চলতি বছরের প্রথম নয় মাসজুড়ে দেশের মানবাধিকার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে চিত্র সামনে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) তাদের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের মাধ্যমে এই ভয়াবহ বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই নির্দিষ্ট সময়ে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার অন্তত ১ হাজার ১৩টি ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ৭৩ জন। একই সময়ে মব ভায়োলেন্স বা গণপিটুনির ৩৯৮টি ঘটনায় মোট ১৮৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতনের চিত্রটিও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক; গত ৯ মাসে ২ হাজার ৪০৪ জন নারী ও কন্যাশিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।

এইচআরএসএসের এই প্রতিবেদনে যদিও পূর্ববর্তী বছরের তথ্যের উল্লেখ নেই, তবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অন্যান্য সময়ের পরিসংখ্যানের সঙ্গে তুলনা করলে পরিস্থিতির ধারাবাহিক অবনতি স্পষ্টভাবে পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, গত আগস্টে সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে মুক্তকণ্ঠের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল যে, পূর্ববর্তী ছয় মাসের তুলনায় পরবর্তী সময়ে খুন এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

তবে রাজনৈতিক সহিংসতা এবং গণপিটুনির এই পরিসংখ্যানকে কেবল ‘আইনশৃঙ্খলার অবনতি’ হিসেবে চিহ্নিত করলে সমস্যার প্রকৃত গভীরতা আড়াল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কারণ, এর একটি দিক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার প্রতীক এবং অন্যটি সামাজিক অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক সহিংসতার ৯১ শতাংশই ঘটেছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং অন্য দলের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষের ফলে। কেবল অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণেই প্রাণ হারিয়েছেন ৪০ জন। এছাড়া মোট নিহত ৭৩ জনের মধ্যে ৪৬ জনই ওই দলটির সদস্য।

মূলধারার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার এবং সুযোগ-সুবিধা নিয়ন্ত্রণের যে প্রবণতা, তা এখানে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। বাংলাদেশে ক্ষমতা লাভের অর্থ যেন হয়ে দাঁড়িয়েছে পদ-পদবি, ঠিকাদারি, টেন্ডার, দখল এবং নিয়ন্ত্রণের একচ্ছত্র সুযোগ পাওয়া। আর এই ক্ষমতার ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে।

দীর্ঘ দেড় দশক পর নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার শুরুতে রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বিভিন্ন দখলের ঘটনা এবং পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, সেই আশা পূরণ হওয়া এখনো বেশ কঠিন।

যদিও বিভিন্ন সময়ে অপরাধীদের বিরুদ্ধে সরকারপ্রধানের কঠোর বার্তা এবং পদক্ষেপ লক্ষ্য করা গেছে, তবে তৃণমূল পর্যায়ে সেই বার্তা কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। পাশাপাশি রাজনৈতিক সহিংসতার ক্ষেত্রে বিচারহীনতা ও দায়হীনতার যে দীর্ঘ অপসংস্কৃতি আমাদের দেশে শিকড় গেড়েছে, তা-ই মূলত এসব সহিংসতা অব্যাহত রাখার পেছনে প্রধান ইন্ধন হিসেবে কাজ করছে।

অন্যদিকে, সমাজে মব-সহিংসতার বিস্তার দিন দিন আরও ভীতিপ্রদ হয়ে উঠছে। ধর্ম অবমাননার অভিযোগ কিংবা চুরি-ছিনতাইয়ের সন্দেহে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা কিংবা বিচারহীনতার সংস্কৃতিই মূলত মানুষকে এভাবে আইন হাতে তুলে নিতে উৎসাহিত করছে। তদুপরি, মব-সহিংসতার সময় পুলিশ ও প্রশাসনের নীরব বা নিষ্ক্রিয় ভূমিকা অপরাধীদের আরও সুযোগ করে দিচ্ছে।

এই সময়ে কারাগারে মৃত্যু, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে প্রাণহানি এবং গুমের ঘটনাগুলো রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার মারাত্মক অভাবকে সামনে এনেছে। একই সঙ্গে সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনাগুলো সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমরা মনে করি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত ও টেকসই উন্নতি নিশ্চিত করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অত্যন্ত সক্রিয় হতে হবে। দলীয় কোন্দল ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দলীয় এবং আইনি—উভয় পদক্ষেপই গ্রহণ করতে হবে; কোনোভাবেই দলীয় পরিচয় যেন অপরাধের সুরক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। প্রতিটি মব-সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত মামলা দায়ের, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক সহিংসতার রাশ টেনে ধরা অত্যন্ত জরুরি।