নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফকে গুলি করে হত্যার ঘটনাটি বাংলাদেশে সাংবাদিকতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতার এক করুণ চিত্র উন্মোচন করেছে। লুৎফুজ্জামান বেসরকারি আইপি টিভির প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামক পেজের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্যমান দুর্নীতি, মাদক পাচার এবং বিভিন্ন অপকর্মের খবর সাহসের সাথে প্রকাশ করে আসছিলেন। অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় এই যে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তাঁর ওপর একবার হামলা চালানো হয়েছিল, যা একটি আগাম সতর্কবার্তা ছিল।

এই ঘটনাটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি কীভাবে দিন দিন অপরাধের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং অপরাধীদের আরও দুঃসাহসী করে তোলে। বছরের পর বছর ধরে যে বিচারহীনতার পরিবেশ গড়ে উঠেছে, তার চরম মূল্য দিতে হয়েছে লুৎফুজ্জামানকে। দুর্গাপুরে অতীতেও একাধিক রোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়ার যে অভিজ্ঞতা স্থানীয় বাসিন্দাদের রয়েছে, তা বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা আরও কমিয়ে দিয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে সংবাদকর্মী ও সাংবাদিকতার পরিবেশ ক্রমশ অনিরাপদ হয়ে পড়ছে। গত কয়েক দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের দ্বারা সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে, সরকার সাইবার সুরক্ষা আইনের যে সংশোধনীর খসড়া প্রস্তাব পেশ করেছে, তা মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে গণমাধ্যমকর্মীরা উচ্চকণ্ঠে সতর্ক করেছেন। সাংবাদিকতা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তার প্রতিফলন দেখা গেছে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের (আরএসএফ) ২০২৬ সালের সূচকেও। সেখানে বাংলাদেশের অবস্থান আরও পিছিয়ে ১৫২তম স্থানে ঠেকেছে। ইতিমধ্যে ব্রাসেলসভিত্তিক দ্য ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) যথার্থই মন্তব্য করেছে, “সাংবাদিকদের ওপর এ ধরনের সহিংসতা কেবল মত ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্যই হুমকি নয়; বরং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের আইনের শাসনকেই ধূলিসাৎ করে দেয়।”

আমাদের বিশ্বাস, সরকারকে লুৎফুজ্জামান আলিফ হত্যার ঘটনার একটি নিরপেক্ষ, প্রভাবমুক্ত ও দ্রুত তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে জড়িত সকল ঘাতক এবং নেপথ্যের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা জরুরি। এটি কেবল একজন সাংবাদিকের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং দেশে ক্রমাগত অবনতির দিকে যাওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটালে সামগ্রিকভাবে নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতার বোধ দূর হবে না। সাংবাদিকদের যদি কথা বলা বা সংবাদ প্রকাশের পর জান ও মাল নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়, তবে দেশের আইনের শাসন ও গণতন্ত্র সবই হুমকির মুখে পড়বে।

আমরা মনে করি, যত দ্রুত সম্ভব লুৎফুজ্জামান হত্যার বিচার সম্পন্ন করতে হবে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংবাদিকদের ওপর যে হামলা চালানো হয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। সাংবাদিকদের জীবন হুমকির মুখে ফেলে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; আর সংবাদমাধ্যম যদি স্বাধীন না থাকে, তবে গণতন্ত্রও দ্রুত মুখ থুবড়ে পড়বে।