‘মানুষ আমার কী যে ক্ষতিটা করে দিল, আমাকে বিধবা বানিয়ে দিল। আমার ছোট্ট ছেলে দুটোকে এতিম করে দিল। এখন আমার সংসার চলবে কীভাবে? আমার স্বামী মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে সংসারটা চালাতেন, আমাদের খাওয়াতেন। এখন তো আর তিনি ফিরে আসবেন না। কোলে আট মাসের বাচ্চা নিয়ে আমি কোথায় যাব? আমার সন্তান দুটোর দায়িত্ব কে নেবে?’
গুমরে গুমরে কাঁদতে কাঁদতে এই কথাগুলো বলছিলেন নাজমা খাতুন। তিনি ওয়াহিদুজ্জামান শামীমের স্ত্রী। ধর্ম অবমাননার এক গুরুতর অভিযোগে গত মঙ্গলবার দফায় দফায় নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন শামীম।
নিহত ওয়াহিদুজ্জামান শামীম সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামসুল রহমানের সন্তান। তাঁর বড় ছেলে আয়ানের বয়স ১২ বছর, যে বর্তমানে নানাবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করছে। আর ছোট ছেলে আরহামের বয়স মাত্র আট মাস। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর পর সন্তানদের ভবিষ্যৎ এবং জীবনধারণ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা ও দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন নাজমা খাতুন।
ঘটনার সূত্রপাত গত সোমবার। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে প্রথমবার শামীমকে মারধর করা হয়। এই ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে শামীম আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এরপর তাঁকে স্থানীয় এক পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারে নিয়ে যাওয়া হয় চিকিৎসার জন্য। কিন্তু পরদিন মঙ্গলবার সেখান থেকে তাঁকে জোরপূর্বক বের করে পুনরায় পেটানো হয়। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলেও শান্তি মেলেনি। রাতে একদল লোক সেখানে হামলা চালিয়ে শামীমকে ছিনিয়ে নেয় এবং পুনরায় মারধর করে। এরপর তাঁকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
নাজমা খাতুন মুক্তকণ্ঠকে জানান, তাঁর স্বামী দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগতেন এবং নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হতো। তবে চরম আর্থিক সংকটের কারণে সবসময় ওষুধ কেনার টাকা জোগাড় করা সম্ভব হতো না। কখনো আত্মীয়স্বজন কিংবা পরিচিত মানুষের কাছে সাহায্য চেয়ে ওষুধ কিনতেন তিনি। মাঝেমধ্যে কাজ করে আয় করার চেষ্টা করলেও অসুস্থতার কারণে কয়েকদিন পর আবারও ঘরে পড়ে থাকতেন।
পারিবারিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে নাজমা বলেন, ‘আমাদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তেমন কোনো গন্ডগোল বা ঝামেলা হয়নি। তাঁর (শামীম) মাথা মাঝেমধ্যে গরম হয়ে যেত। আবার এক-দুই ঘণ্টা পর ঠিক হয়ে যেত। এ কারণে আমি বলেছিলাম, আমাকে বাবার বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে। মাথা ঠিক হলে আবার ফিরে আসব। সেই জন্য বাবার বাড়ি চলে গিয়েছিলাম। কিন্তু এমন হবে কখনো ভাবতে পারিনি।’
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে দেবহাটা থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন শামীমের বড় ভাই আবদুল জলিল। মামলার প্রধান আসামি হিসেবে ফজলুল হক আমিনীসহ ১০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে আরও ২০০ থেকে ২৫০ জনকে।
মামলা দায়েরের পর পুলিশ দুজন আসামিকে গ্রেপ্তার করলেও প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী এখনো ধরা ngoài। এমনকি শনিবার সকালেও তিনি ফেসবুকে সক্রিয় ছিলেন এবং শামীমকে নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট দিচ্ছিলেন। সকাল সাড়ে ৯টার একটি পোস্টে তিনি ধর্মীয় বিষয়ে মন্তব্যের প্রতিবাদ, রাজনৈতিক দলগুলোর ভূমিকা এবং সাগর-রুনি হত্যাসহ বিভিন্ন ঘটনার বিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ওই পোস্টের সাথে শামীমের কথোপকথনের একটি অডিও ক্লিপ যুক্ত করা হয়েছিল।
নাজমা খাতুন আর্তনাদ করে বলেন, ‘আমরা বিচার চাই। আমার স্বামী যদি কোনো অন্যায় করে থাকতেন, তাঁকে পুলিশের কাছে দিত, আইনের হাতে তুলে দিত। কেন এভাবে তাঁকে মেরে ফেলল? তিনি মানসিক রোগী ছিলেন, তাঁর মাথায় সমস্যা ছিল এটা সবাই জানত। যারা আমার এত বড় ক্ষতি করেছে, তাদের বিচার চাই।’
নিহত শামীমের ছোট ভাই তাওসিফ রহমান মুক্তকণ্ঠকে জানান, মামলা হওয়ার পর দুজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও প্রধান আসামি আমিনী এখনো পলাতক। তিনি ফেসবুকে সক্রিয় থেকে শামীমের মানসিকভাবে অসুস্থ অবস্থায় বলা কথাগুলো প্রচার করে যাচ্ছেন। তাঁরা দাবি জানিয়েছেন, এই ঘটনার সাথে জড়িত প্রতিটি মানুষকে আইনের আওতায় আনা হোক।
দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন মুক্তকণ্ঠকে জানান, প্রধান আসামি আমিনীকে আজকের মধ্যেই গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা আশা করছেন। গত শুক্রবার ভোরে উপজেলার সুবর্ণাবাদ ও নাজিরের ঘের এলাকা থেকে এজাহারভুক্ত দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যাদের পরবর্তীতে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়। বাকি আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
জানা গেছে, গত সোমবার শামীম ও তাঁর স্ত্রী নাজমার মধ্যে কথা বলার সময় ধারণ করা একটি অডিও ক্লিপ ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। ওই অডিওতে ধর্ম অবমাননাকর মন্তব্য রয়েছে বলে অভিযোগ উঠলে শামীমের বাড়িতে হামলার চেষ্টা করা হয়। ওই দিনই স্থানীয় একটি বাজারে তাঁকে প্রথমবার মারধর করা হয়, যার ফলে তিনি বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এরপরই তাঁকে পল্লিচিকিৎসকের কাছে নেওয়া হয়েছিল।
পরদিন মঙ্গলবার বিকেলে একদল লোক ওই চেম্বার থেকে তাঁকে বের করে পুনরায় মারধর করে। পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করলেও রাতে ফজলুল হকের নেতৃত্বে একদল লোক মিছিল করে হাসপাতালে হামলা চালায় এবং শামীমকে ছিনিয়ে নিয়ে আবারও পেটানো হয়। শেষ পর্যন্ত সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।
নাজমা খাতুন পুনরায় তাঁর দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমরা বিচার চাই। আমার স্বামী যদি কোনো অন্যায় করে থাকতেন, তাঁকে পুলিশের কাছে দিত, আইনের হাতে তুলে দিত। কেন এভাবে তাঁকে মেরে ফেলল? তিনি মানসিক রোগী ছিলেন, তাঁর মাথায় সমস্যা ছিল এটা সবাই জানত। যারা আমার এত বড় ক্ষতি করেছে, তাদের বিচার চাই।’