সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ধর্ম অবমাননার অভিযোগ’ তুলে আবারও মব তৈরি করে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা সামনে এসেছে। সাতক্ষীরার দেবহাটে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক যুবককে এভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। প্রথম দফায় গণপিটুনির পর তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে পুনরায় হামলা চালানো হয়। গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। তবে ভুক্তভোগীর পরিবারের দাবি, শামীম মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না এবং কয়েক দিন আগে তিনি বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন।

শামীমের এই করুণ ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, বর্তমান বাংলাদেশে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তোলা যেন সবচেয়ে সহজ এবং ঝুঁকিমুক্ত ‘মবলিঞ্চিং’-এর (গণপিটুনি) একটি উপায়ে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের কিছু ভয়াবহ উদাহরণ এই পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে।

গত ১১ এপ্রিল কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে পীর আবদুর রহমান ওরফে শামীমের দরবারে একদল লোক হামলা চালায়। সেখানে পুলিশের উপস্থিতিতেই শামীমকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একইভাবে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় ইসলাম সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্যের অভিযোগে দীপু চন্দ্র দাস নামের এক সনাতন ধর্মাবলম্বী যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয় এবং পরবর্তীতে তাঁর মরদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়।

আবার গত বছরের ৬ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে ‘তৌহিদি জনতা’ পরিচয়ে নুরুল হক ওরফে ‘নুরাল পাগলা’র কবর, বাড়ি ও দরবারে হামলা চালানো হয়। এমনকি নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে মহাসড়কের পদ্মার মোড় এলাকায় এনে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। আরও পেছনে তাকালে দেখা যায়, ২০২০ সালের ২৯ অক্টোবর লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার বুড়িমারীতে পবিত্র কোরআন অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ তুলে আবু ইউনুস মোহাম্মদ শহীদুন্নবী নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে হত্যা করা হয়।

বিগত পাঁচ-ছয় বছরের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে দৃঢ়ভাবে বলা যায়, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ধারাবাহিকভাবে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জানমালের ওপর আঘাত করা হচ্ছে। এসব ঘটনার পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা ছক দৃশ্যমান। প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত নির্ধারিত: প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ আনা হয়, এরপর সেটিকে কেন্দ্র করে গণ-অসন্তোষ বা মব তৈরি করা হয় এবং সবশেষে হিংস্রভাবে হামলা চালানো হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত প্রকাশ্যে ঘটে।

বাংলাদেশে আগে ‘পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে’ এমন গুজব বা ছিনতাইকারী ও চোর সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। তবে সাধারণ গণপিটুনির ঘটনাগুলো যতটা ‘অপরিকল্পিত’ বা ‘আচমকা’, ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে করা মবলিঞ্চিংয়ের ঘটনাগুলো ততটাই ‘পরিকল্পিত’।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুললে কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করা এখন এতটাই সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, পুলিশ-প্রশাসন রীতিমতো নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ফলে অনেক হত্যাকাণ্ড খোদ পুলিশের সামনেই ঘটেছে। কুষ্টিয়ার ঘটনায় পুলিশের উপস্থিতিতেই হত্যাকাণ্ডটি সংঘটিত হয়। একইভাবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গণ-অভ্যুত্থানের পরপরই খুলনায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তিন বাহিনীর উপস্থিতিতেই এক কিশোরকে চরম গণপিটুনি দেওয়া হয়।

অতীতে দেখা গেছে, সংখ্যালঘু ব্যক্তির ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে বা তাঁর নাম ব্যবহার করে ভুয়া ‘অবমাননামূলক’ মন্তব্য পোস্ট করা হতো এবং সেটিকে বাহানা করে পুরো সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চালানো হতো। কিন্তু ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি বিপজ্জনক পরিবর্তন এসেছে। এখন ফেসবুকে সরাসরি স্ট্যাটাস বা ভিডিওর মাধ্যমে বিভিন্ন মাজার ও দরবারে হামলার ঘোষণা দেওয়া হয়, সহিংসতার সামাজিক ও রাজনৈতিক সম্মতি তৈরি করা হয় এবং প্রকাশ্যে লোক জড়ো করে হামলা চালানো হয়। গত দুই বছরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মাজারে হামলা ও ভাঙচুরের প্রতিটি ঘটনায় এই প্রবণতা দিবালোকের মতো স্পষ্ট। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সংঘটিত সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডগুলোতেও একই ছক কাজ করছে।

