কওমি মাদ্রাসা বাংলাদেশের ধর্মীয় ও শিক্ষাচর্চার একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। এখানে যৌন নির্যাতনের মতো ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠলে তা নিয়ে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একদিকে পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে দোষারোপ করা হয়, অন্যদিকে বিষয়টিকে কেবল ব্যক্তিগত নৈতিক অবক্ষয়ের ফল হিসেবে উপেক্ষা করা হয়। উভয় দৃষ্টিভঙ্গিই সমস্যার মূল সত্য থেকে সরে যায়। শিশু নির্যাতন কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া সমস্যা নয়; এটি পরিবার, স্কুল, ক্রীড়া সংগঠনসহ বিভিন্ন স্থানে ঘটে। তাই কওমি মাদ্রাসাকে স্বাভাবিকভাবেই অপরাধপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করা যেমন ভুল, তেমনি তাদের ভাবমূর্তির কারণে এই সমস্যাটি অস্বীকার করাও বিপজ্জনক।

প্রশ্ন হলো, প্রতিষ্ঠানের কাঠামো, ক্ষমতার সম্পর্ক ও অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা অপরাধের সুযোগ কতটা বাড়িয়ে দেয়? কওমি মাদ্রাসায় রাষ্ট্রীয় নজরদারি কম থাকলেও সামাজিক নিয়ন্ত্রণের অভাব নেই। তবে সামাজিক তদারকি এবং শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা আলাদা। সমাজ সাধারণত পড়াশোনার গুণমান বা প্রতিষ্ঠানের খ্যাতি দেখে, কিন্তু শিশু সুরক্ষা জানতে চায় শিক্ষকদের আচরণ, অভিযোগের পথ, প্রমাণ সংরক্ষণ, আইনি সহায়তা ও মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা সম্পর্কে। এই পার্থক্য উপেক্ষা করলে নিরাপত্তার দুর্বলতা ধরা পড়বে না।

আবাসিক মাদ্রাসার চরিত্র এখানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আবাসিকতা নিজে সমস্যা নয়, বরং শিক্ষা ও তারবিয়াতের জন্য প্রয়োজনীয়। কিন্তু শিশুর খাবার, ঘুম, শাস্তি ও বাইরে যাওয়ার নিয়ন্ত্রণ একই কর্তৃপক্ষের হাতে থাকায় শিক্ষকরা অভিভাবকের বিকল্পে পরিণত হন। এই ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা অপরিচ্ছন্ন মনোভাবের ব্যক্তিদের শোষণের সুযোগ করে দেয়। তাই দায়িত্বের রোটেশন, রাতের ডিউটি বণ্টন, ছুটির রেকর্ড ও লিখিত হস্তান্তর ব্যবস্থা অপরিহার্য।

নির্যাতনের আগে প্রায়ই ‘গ্রুমিং’ বা আস্থা অর্জনের খেলা চলে। শিশুর কাছে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া, গোপনীয়তা তৈরি ও ধীরে ধীরে প্রতিরোধ দুর্বল করার পর ভয় বা লজ্জায় শিশুকে নীরব রাখা হয়। অনেক সময় শিশু নিজেই বুঝতে পারে না তার সঙ্গে কী ঘটছে। অভিযোগ আসার পর প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই ‘হুজুর এমন করতে পারেন না, ছেলেটা মিথ্যা বলছে, বদনাম হবে’—এই মানসিকতায় আক্রান্ত হয়ে শিশুর বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। গুরুতর যৌন নির্যাতন সাধারণ সামাজিক বিরোধ নয়; স্থানীয় সালিস বা আপস এর বিকল্প হতে পারে না।

