নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের মৃত্যুতে শোকার্ত তার পরিবার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে স্বামীর স্মৃতিচারণ করে এক হৃদয়বিদারক স্ট্যাটাস দিয়েছেন তার স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা। তার কাছে স্বামী ছিলেন একজন ‘সুপারম্যান’। ভালোবেসে তিনি তাকে ‘মনা’ বলে ডাকতেন।

আনন্দিতা সাংমা তার স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেছেন, তাদের বয়সের ব্যবধান অনেক থাকলেও স্বামী সবসময় তার সঙ্গে ছেলেমানুষি করতেন এবং তাকে হাসিখুশি রাখার চেষ্টা করতেন। তিনি যখনই স্বামীর দিকে তাকিয়ে থাকতেন, তখন আলিফ রসিকতা করে বলতেন, “আমাকে কি আর কখনো দেখসনাই? ছবি তুলে কতক্ষণ দেখতে থাক, ততক্ষণে আমি মামার দোকান থেকে আসি।”

তবে স্বামীর মৃত্যুর পর নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে আনন্দিতা অনুভব করেছেন, সেই চেনা মানুষটি আর কোনো কথা বলবেন না। কান্নায় চোখ ফুলে গেলে স্বামী যে কৌতুক করে তাকে হাসাতেন, সেই স্মৃতিগুলো এখন তাকে আরও বেশি কষ্ট দিচ্ছে।

সংসারের কাজ এবং সন্তানদের দেখাশোনা করে আনন্দিতা কীভাবে কলেজে যেতেন, তা নিয়ে তার বান্ধবীরা প্রায়ই অবাক হতেন। আনন্দিতার ভাষায়, তার ঘরেই ছিলেন একজন ‘সুপারম্যান’। বাইরে থেকে কাজ করে ফিরে এসেও স্বামী ঘরের কাজে সাহায্য করতেন, সন্তানদের সময় দিতেন এবং স্ত্রীকে কষ্ট করতে না দিয়ে নিজেই অনেক দায়িত্ব সামলে নিতেন। সকালে তাকে খাইয়ে, বই গুছিয়ে দিয়ে কলেজের গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতেন আলিফ, এরপর তিনি নিজের কাজে যেতেন।

স্বামীর অসীম ধৈর্যের কথা স্মরণ করে আনন্দিতা লিখেছেন, রাগারাগি করলেও আলিফ কখনো তাকে কড়া জবাব দিতেন না; বরং হাসিমুখে বিষয়টি এড়িয়ে যেতেন। রাত দুইটায় বাইরে থেকে আইসক্রিম এনে দেওয়া, গভীর রাতে উঠানে বসে তারা দেখার আবদার পূরণ করা কিংবা যখন-তখন ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছাকে তিনি গুরুত্ব দিতেন। স্ত্রী অসুস্থ হলে মাথায় পানি ঢেলে দেওয়া, তেল গরম করা কিংবা চুল বেঁধে দেওয়ার মতো ছোট ছোট যত্নের কথাগুলোও স্মরণ করেছেন তিনি।

স্বামীর আকস্মিক প্রস্থানে আনন্দিতার পরিবার এখন গভীর অনিশ্চয়তার মুখে। স্বামীকে হারানোর শোকের পাশাপাশি দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। সন্তানদের মাথার ওপর থেকে বাবার ছায়া সরে যাওয়ার বেদনা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে।

স্বামীকে ছাড়া টানা দুই রাত পার করার কথা উল্লেখ করে আনন্দিতা তার স্বামীর আত্মার মাগফিরাত ও জান্নাতুল ফেরদৌস কামনায় সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন। একই সঙ্গে তার স্বামী জীবদ্দশায় অজান্তে কাউকে কষ্ট দিয়ে থাকলে ছোট বোন হিসেবে তার হয়ে সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।

এদিকে লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরের শাশুড়ি শিলা রাংসাও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার অভিযোগ, দুর্গাপুরে গত কয়েক বছরে একাধিক হত্যাকাণ্ড ঘটলেও সেসব ঘটনার বিচার হয়নি। এর আগে সোমেশ্বরী নদীর ঘাটে মজিবুর নামের একজনকে হত্যা করা হয়। দুর্গাপুর বাজারে এক পুলিশ কর্মকর্তাকেও হত্যা করা হয়। এ ছাড়া আদিবাসী নেতা ও কুল্লাগড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুব্রত সাংমাকেও হত্যা করা হয়েছে। তার ভাষ্য, এসব ঘটনার কোনো বিচার এখনও হয়নি।

শিলা রাংসা বলেন, “এবার আমার মেয়ের জামাতাকে এতগুলো গুলি করে মেরে ফেলল। এখন আমরা কার কাছে বিচার চাইব? ছোট দুটি বাচ্চা নিয়ে আমার মেয়েটা কীভাবে চলবে? আমিও তো গরিব।”

স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা আলিফকে কুপিয়ে জখম করেছিল। ওই সময় তার সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়। এ ঘটনায় আলিফ ফকির বাদী হয়ে মামলা করেন। পরে পুলিশ মামলায় নাম উল্লেখ করা দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে, তবে বর্তমানে তারা জামিনে রয়েছেন।

পরিবার ও স্বজনদের ধারণা, গত এক মাসে ফেসবুক পেজে যাদের বিরুদ্ধে আলিফ লেখালেখি করেছিলেন, তারাই এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন।

গত বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকে দুর্গাপুর উপজেলার তিলনজিয়া এলাকায় দুর্বৃত্তরা প্রকাশ্যে গুলি করে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকিরকে হত্যা করে। তিনি সীমান্তে মাদক ও চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। তার এই অকাল মৃত্যুতে স্ত্রী ও দুই সন্তান তাদের অভিভাবককে হারালেন।