এই নতুন প্রবণতা আরেকটি দিক উন্মোচন করেছে। সাধারণত ‘মব’ বলতে আমরা একটি ‘মুখহীন’ হিংস্র অবয়ব ধরে নিই, যার ফলে মূল হোতাকে চিহ্নিত করা কঠিন হয়। সমাজবিজ্ঞানীদের কাছে এটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন যে, মূল হোতা যে-ই হোক, কেন সাধারণ মানুষ এই বিচারহীন সহিংসতার অংশ হয়। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেই অনুমান আর খাটছে না। কারণ, যিনি উসকানি দিচ্ছেন এবং পরিকল্পনাকারী, তাঁর পরিচয় ও চেহারা এখন অত্যন্ত স্পষ্ট। তিনি কোনো আড়াল না রেখে প্রকাশ্যে ভিডিও বা স্ট্যাটাস দিয়ে অপরাধটি ঘটানোর প্রত্যক্ষ আহ্বান জানাচ্ছেন। একদিকে সহিংসতাকে ‘মব’ বা উগ্র জনতার রূপ দেওয়া একটি কার্যকর কৌশল হয়ে উঠেছে, অন্যদিকে উসকানিদাতারা আর পরিচয় লুকানোর প্রয়োজন বোধ করছেন না।

উদাহরণস্বরূপ, গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, সাতক্ষীরার শামীমের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ তুলে ফজলুল হক আমিনী নামের এক ব্যক্তি ফেসবুকে সরাসরি লাইভ করেন। সেই লাইভ ভিডিওটি এখনো তাঁর ফেসবুকে বিদ্যমান। শামীমের মৃত্যুর পর তিনি মরদেহের ছবি পুনরায় ফেসবুকে পোস্ট করে উল্লাস প্রকাশ করে লেখেন, “আলহামদুলিল্লাহ, তিনি মারা গেছেন, আল্লাহকে নিয়ে কটূক্তি, রাসুলকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য, কোরআনকে নিয়ে অশালীন বক্তব্য প্রদানকারী অহিদুজ্জামান শামীম মুরতাদ মারা গিয়েছে আলহামদুলিল্লাহ।”

এমনকি তাঁর সর্বশেষ পোস্টে লিখেছেন, “আপনাদের কি জানতে ইচ্ছে করে না, মুরতাদ শামীমকে কেন গণপিটুনি দেয়া হলো।” প্রতিটি পোস্টের কমেন্ট বক্স ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ধ্বনিতে সয়লাব। এমন নৃশংসতার পর এই সমষ্টিগত উল্লাস বা গণবিকারগ্রস্ততার মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক ব্যাখ্যা অনুসন্ধানের দায়িত্ব সমাজবিজ্ঞানীদের ওপর ছেড়ে দেওয়া যাক।

কিন্তু রাষ্ট্র ও প্রশাসনের কাছে এখন সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে উসকানি দিয়ে একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটালেন, তাঁর বিরুদ্ধে সরকার ও পুলিশ-প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিচ্ছে? এই প্রশ্নটিই এখন রাষ্ট্রের অস্তিত্বের মূল প্রশ্ন। সরকার ও প্রশাসনের প্রধান কাজ হলো নাগরিকের মৌলিক অধিকার ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু ধর্ম অবমাননার মতো সংবেদনশীল অভিযোগ উঠলেই পুলিশ-প্রশাসন প্রায় ‘সক্রিয়’ভাবেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। অপরাধ ঘটার আগে, চলাকালীন এবং পরে তাদের এই নিষ্ক্রিয়তা বজায় থাকে।

গত ছয়-সাত বছরে ধর্মীয় অবমাননার দোহাই দিয়ে যতগুলো হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, তার একটিরও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হয়নি। কুষ্টিয়ার ঘটনায় নামকাওয়াস্তে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও মূল ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকের নাম এজাহারভুক্ত করা হয়নি বলে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। অসংখ্য মাজারে হামলা ও ভাঙচুর হলেও প্রকৃতপক্ষে কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বা বিচার নিশ্চিত হয়েছে, তা অস্পষ্ট।

রাষ্ট্র ও সরকারের দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তাই এমন এক বিষাক্ত পরিবেশ তৈরি করেছে, যেখানে উসকানিদাতা থেকে শুরু করে অংশগ্রহণকারী—সবাই নিশ্চিত থাকে যে তারা আইনের মুখোমুখি হবে না। তাই এখন অবধারিত প্রশ্ন হলো: সরকার ও রাষ্ট্র কি আদৌ তার নাগরিকের জান ও মালের নিরাপত্তা দিতে পারছে কিংবা ভবিষ্যতে পারবে? ক্ষমতায় আসার পর সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছিল, ‘মব কালচার’-এর দিন শেষ। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার ন্যূনতম কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। উল্টো বিভিন্ন সময় হামলার ঘটনা বা নাগরিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে জায়েজ করতে দেখা গিয়েছে মন্ত্রীদের। এটা আমাদের সামষ্টিক ট্র্যাজেডি যে নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের মতো প্রাথমিক দাবিগুলো এত বছর পরও ঘুরেফিরে তুলতে হচ্ছে।

সহুল আহমদ
লেখক ও গবেষক
(মতামত লেখকের নিজস্ব)