অভিযোগ উঠলে প্রথম কাজ শিশুকে নিরাপদ করা, অভিযুক্তকে শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা, প্রমাণ সংরক্ষণ, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা। একই সাথে অভিযুক্তের ন্যায্য তদন্ত ও অধিকার রক্ষা করতে হবে। জবাবদিহি প্রতিশোধ নয়, সত্য উদ্‌ঘাটনের প্রক্রিয়া। কওমি সমাজের সামাজিক আস্থা এখানে শক্তি ও ঝুঁকি দুটোই। সম্মানিত আলেমের বিরুদ্ধে অভিযোগ এলে মানুষ প্রায়ই পুরোনো বিশ্বাস রক্ষা করতে চায়। অথচ সম্মান দেখানো এবং স্বাধীন তদন্ত দাবি করা পরস্পরবিরোধী নয়। প্রকৃত সম্মান এমন ব্যবস্থাই চায়, যেখানে নির্দোষ মিথ্যা অভিযোগ থেকে রক্ষা পাবেন এবং অপরাধী পদমর্যাদা বা ধর্মীয় প্রভাবের টানে রেহাই পাবেন না।

রেকর্ড অনুযায়ী, বেশিরভাগ মামলা হিফজ, নুরানি বা নিম্নমাধ্যমিক স্তরের দিকে ইশারা করে, যেখানে নজরদারি সবসময় তীব্র থাকে না। তাই শিক্ষক নিয়োগে ধর্মীয় যোগ্যতার পাশাপাশি শিশু মনোবিজ্ঞান, পেশাগত সীমারেখা, নির্যাতনের লক্ষণ ও আইনি দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। নিয়োগের আগে পরিচয়, রেফারেন্স ও অপরাধের ইতিহাস যাচাই করতে হবে। শুধু পুলিশ ভেরিফিকেশন যথেষ্ট নয়; ধারাবাহিক তদারকি ও আচরণবিধি প্রয়োজন।

প্রতিটি আবাসিক মাদ্রাসায় লিখিত শিশু সুরক্ষা নীতি, প্রশিক্ষিত দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও একাধিক নিরাপদ অভিযোগের পথ থাকা জরুরি। সাধারণ স্থান, করিডর ও সিঁড়িতে সিসিটিভি কার্যকর হতে পারে, তবে শোবার ঘর বা বাথরুমে নয়। ফুটেজ কে দেখবে, কতদিন সংরক্ষণ হবে ও অভিযোগের পর তা প্রমাণ হিসেবে কীভাবে ব্যবহার হবে, তা স্পষ্ট হতে হবে। শিশুকেও নিরাপত্তার সক্রিয় অংশীদার বানাতে হবে। বয়সোপযোগীভাবে তাদের জানাতে হবে কোন আচরণ অনিরাপদ, অস্বস্তিকর স্পর্শে কী করবেন, গোপনীয়তা রক্ষার চাপে কীভাবে সাহায্য চাইবেন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কীভাবে কথা বলবেন।

অভিভাবকদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। সন্তানের আচরণগত পরিবর্তন, মাদ্রাসায় যেতে অনীহা, অস্বাভাবিক ভয় বা ঘুমের সমস্যা লক্ষ্য করে নিয়মিত ও নিরাপদ কথোপকথনের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। কওমি মাদ্রাসার পাঠক্রম ও শিক্ষাদর্শের স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই শিশু সুরক্ষার ন্যূনতম মানদণ্ড তৈরি সম্ভব। শিশুর জীবন ও মর্যাদা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসনের ঊর্ধ্বে। কওমি বোর্ড ও প্রতিষ্ঠান ধর্মীয় ও শিক্ষাগত কাঠামো পরিচালনা করবে, আর রাষ্ট্র নিশ্চিত করবে ন্যূনতম শিশু সুরক্ষা। এজন্য আলেমদের সঙ্গে শিশু অধিকার বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, সমাজকর্মী, আইনজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে স্বাধীন পরামর্শ ও তদারকি কাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে।

সংস্কার বাস্তবায়নে প্রথম ধাপে প্রতিটি মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা নীতি, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি, নিরাপদ অভিযোগব্যবস্থা ও কর্মীদের প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। এরপর আবাসিক ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব রোটেশন, ছুটি ও হস্তান্তর রেকর্ড, ছাত্রাবাসে প্রবেশ নিয়ম, অসুস্থ শিক্ষার্থীর তত্ত্বাবধান ও জরুরি যোগাযোগ নিশ্চিত করতে হবে। পর্যাপ্ত ছুটি ও সপরিবার আবাসিক ব্যবস্থাপনায়ও গুরুত্ব দিতে হবে।

