নেত্রকোনার দুর্গাপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান ফকির আলিফ। তাঁর লাশের ময়নাতদন্ত শেষে জানা গেছে, শরীরে মোট ছয়টি গুলির আঘাতের চিহ্ন ছিল। এর মধ্যে পাঁচটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেলেও একটি গুলি পিঠের ভেতরেই আটকে ছিল। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুর্গাপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার রাতে আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় মামলাটি দায়ের করেন। এই মামলায় সাত থেকে আটজনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। মামলার বিষয়ে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ খান মুক্তকণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন। আজ শনিবার সকাল সোয়া ৯টার দিকে মুঠোফোনে তিনি বলেন, “আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।”

এর আগে শুক্রবার বিকেলে নেত্রকোনা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক সদর হাসপাতালের মর্গে লুৎফুজ্জামানের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। এরপর তাঁর মরদেহ নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক শ্রদ্ধ্যানন্দ নাথ সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, “লুৎফুজ্জামানের বুকে তিনটি গুলির আঘাত রয়েছে। এর মধ্যে দুটি গুলি শরীর ভেদ করে বেরিয়ে গেছে। অন্যটি পিঠের ভেতরে আটকে ছিল। এ ছাড়া কপালের ডান পাশ দিয়ে ঢুকে একটি গুলি মাথার পেছন দিক দিয়ে বেরিয়ে যায়। বাকি দুটি গুলির একটি মাথার ওপরের অংশের চামড়া এবং অন্যটি ডান কাঁধের পাশের চামড়া ভেদ করে বেরিয়ে গেছে।” ক্ষতের ধরন বিশ্লেষণ করে ওই চিকিৎসক প্রাথমিকভাবে ধারণা করছেন, আলিফকে সামনের দিক থেকে পিস্তল দিয়ে গুলি করা হয়েছিল।

নিহত লুৎফুজ্জামান বেসরকারি আইপি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন, যেখানে বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধের বিষয়ে লেখালেখি এবং ভিডিও প্রকাশ করতেন। তিনি কলমাকান্দা উপজেলার পোগলা ইউনিয়নের সুনই গ্রামের মহব্বত আলী ফকিরের পুত্র। তিনি তেলনজিয়ায় তাঁর শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন।

স্বামী হত্যার ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন আনন্দিতা সাংমা। তাঁদের দুটি শিশুসন্তান রয়েছে। স্বামীকে হারিয়ে সন্তানদের নিয়ে ভবিষ্যৎ কীভাবে চলবে, সেই গভীর দুশ্চিন্তার কথা প্রকাশ করেছেন তিনি।

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন রাত আটটার দিকে তেলনজিয়া এলাকার একটি চায়ের দোকানে চা পান করেন আলিফ। চা পান শেষে তিনি বিরিশিরি উতরাইল বাজারের উদ্দেশে রওনা হন। তবে নিজের মুঠোফোন দোকানে ফেলে যাওয়ার কথা বুঝতে পেরে মিনিট তিনেকের মধ্যেই তিনি পুনরায় ফিরে আসেন। তিনি যখন মুঠোফোন নিয়ে বের হচ্ছিলেন, ঠিক সেই সময় দুই যুবক ওই দোকানে এসে দোকানদারের কাছে সিগারেট চায়। এরপরই তারা আলিফকে লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি গুলি ছোড়ে। গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় লোকজন ছুটে এলে ওই দুই যুবক দ্রুত পালিয়ে যায়। পরে তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার পর পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মুক্তকণ্ঠকে জানিয়েছিলেন, “প্রাথমিকভাবে এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। হত্যায় জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।” পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে পিস্তলের গুলির খোসা ও একটি অবিস্ফোরিত গুলি উদ্ধার করেছে।

উল্লেখ্য, গত বছরের ১০ নভেম্বর দুর্গাপুর উপজেলার সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় দুর্বৃত্তরা আলিফকে কুপিয়ে জখম করেছিল। সেই সময় তাঁর সঙ্গে থাকা এক সহকর্মী বাধা দিতে গেলে তাঁকেও অস্ত্র দেখিয়ে ধাওয়া করা হয়। এই ঘটনায় আলিফ বাদী হয়ে মামলা করলে পুলিশ নাম উল্লেখ করা দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে, তবে বর্তমানে তারা জামিনে মুক্ত রয়েছেন।

আলিফের বড় ভাই শহীদ ইসলাম ফকির বলেন, “সাংবাদিকতা করার কারণে তাঁর ভাইয়ের অনেক শত্রু হয়েছিল।” তিনি তাঁর ভাইকে নির্মমভাবে হত্যার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।