নেত্রকোনার দুর্গাপুরে সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির হত্যা মামলায় বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই আসামি আদালতে দেওয়া তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানিয়েছেন, পুরো হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন তাজুল ইসলাম। জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই নৃশংস ঘটনায় সরাসরি পাঁচজন অংশ নিয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে তাজুল নিজেই পিস্তল ব্যবহার করে আলিফকে গুলি করেন। পুলিশ আদালতের জবানবন্দির বরাত দিয়ে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
রোববার (১ নভেম্বর) বিকেলে দুর্গাপুর চৌকি আদালতের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নুরুল আমিন ভুঁইয়ার সামনে দণ্ডবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন ইমরান ইসলাম ওরফে ইমন (২৪) ও মো. সাব্বির আহম্মেদ (২৫)। বিকেল পৌনে চারটায় শুরু হওয়া এই জবানবন্দি প্রক্রিয়া সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত চলে। জবানবন্দি শেষে বিচারক তাদের কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খন্দকার শাকের আহমেদ জানান, আদালতের জবানবন্দিতে দুই আসামি উল্লেখ করেছেন যে, সাংবাদিক আলিফের সঙ্গে তাজুল ইসলামের দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল। মূলত সেই বিরোধের জেরেই এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়। আসামিরা জানিয়েছেন, তারা তাজুলের সহযোগী হিসেবে কাজ করতেন এবং সীমান্ত এলাকায় তাদের বিভিন্ন ব্যবসা ছিল। সাংবাদিক আলিফ ওই ব্যবসায় বাধা সৃষ্টি করতেন এবং পুলিশকে বিভিন্ন তথ্য প্রদান করতেন। এছাড়া ব্যবসা পরিচালনার জন্য তাকে প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিতে হবে বলে আলিফ দাবি করেছিলেন বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কারণে আলিফের প্রতি তাদের তীব্র ক্ষোভ ছিল।
ওসি আরও জানান, দুই আসামির ভাষ্য অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডে সরাসরি পাঁচজন অংশ নেন। তাজুল ইসলাম পিস্তল দিয়ে আলিফকে গুলি করেন। এরপর তার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর এবং আশপাশে লোকজন চলে যাওয়ার সুযোগ বুঝে তারা ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান।
তদন্তের স্বার্থে জবানবন্দিতে আসা তাজুল ছাড়া অন্য জড়িতদের নাম এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে জানান ওসি। তিনি বলেন, "তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না। হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবাইকে গ্রেপ্তার করার লক্ষ্যেই তাদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে।"
নেত্রকোনার পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলাম জানান, দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানে হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে তাজুল ইসলামের নাম এসেছে। সহযোগী হিসেবে নিজেদের নাম ছাড়াও আরও কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন তারা।
পুলিশ সুপার আরও বলেন, মামলার তদন্ত কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়েছে। হত্যাকাণ্ডে আর কারা জড়িত, সে বিষয়ে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, দ্রুত তাদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে বিস্তারিত জানানো হবে।
এর আগে শনিবার ভোরে সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ধনপুর বাজার এলাকা থেকে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল ইমরান ও সাব্বিরকে গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত মোট চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে ১৮ অক্টোবর সাজিবুল ইসলাম ওরফে অপূর্ব এবং ২০ অক্টোবর আশিকুর রহমান ওরফে প্রাঙ্গণকে গ্রেপ্তার করা হয়, যাদের পরবর্তীতে পুলিশ রিমান্ডে নেওয়া হয়েছিল।
এদিকে নিহত সাংবাদিক আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বর্তমানে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বেসরকারি হাসপাতালে নার্স হিসেবে চাকরিতে যোগ দিয়েছেন। নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সহযোগিতায় তার এই চাকরির ব্যবস্থা করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার তিনি কাজে যোগ দিয়েছেন এবং বর্তমানে দুই সন্তান ও মাকে নিয়ে ঢাকায় অবস্থান করছেন।
স্বামীর নির্মম হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে আনন্দিতা সাংমা বলেন, "গত বছরের ১০ নভেম্বর সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাটে আমার স্বামীর ওপর যখন হামলা হয়েছিল, তখন তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন, নদীর তীরে দূরে তাজুল ইসলাম পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। ওই হামলায় ইমন, সাব্বির ও সৌরভ ছিল বলেও আমার স্বামী জানিয়েছিলেন।"
তিনি আরও বলেন, "আমি চাই, তাজুল ইসলাম ও শুটার শামীমসহ এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেক আসামিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করা হোক। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আমি আমার স্বামীকে আর কখনও ফিরে পাব না। কিন্তু যারা তাকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করেছে, আমার দুই সন্তানকে এতিম করেছে, আমাকে স্বামীহারা করেছে, তাদের শাস্তি দেখে যেতে চাই। আমি তাদের ফাঁসি চাই।"
উল্লেখ্য, গত ১৫ অক্টোবর রাতে দুর্গাপুর উপজেলার শ্যামগঞ্জ-বিরিশিরি সড়কের উত্রাইল বাজারসংলগ্ন তেলনজিয়া এলাকায় গুলিতে নিহত হন সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। তিনি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল রূপসী বাংলার নেত্রকোনা প্রতিনিধি ছিলেন। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন, যেখানে তিনি সীমান্ত এলাকার চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধ ও অনিয়ম নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করতেন।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন আলিফের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বাদী হয়ে দুর্গাপুর থানায় অজ্ঞাতপরিচয় সাত থেকে আটজনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।