামীম (৩৮) ও তাঁর স্ত্রীর কথোপকথনের একটি অডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ওই অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য রয়েছে বলে অভিযোগ উঠলে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং শামীমের বাড়িতে হামলার চেষ্টা করা হয়। ওই দিনই স্থানীয় একটি বাজারে শামীমকে প্রথমবার মারধর করা হয়। পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে তিনি স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে চিকিৎসা নেওয়ার সময় একদল লোক তাঁকে সেখান থেকে বের করে পুনরায় মারধর করে। পরে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। কিন্তু রাতে ফজলুল হক আমিনীর নেতৃত্বে এক মিছিল হাসপাতালে হামলা চালায় এবং সেখান থেকে শামীমকে ছিনিয়ে নিয়ে আবারও পেটানো হয়। এরপর সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

শামীম হত্যার ঘটনায় তাঁর বড় ভাই আবদুল জলিল বাদী হয়ে গতকাল রাতে দেবহাটা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং অজ্ঞাতনামা ২০০ থেকে ২৫০ জনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার প্রধান আসামি হিসেবে ফজলুল হক আমিনীকে রাখা হয়েছে।

নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামসুল রহমানের ছেলে। পরিবারের দাবি, শামীম দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন। তিনি কখনো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেন, আবার কখনো অসংলগ্ন আচরণ করতেন, যা এলাকার মানুষেরও জানা ছিল। শামীম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন। পাশাপাশি তিনি কামিল পাস করেছেন এবং হোমিওপ্যাথি বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। তাঁর স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে।