বাড়ির সামনে উড়ছে দুটি রঙিন বেলুন। একটি মুরগির আকৃতির, অন্যটি হাঙরের। চার বছর বয়সী ছোট্ট মুনতাহা জামান প্রান্তি জানাল, মুরগির বেলুনটি তার আর অন্যটি তার ছোট ভাইয়ের। এই বেলুন দুটি কিনে দিয়েছিলেন তার বাবা। কিন্তু বাবা এখন কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তরে আকাশের দিকে তাকিয়ে হাতের একটি আঙুল উঁচিয়ে মুনতাহা বলল, ‘আমার বাবা স্কাই হয়ে গেছে।’
‘স্কাই’ মানে আকাশ। মুনতাহা আবারও বলল, বাবা আল্লাহর কাছে চলে গেছেন। তবে বাবা যে আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না, সেই কঠিন সত্যটি বোঝার মতো বয়স এখনো হয়নি এই ছোট্ট শিশুটির।
মুনতাহার বাবা ছিলেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। গত ১৫ অক্টোবর রাতে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার তেলনজিয়ায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে তাঁকে হত্যা করা হয়। নিজের শ্বশুরবাড়ির কাছেই তিনি গুলিবিদ্ধ হন। স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে ওই বাড়িতেই বসবাস করতেন আলিফ।
গত শুক্রবার দুপুরে যখন আলিফের শ্বশুরবাড়িতে যাওয়া হয়, দেখা গেল টিনের ঘরের সামনের উঠানে আপন মনে খেলছে মুনতাহা। পরনে লাল গেঞ্জি এবং নীল রঙের হাফপ্যান্ট। কোঁকড়া চুলের শিশুটির মুখে তখন অমলিন হাসি। বাড়িতে অপরিচিত মানুষ এসেছেন বলে তার মনে কোনো সংকোচ নেই; কখনো কথা বলছে, আবার কখনো খেলায় মগ্ন।
পুরো উঠানজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নানা রঙের খেলনা। সেখানে একটি লাল রঙের দোলনা মোটরসাইকেল, পুতুল, টেডি বিয়ার, প্লাস্টিকের সিংহ এবং খেলনা চুলা দেখা যায়। পাশাপাশি পড়ে আছে খোলা বই-খাতা। একবার দেখা গেল মুনতাহা মোটরসাইকেলে চড়ে দুই হাতে হাতল ধরে দোল খাচ্ছে, আবার পরক্ষণেই নেমে বসছে খেলনাগুলোর পাশে। কখনো টেডি বিয়ার, কখনো পুতুল হাতে নিয়ে খেলছে সে। একটি পুতুলের মাথায় পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিতে দেখা গেল তাকে।
উঠানের এক পাশে মাটিতে গাছের ছায়া পড়েছে, চারপাশে টিনের ঘর। আর মাথার ওপর উড়ছে বাবার কিনে দেওয়া সেই বেলুন দুটি। এই উঠানেই এখন কাটে মুনতাহার সব সময়।
খেলনা আর খেলাধুলার এই রঙিন জগতে বাবার স্মৃতিগুলো গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। মুনতাহা ছিল তার বাবার অত্যন্ত আদরের। মেয়ের ছোট ছোট সব আবদার রাখতেন আলিফ। মুনতাহার খুব প্রিয় খাবার চিকেন ফ্রাই। কোনো দিন ভালো করে পড়াশোনা করলে সে বাবাকে চিকেন ফ্রাই আনতে বলত এবং বাবা বাইরে থেকে তা নিয়ে আসতেন। মেয়ের আনন্দেই তিনি নিজের আনন্দ খুঁজে পেতেন।
সেই বাবা আজ আর নেই। তবে তাঁর কিনে দেওয়া খেলনা আর বেলুনগুলো রয়ে গেছে। মুনতাহার ছোট্ট পৃথিবীজুড়ে এখনো সেসব নিয়েই তার ব্যস্ততা।
