নেত্রকোনার দুর্গাপুরে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের ডিটপুর গ্রামের মোহব্বত আলী ফকিরের সন্তান আলিফ তিন ভাইয়ের মধ্যে দ্বিতীয়। পেশায় সাবেক সেনা সদস্য এই সাংবাদিক দুর্গাপুর উপজেলার তিলনজিয়া এলাকায় বসবাস করতেন।

সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর তিনি গোয়েন্দা তথ্য ও আইপি টেলিভিশন রূপসী বাংলার জেলা প্রতিনিধি হিসেবে সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ। সম্প্রতি তাকে লক্ষ্য করে সন্ত্রাসীরা ছয়টি গুলি ছুড়েছে। পুলিশের ভাষ্যমতে, পেশাদার কিলার ছাড়া অনটার্গেট এতগুলো গুলি করা সম্ভব নয়। এখন প্রশ্ন উঠছে, কেন এমন নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো আলিফ ফকিরকে?

আলিফের ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ পেজ বিশ্লেষণ, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পুলিশের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তিনি মূলত সীমান্তে মাদক চোরাচালান ও অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন এবং বিভিন্ন অপকর্মের ভিডিও প্রকাশ করতেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ একাধিক হত্যা মামলার আসামি ও দুর্গাপুরের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছিল।

অভিযুক্তরা জামিনে মুক্ত হয়ে আলিফ ফকিরের ওপর হামলা ও হুমকি দিতে শুরু করে। নিজের নিরাপত্তা নিয়ে তিনি আগে থেকেই চরম শঙ্কিত ছিলেন এবং বেশ কয়েকবার অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান। গত বছর জানুয়ারি মাসে সন্ত্রাসীরা আলিফ ফকির ভেবে এক ব্যক্তিকে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে পালিয়ে যায়। তবে সেই হামলায় আলিফ ফকিরের মতো দেখতে পুলিশ সদস্য মো. শফিকুল ইসলাম নিহত হন। পরবর্তীতে ১০ নভেম্বর দুর্গাপুর তেরিবাজার এলাকায় আলিফ ফকিরের ওপর পুনরায় হামলা চালায় জামিনে মুক্ত সন্ত্রাসীরা, তবে সহকর্মীদের সহায়তায় তিনি রক্ষা পান।

এছাড়া মাদক ও গরু চোরাচালানের বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকার কারণে কলমাকান্দা উপজেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল পাঠানের সাথে তার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। পাশাপাশি নেত্রকোনার মাহমুদপুর এলাকার বাসিন্দা হামিদুর রহমান অভির চোরাচালানের একাধিক মামলার তথ্য প্রমাণ প্রকাশ করায় হুমকির মুখে পড়েন তিনি।

প্রচণ্ড হুমকির মুখে থেকেও সত্য প্রকাশে অটল ছিলেন সাংবাদিক আলিফ ফকির। অনুসন্ধানের প্রয়োজনে তিনি কখনো পাগল, কখনো হকার, মুচি কিংবা ভিক্ষুকের ছদ্মবেশ ধারণ করেছেন। এমনকি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের অভ্যন্তরেও তার সফল অনুসন্ধানী প্রতিবেদন রয়েছে। তার এই সাহসী প্রতিবেদনের কারণে মাদক চোরাকারবারী ও অপরাধ চক্রের কাজে বিঘ্ন ঘটছিল। পরিবার ও স্থানীয়দের ধারণা, সেই ক্ষোভ থেকেই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার দুর্গাপুর উপজেলার তিলনজিয়া এলাকায় বাড়ির মাত্র ২০ গজ দূরে একটি দোকানের সামনে প্রকাশ্যে তাকে গুলি করে। আলিফের মাথা, গলা ও বুকে মোট ছয়টি গুলি করা হয়, যার পাঁচটি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেলেও একটি বুলেট ভেতরে আটকে ছিল।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে গত শুক্রবার রাতে নিহতের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে অজ্ঞাত ৭/৮ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। শনিবার রাত পৌনে ১২টায় পুলিশ সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে সাজিবুল ইসলাম অপূর্বকে (২৭) গ্রেপ্তার করে।

এদিকে নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল নিহতের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলম ভূঁইয়ার মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা প্রদান এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়েছেন।

নিহতের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা অশ্রুসিক্ত নয়নে বলেন, “আমার ঘরেই একজন ‘সুপারম্যান’ ছিলেন। আমার স্বামী বাইরে থেকে কষ্ট করে এসেও ঘরের কাজে সাহায্য করত। সন্তানদের সময় দিত। সকালে আমাকে খাইয়ে ও বই গুছিয়ে দিয়ে কলেজের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে তবেই নিজের কাজে যেতেন তিনি।”

স্বামীর আকস্মিক প্রয়াণে আনন্দিতার পরিবার এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। মাথার ওপরের ছাদ এবং সন্তানদের মাথার ওপর থেকে বাবার বটবৃক্ষের ছায়া সরে যাওয়ায় তিনি গভীর বেদনায় আচ্ছন্ন।

লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের শাশুড়ি শিলা রাংসাও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম চিন্তিত। তার ভাষ্য, দুর্গাপুরে গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকজনকে হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু কেউ বিচার পায়নি। এর আগে সোমেশ্বরী নদীর ঘাটে মজিবুর নামের একজনকে, দুর্গাপুর বাজারে একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে এবং আদিবাসী নেতা ও কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুব্রত সাংমাকে হত্যা করা হয়েছে। কোনো ঘটনারই বিচার হয়নি এখন পর্যন্ত।

শিলা রাংসা আক্ষেপ করে বলেন, “এবার আমার মেয়ের জামাতাকে এতগুলো গুলি করে মেরে ফেলল। এখন আমরা কার কাছে বিচার চাইব? ছোট দুটি বাচ্চা নিয়ে আমার মেয়েটা কীভাবে চলবে? আমিও তো গরিব।”

স্বজনরা জানান, গত বছরের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা আলিফকে কুপিয়ে জখম করেছিল। তখন বাধা দিতে যাওয়া এক সহকর্মীকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়। এই ঘটনায় আলিফ ফকির বাদী হয়ে মামলা করলে পুলিশ দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে, যারা বর্তমানে জামিনে মুক্ত। পরিবার ও স্বজনদের ধারণা, গত এক মাসে ফেসবুক পেজে যাদের বিরুদ্ধে তিনি লিখেছিলেন, তারাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) রেজওয়ান আহমেদ জানিয়েছেন, হত্যার আলামত based করে অপূর্ব নামের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তার কাছ থেকে পাওয়া যেতে পারে এবং খুব শীঘ্রই মূল হোতাদের চিহ্নিত করা যাবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।