মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে আমাদের শিশুদের চরম নিরাপত্তাহীনতার এক উদ্বেগজনক চিত্র। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত এই ছয় বছর সময়ে দেশে ৩ হাজার ৪৮৭ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। একই সময়ের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২ হাজার ৫৯৮ শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং ১১ হাজার ৪৫৮ জন শিশু পঙ্গুত্ব কিংবা গুরুতর আঘাতের মতো চরম ট্র্যাজেডির মুখোমুখি হয়েছে। পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও সরকার—কোনো পক্ষই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না, যা বর্তমান সময়ের এক ভয়াবহ অশনিসংকেত।

এইচআরএসএসের তথ্যের গভীরে গেলে দেখা যায়, গত ছয় বছরে দেশে মোট ৬ হাজার ১৫৩টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, যার অর্ধেকেরও বেশি শিকার হয়েছে নিষ্পাপ শিশুরা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ধর্ষণের পর ১৩১ শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এবং ১ হাজার ২৫৫টি শিশু যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। এই পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যা আসলে একটি করে ধ্বংস হয়ে যাওয়া জীবনের গল্প এবং একটি পরিবারের আজীবনের কান্নার বহিঃপ্রকাশ।

আমাদের দেশের সংবিধানে এবং প্রচলিত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে শিশুদের সুরক্ষার জন্য অত্যন্ত কঠোর সব বিধান রাখা হয়েছে। তবে বাস্তব চিত্রটি ভিন্ন; আইনের সঠিক প্রয়োগের অভাব এবং বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীদের মনে কোনো ভীতির সঞ্চার হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা আইনি ফাঁকফোকর, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা সামাজিক নীরবতার সুযোগ নিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। মূলত এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই শিশু নির্যাতনকারীদের দিন দিন আরও বেপরোয়া করে তুলছে।

শিশুদের ওপর এই অমানবিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত সহিংসতা বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্র ও সমাজকে এখনই কঠোর এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে হবে। দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। তদন্ত প্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের অবহেলা বা আপসকামিতা রোধ করে যথাযথ চার্জশিট দাখিল নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং পাড়া-মহল্লা পর্যায়ে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিতে ব্যাপক সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। বিচার পাওয়ার প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো যাতে কোনো ধরনের হুমকি বা চাপের মুখে না পড়ে, সে বিষয়ে আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা প্রদান করতে হবে।

একটি দেশ কতটা সভ্য বা উন্নত, তার অন্যতম প্রধান মাপকাঠি হলো সেখানে শিশুরা কতটা নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারছে। আমরা যদি আমাদের শিশুদের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে নিরাপদ একটি সমাজ উপহার দিতে না পারি, তবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি কিংবা অবকাঠামোগত উন্নয়নের কোনো মূল্য থাকবে না। তাই বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ দেশ গড়ে তোলা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় তাগিদ।