মুনতাহার মা খাদিজা আক্তার গারো সম্প্রদায়ের একজন নারী। আলিফের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের পর তাঁদের বিয়ে হয়। বিয়ের আগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর তাঁর নাম রাখা হয় খাদিজা আক্তার; আগে তাঁর নাম ছিল আনন্দিতা সাংমা। বাড়িতে অতিথি আসায় পানি, চা ও বিস্কুট পরিবেশন করলেন তিনি। মায়ের সঙ্গে আপ্যায়নের দায়িত্ব যেন নিয়েছে ছোট্ট মুনতাহাও। ছোট ছোট হাতে বিস্কুট নিয়ে বারবার এগিয়ে আসছিল সে, সবাইকে খাবার দিচ্ছিল। তার এই ব্যস্ততা দেখে বোঝার উপায় নেই যে, মাত্র কয়েক দিন আগে এই পরিবারে কতটা ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গেছে।
স্বামীর কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন খাদিজা। সেই মুহূর্তে মুনতাহা মায়ের পাশে বসে নির্বাক দৃষ্টিতে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। মা কথা বলছেন, সে শুনছে। একপর্যায়ে মা যখন কেঁদে উঠলেন, মুনতাহা তাঁর আরও কাছে চলে এল এবং নিজের ছোট্ট গালটি মায়ের গালের সঙ্গে লাগিয়ে রইল। মায়ের কান্নার কারণ সে কতটা বুঝতে পারছে তা জানা নেই, তবে সে মায়ের কাছ থেকে সরছিল না।
মুনতাহার ছোট ভাই আয়ান ফকির সাফওয়ানের বয়স মাত্র দেড় বছর। বাড়ির জীর্ণ ঘরের বিছানায় শুয়ে ছিল সে। বাবাকে হারানোর অর্থ বোঝার মতো বয়স তারও হয়নি। বাবা কীভাবে তাকে কোলে নিতেন বা কতটা আদর করতেন, বড় হয়ে হয়তো সেসব স্মৃতি তার মনে থাকবে না।
দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে এখন দিশাহারা এই মা। স্বামীর মৃত্যুর আগে থেকেই তাঁদের সংসারে আর্থিক টানাপোড়েন ছিল। সাংবাদিকতা করে আলিফ যা আয় করতেন, তা দিয়ে কোনোমতে সংসার চলত। সন্তানদের ভবিষ্যৎ আর সংসারের কথা ভেবে তাঁরা ঢাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।
খাদিজা নার্সিং পড়েছেন এবং ঢাকায় গিয়ে চাকরির চেষ্টা করার কথা ছিল তাঁর। আগামী নভেম্বর থেকে সেখানে থাকার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন স্বামী-স্ত্রী। তাঁদের ঢাকায় যাওয়ার ব্যবস্থা করতে আলিফের শাশুড়ি ৪০ হাজার টাকা ঋণ করেছিলেন।
মায়ের এসব দুশ্চিন্তার কিছুই বোঝে না চার বছরের মুনতাহা। সে এখনো তার খেলনা নিয়ে ব্যস্ত। বাড়ির সামনে উড়তে থাকা বেলুন দুটি দেখিয়ে সে জানাচ্ছে, বাবা কিনে দিয়েছেন। বাবা কোথায়, সে প্রশ্নের উত্তরও তার জানা, ‘স্কাই হয়ে গেছে।’
কিন্তু ঢাকায় যাওয়ার আগেই গুলিতে প্রাণ হারালেন আলিফ। মুহূর্তেই বদলে গেল পরিবারটির সব পরিকল্পনা। যে টাকা নিয়ে নতুন করে জীবন শুরুর কথা ছিল, ঋণের সেই ৪০ হাজার টাকাই এখন সংসার চালানোর একমাত্র ভরসা।
এই টাকা শেষ হলে কীভাবে সংসার চলবে, তা জানেন না খাদিজা। দুই শিশুর খাবার, চিকিৎসা ও পড়াশোনার খরচ কীভাবে জোগাবেন, সেই চিন্তাই তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে। যে মানুষটির সঙ্গে সংসার গড়েছেন, সন্তানদের বড় করার স্বপ্ন দেখেছেন, তিনি আর নেই। দুই সন্তানের ভবিষ্যতের সব দায়িত্ব এখন তাঁর একার কাঁধে।
মায়ের এসব দুশ্চিন্তার কিছুই বোঝে না চার বছরের মুনতাহা। সে এখনো খেলনা নিয়ে ব্যস্ত। বাড়ির সামনে উড়তে থাকা বেলুন দুটি দেখিয়ে জানাচ্ছে, বাবা কিনে দিয়েছেন। বাবা কোথায়, সে প্রশ্নের উত্তরও তার জানা, ‘স্কাই হয়ে গেছে।’