‘আমি আপনার এখানে বসে আছি, আমার ফোনে মেসেজ এসেছে, তারা (দুর্বৃত্তরা) দুইটা অস্ত্র নিয়ে বসে আছে। একটা নাইন এমএম, পাঁচটা গুলিসহ বসে আছে। আমি গেলে গুলি করবে। যদিও আজকে আমি যাব না।’

নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলামের কার্যালয়ে বসে প্রায় ১১ মাস আগে নিজের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে এমনই চরম শঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। দুর্ভাগ্যবশত, সেই আশঙ্কা বাস্তবায়িত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন তিনি।

গত বছরের ৩০ নভেম্বর পুলিশ সুপারের সঙ্গে সাংবাদিকদের এক মতবিনিময় সভায় আলিফ এই কথাগুলো বলেছিলেন। আজ শনিবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর সেই বক্তব্যের ২ মিনিট ৪৮ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়েছে, যা বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন করে আলো ফেলেছে।

ঘটনাটি ঘটে গত বৃহস্পতিবার রাতে। দুর্গাপুর পৌরসভার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের তেলনজিয়া গ্রামে শ্বশুরবাড়ির নিকটবর্তী স্থানে সাংবাদিক আলিফকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। পরিবারের দাবি, তাঁর মাথা, গলা ও বুকসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে অন্তত ছয়টি গুলি করা হয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর তাঁর স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা সাত থেকে আটজনের বিরুদ্ধে গতকাল শুক্রবার রাতে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

নিহত লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির বেসরকারি আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামক একটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে বিভিন্ন অনিয়ম, অপরাধ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লেখালেখি এবং ভিডিও প্রকাশ করতেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে হলেও তিনি তেলনজিয়ায় শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ সুপারের প্রতি আলিফ অভিযোগ করছেন যে দুর্গাপুর ও কলমাকান্দার সীমান্তবর্তী এলাকায় সশস্ত্র চোরাকারবারিদের আটটি সংঘবদ্ধ দল সক্রিয় রয়েছে। তিনি জানান, এসব অপরাধী চক্রের কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখালেখি করেন এবং পুলিশকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তবে তাঁর অভিযোগ, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পুলিশ সুপার যখন জানতে চান যে অপরাধীদের ধরা হয়নি নাকি পুলিশ ধরতে পারেনি, তখন আলিফ স্পষ্টভাবে জানান, তাদের ধরার কোনো চেষ্টাই করা হয়নি।

সেই আলাপচারিতার এক পর্যায়ে পুলিশ সুপার পাশে বসা এক অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে জানান, আলিফের করা মামলাটি পিবিআই দেখছে এবং দুজন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর জবাবে আলিফ বলেন, ‘আমি সবাইকে সাক্ষী রেখে বলছি, এই আসামিদের যদি না ধরা হয়, তাহলে হয় তাদের থেকে আমাকে বড় সন্ত্রাসী হতে হবে, না হয় দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে। এই সিদ্ধান্ত এখন আপনাকে নিতে হবে।’

একই ভিডিওতে আলিফ সতর্ক করেছিলেন যে, তাঁর স্ত্রী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায় শ্বশুরবাড়িতে হামলা বা অগ্নিসংযোগের আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপ নিতে পারে বলেও তিনি পুলিশ সুপারকে সতর্ক করেছিলেন।

শনিবার দুপুরে তেলনজিয়ায় আলিফের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে তাঁর বড় ভাই শহিদুল ইসলাম ফকির মুক্তকণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ভাই সব সময় সীমান্তে চোরাচালান, মাদকসহ বিভিন্ন অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে লেখালেখি করত। তাই তাঁকে যেকোনো সময় দুর্বৃত্তরা হামলা করতে পারে বলে আমাদের সন্দেহ ছিল। কিন্তু এভাবে তাঁকে গুলি করে মেরে ফেলবে, তা কখনো ভাবিনি।’

স্বামীর নিরাপত্তা নিয়ে চরম উদ্বিগ্ন ছিলেন স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা। তিনি মুক্তকণ্ঠকে জানান, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লেখালেখির কারণে প্রায়ই মুঠোফোনে হুমকি দেওয়া হতো আলিফকে। তিনি স্বামীকে লেখালেখি থেকে বিরত থাকতে অনুরোধ করলেও তিনি তা শুনতেন না। আনন্দিতা আরও বলেন, ‘আমার স্বামীর মোবাইলে হয়তো অনেক তথ্য আছে। এই ফোন ও ডিভাইসগুলো তো পুলিশের কাছে আছে। সেখানে হয়তো অনেক কিছু পাওয়া যাবে।’

দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমদ মুক্তকণ্ঠকে জানান, লেখালেখির কারণে আলিফের অনেক শত্রু ছিল এবং এ কারণে তাঁকে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। ঘটনার কয়েক দিন আগেও তিনি থানায় এসেছিলেন, তখন তাঁকে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে যাওয়ার আগে পুলিশকে জানাতে বলা হয়েছিল। ওসি আরও জানান, গত বছরের নভেম্বরেও আলিফের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছিল। সেই হামলার সঙ্গে বর্তমান হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হত্যার প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের শনাক্ত করতে তদন্ত চলছে।

এদিকে সাংবাদিক আলিফের নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে এবং দ্রুত বিচারের দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে সাংবাদিক সমাজ। শনিবার বেলা ১১টার দিকে নেত্রকোনা সাংবাদিক সমাজের ব্যানারে নেত্রকোনা জেলা প্রেসক্লাবের সামনে এবং বেলা সাড়ে ১১টার দিকে স্থানীয় সাংবাদিকদের উদ্যোগে দুর্গাপুর পৌরসভার প্রেসক্লাব মোড় এলাকায় মানববন্ধন করা হয়। এই কর্মসূচিতে অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়।

পুরো বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম মুঠোফোনে মুক্তকণ্ঠকে বলেন, সাংবাদিক আলিফ সাহসী লোক ছিলেন। তিনি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে পুলিশকে তথ্য দিতেন। ৫ অক্টোবর তিনি তাঁর কার্যালয়ে এসে দেখা করে যান। তখন সমস্যা হলে জানাতে বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি তখন জানিয়েছিলেন, কোনো সমস্যা নেই। তিনি আরও বলেন, ‘আমি যখন যোগদান করি, তখন মতবিনিময় সভায় এসে তিনি যে আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন, সেই অনুযায়ী পুলিশ ব্যবস্থা নিয়েছিল।’

পুলিশ সুপার আরও উল্লেখ করেন, আগের হামলার ঘটনায় আলিফ দুজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছিলেন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়, তবে বর্তমানে তারা জামিনে আছেন। আলিফের হত্যাকাণ্ডের পর থেকে ওই দুই আসামি পলাতক। পুলিশ বিভিন্ন দিক বিবেচনা করে তদন্ত করছে এবং দ্রুত জড়িতদের আইনের আওতায় আনার আশা প্রকাশ করেন তিনি।