সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৪০) নামের এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। নিহতের পরিবারের দাবি, তাকে দুই দফায় নির্মমভাবে মারধর করা হয় এবং পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু ঘটে। নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের শামসুল রহমান সানার ছেলে।

স্থানীয় সূত্র এবং নিহতের স্বজনদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু অডিও কথোপকথনকে কেন্দ্র করে এই ঘটনার সূত্রপাত। ওই অডিওগুলোতে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন কিছু মন্তব্য শোনা গিয়েছিল। এই বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর গত সোমবার রাতে শামীমের বাড়িতে হামলা চালানো হয় এবং তাকে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন তার স্বজনরা।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, ওই রাতের ঘটনার পর শামীম আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এরপর পরিবারের সদস্যরা তাকে উদ্ধার করে কুলিয়ার সবুর ডাক্তারের চেম্বারে নিয়ে যান।

মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় পারুলিয়া ও কুলিয়া এলাকার স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অভিযোগ উঠেছে, একপর্যায়ে সবুর ডাক্তারের চেম্বার থেকে শামীমকে জোরপূর্বক বের করে এনে মারধর করা হয়। খবর পেয়ে দেবহাটা থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়।

তবে স্বজনদের অভিযোগ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার পর সেখানেও শামীমের ওপর দ্বিতীয় দফায় হামলা চালানো হয়। রাত ১১টার দিকে তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হলে পুলিশি পাহারায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

শামীমের স্ত্রী মোছা. নাজমান খাতুন বলেন, “ঘটনার দিন মাগরিবের নামাজের পর তার বাবা শামীমকে বাড়িতে নিয়ে যান। এরপর কী ঘটেছে, তা তিনি জানেন না। পরে ফোনে জানতে পারেন, তার স্বামী অসুস্থ হয়ে বিষপান করেছেন এবং তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। রাত ১১টার দিকে তিনি স্বামীর মৃত্যুর খবর পান।”

নিহতের মেজ ভাই খলিলুর রহমান দাবি করেন, ঘটনার দিন তার ভাইয়ের পরিবারের সদস্যদের মারধর করা হয়। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে স্থানীয় বাসিন্দা ও জামায়াতের সদস্যরা সেখানে জড়ো হন। একপর্যায়ে ওই বাড়িতে হামলার ঘটনাও ঘটে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

নিহতের আরেক ভাই আবদুল জলিল জানান, শামীম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালীন কয়েক বছর আগে বাড়ি ফেরার পথে অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছিলেন। তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে আনার পর থেকে তার মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং তিনি অস্বাভাবিক আচরণ করতেন। আবদুল জলিলের অভিযোগ, সোমবার রাতে শামীমের বাড়িতে হামলা ও ভাঙচুর করা হয় এবং এ সময় স্থানীয় একটি রাজনৈতিক দলের নেতারাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। এরপর শামীম আত্মহত্যার চেষ্টা করলে তাকে সবুর ডাক্তারের চেম্বারে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে তাকে দুই দফায় মারধর করা হয়।

ঘটনা প্রসঙ্গে দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন বলেন, “ধর্ম অবমাননার অভিযোগে এক যুবকের ওপর হামলার খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য সাতক্ষীরায় নেওয়া হলে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় এখনো কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি।”

ওসি আরও জানান, ময়নাতদন্তের জন্য শামীমের মরদেহ সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে এবং বর্তমানে ওই এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।