শিশু একটি আমানত; কোনো ওস্তাদ, মুহতামিম, পরিচালক, দাতা কিংবা প্রতিষ্ঠান সেই আমানত রক্ষায় জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নয়। যে মাদ্রাসা অভিযোগ গোপন করবে, অপরাধীকে পালাতে সাহায্য করবে, শিশুকে ভয় দেখাবে, প্রমাণ নষ্ট করবে বা আইনগত ব্যবস্থা ঠেকাবে, তার বিরুদ্ধে কওমি বোর্ডেরও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা থাকা উচিত। কওমি বোর্ডগুলো অভিন্ন ন্যূনতম মানদণ্ড গ্রহণ করে বার্ষিক আত্মমূল্যায়ন ও ঝুঁকি নিরীক্ষা করতে পারে। গুরুতর অভিযোগের জন্য শিশুর নিরাপত্তা, অভিযুক্তের সাময়িক পৃথক্‌করণ, প্রমাণ সংরক্ষণ, চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তা ও আইনি প্রক্রিয়ার নির্দিষ্ট প্রোটোকল থাকা জরুরি। অভিযোগকারী বা তার পরিবারকে ভয় দেখানো, অভিযুক্তকে গোপনে সরিয়ে দেওয়া বা প্রমাণ নষ্ট করার সুযোগ থাকা উচিত নয়।

ভুক্তভোগী শিশুর পরবর্তী জীবনও বিবেচনায় রাখতে হবে। শুধু অপরাধীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে দায়িত্ব শেষ হয় না। শিশুর চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, শিক্ষাজীবনে নিরাপদ প্রত্যাবর্তন, ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা ও সামাজিক কলঙ্ক থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিশুর অভিযোগকে প্রচার বা সামাজিক বিচারের উপকরণে পরিণত করা যাবে না। শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থই হতে হবে পুরো প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে।

জাতীয় পর্যায়ের নিরপেক্ষ গবেষণাও প্রয়োজন। কতগুলো মাদ্রাসা আবাসিক, শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত, নিয়োগে যাচাই, অভিযোগব্যবস্থার কার্যকারিতা, শিক্ষার্থীদের সচেতনতা ও অভিযোগের পর প্রতিকার—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কার্যকর নীতি তৈরি সম্ভব নয়। তথ্যের উদ্দেশ্য ঝুঁকি চিহ্নিত করে নিরাপত্তা উন্নত করা।

এই সংস্কারের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে কওমি সমাজের নিজস্ব নৈতিক ঐতিহ্য। আমানত, তাকওয়া, মাহাসাবা (আত্মবিচার), ন্যায়, জুলুমবিরোধিতা ও দুর্বল মানুষের হক রক্ষার যে শিক্ষা কওমি ধারার অন্তর্গত, শিশু সুরক্ষাকে তারই প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগ হিসেবে দেখা দরকার। আত্মরক্ষার সংস্কৃতির বদলে আত্মশুদ্ধির সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া নিয়মের চেয়ে ভেতর থেকে গ্রহণ করা নৈতিকতা টেকসই সংস্কৃতি তৈরি করে। অপরাধ অস্বীকার প্রতিকার নয়; প্রতিকার নিহিত সত্য উদ্‌ঘাটনে, ন্যায়বিচারে, ভুক্তভোগীর মর্যাদা ও পুনর্বাসনে এবং ভবিষ্যৎ অপরাধ প্রতিরোধে। কওমি মাদ্রাসার প্রকৃত শক্তি নিজের দুর্বলতার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে সংশোধন করার সাহসে।

লেখক: মুসা আল হাফিজ, লেখক, গবেষক এবং ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার অলিম্পিয়াড বাংলাদেশের চেয়ারম্যান। মতামত লেখকের নিজস্ব।