সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে (৩৮) পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনী নিজের কর্মকাণ্ডের জন্য কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করেননি। বরং তিনি এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে দাবি করেছেন। আমিনী স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দেশের আইনের দৃষ্টিতে তিনি অপরাধী হতে পারেন, তবে তিনি অনুতপ্ত নন।
রোববার (১৮ অক্টোবর) বিকেলে তাকে আদালতে নিয়ে যাওয়ার আগে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে বেলা তিনটার দিকে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) সদস্যরা তাকে সাতক্ষীরা সদর থানায় নিয়ে আসেন।
ঘটনার বিষয়ে ফজলুল হক আমিনী বলেন, ‘পিটিয়ে মারার উদ্দেশ্য ছিল না, দুর্ঘটনাবশত হয়ে গেছে। যে কাজটি করেছি, সেটি আল্লাহপাক ফয়সালা করবেন।’
নিহত শামীমের ধর্মীয় বিশ্বাস ও পরিচয় প্রসঙ্গে আমিনী দাবি করেন, ‘সে যে ওভাবে নাস্তিক ছিল, আমরা ধারণা পাইনি। বিভিন্ন দেশ থেকে নাস্তিকেরা যেভাবে মোবাইল করে হুমকি দিয়েছে, তাতে নিশ্চিত হয়েছি, সে নাস্তিক ছিল।’ এসব কথা বলার পর রোববার বিকেল চারটার দিকে তাকে আদালতে তোলা হয়।
অন্যদিকে, দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন জানিয়েছেন, ফজলুল হক আমিনী পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় নিজের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি আরও জানান, আসামি আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেবেন বলে জানিয়েছেন। এই কারণে পুলিশ মনে করছে যে, তাকে রিমান্ডে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
তদন্তের স্বার্থে ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্ট ও ভিডিও বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেবহাটা উপজেলার পারুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা ফজলুল হক আমিনী তার ‘Fh Ameni’ নামক ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মানুষকে জড়ো করার জন্য দুই দফায় লাইভ করেছিলেন।
গত ১৩ অক্টোবর (মঙ্গলবার) বিকেল ৩টা ৩১ মিনিটে প্রথমবার ফেসবুক লাইভে এসে ১৯ মিনিট ১৯ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে তিনি একটি অডিও শোনান। ওই অডিওটি শামীমের বলে দাবি করা হয়। সেখানে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ফজলুল হক শামীমের উপযুক্ত শাস্তির দাবি জানান এবং লাইভ চলাকালীনই শামীমের বাড়ির ঠিকানাও প্রকাশ করেন।
একই দিন বিকেল ৫টা ৩১ মিনিটে তিনি দ্বিতীয়বার লাইভে আসেন। এবার তিনি লাইভ করেন একজন পল্লিচিকিৎসকের চেম্বারের সামনে, যেখানে তখন শামীম চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। ৬ মিনিট ১৬ সেকেন্ডের এই লাইভে ফজলুল হক সবাইকে চেম্বারের সামনে আসার আহ্বান জানান এবং সেখানে জড়ো হওয়া লোকজনকে উসকে দিতে থাকেন। একপর্যায়ে সেখানে কয়েকশ মানুষের ভিড় জমে এবং শামীমকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য পল্লিচিকিৎসকের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়।
পরবর্তীতে ছড়িয়ে পড়া মারধরের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, মাটিতে লুটিয়ে পড়া শামীমকে ঘিরে রয়েছেন বহু মানুষ এবং কয়েকজন তার বুকের ওপর পা দিয়ে আঘাত করছিলেন। এছাড়া আরেকটি ভিডিওতে দেখা গেছে, শামীমের শাস্তির দাবিতে দেবহাটা উপজেলা সদরে একটি মিছিল বের করা হয়, যার সামনেই ছিলেন ফজলুল হক।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সাতক্ষীরার দেবহাটায় ইসলাম ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে দুই দফায় গণপিটুনি দেওয়া হয়, যার ফলে তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনার পর শামীমের পরিবারের পক্ষ থেকে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ ওই মামলায় এজাহারভুক্ত তিন আসামিকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠিয়েছে।