সাতক্ষীরার দেবহাটায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে দফায় দফায় মারধরের শিকার হয়ে ওয়াহিদুজ্জামান শামীম (৩৮) নামের এক যুবক প্রাণ হারিয়েছেন। প্রথম দফায় পিটুনির পর পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করলেও, রাতে উত্তেজিত জনতা তাঁকে সেখান থেকে ছিনিয়ে নিয়ে দ্বিতীয় দফায় মারধর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় অন্য হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

ঘটনাটি ঘটে গতকাল মঙ্গলবার। বিকেল সাড়ে চারটার দিকে শামীমকে মারধরের খবর পেয়ে পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। তবে রাত ৮টা ৪০ মিনিটে একদল লোক হাসপাতালে ঢুকে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে পুনরায় মারধর করেন। এরপর তাঁকে সাতক্ষীরার দিকে নিয়ে যাওয়ার পথে মৃত্যু হয়। নিহত শামীম দেবহাটা উপজেলার সুবর্ণাবাদ গ্রামের বাসিন্দা বলে জানা গেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, দেবহাটা উপজেলা সদরে একদল মানুষ মিছিল করছেন। তারা নিহত যুবকের শাস্তির দাবি জানান এবং মিছিলের মাধ্যমে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান। ভিডিওতে আরও শোনা যায়, তারা শামীম যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন, সেখানে যাওয়ার জন্য লোকজনকে আহ্বান জানাচ্ছিলেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কয়েকটি অডিও কথোপকথনকে কেন্দ্র করে এই উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা খায়রুল আলম মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “শামীমের কয়েকটি অডিও কথোপকথন ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। সেসব কথোপকথনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত লাগে—এমন মন্তব্য শোনা যায় বলে তিনি অভিযোগ করেন।” এই অডিও ক্লিপগুলোর পর এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, শামীমের পরিবারের সদস্যদের দাবি ভিন্ন। তাঁদের মতে, গত কয়েক দিন ধরে শামীম অস্বাভাবিক আচরণ করছিলেন এবং তিনি মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, কয়েক দিন আগে তিনি বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন।

প্রত্যক্ষদর্শী ও চিকিৎসকদের বিবরণ অনুযায়ী, প্রথম দফায় মারধরের পর শামীমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু রাতে শতাধিক ব্যক্তি হাসপাতালে এসে অন্য রোগীদের সামনেই ওয়ার্ডের ভেতরে তাঁকে মারধর শুরু করেন। একপর্যায়ে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে গিয়ে পুনরায় মারধর করা হয়।

দেবহাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এইচ এম শাহীন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “গতকাল বিকেল সাড়ে চারটার দিকে স্থানীয় লোকজন এক ব্যক্তিকে আটকে রেখে মারধর করছেন—এমন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। পরে তাঁকে উদ্ধার করে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ ছিল, শামীম ধর্ম অবমাননা করেছেন।”

ওসি আরও জানান, “রাত ৮টা ৪০ মিনিটে দুই থেকে আড়াই শ লোক হাসপাতালে গিয়ে শামীমকে চিকিৎসা দিতে বাধা দেন। পুলিশ, আনসার সদস্য ও চিকিৎসকেরা বাধা দিলেও তাঁরা শোনেননি। একপর্যায়ে পেছনের দরজা ভেঙে ওয়ার্ডে ঢুকে তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে মারধর করা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।”

আজ বুধবার সকালে দেবহাটা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম জানান, প্রথম দফায় মারধরের পর শামীমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। রাতে শতাধিক ব্যক্তি হাসপাতালে এসে অন্য রোগীদের সামনে ওয়ার্ডের ভেতরে তাঁকে মারধর করেন। একপর্যায়ে তাঁকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আবার মারধর করা হয়। এতে অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং সেখানে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোতে দেখা গেছে, শামীম মাটিতে পড়ে আছেন এবং তাঁকে ঘিরে অনেক মানুষের ভিড়। কয়েকজন মুঠোফোনে সেই দৃশ্য ধারণ করছেন। আরেকটি ভিডিওতে রাতে দেবহাটা উপজেলা সদরে মিছিল ও স্লোগানের মাধ্যমে শামীমের শাস্তির দাবি জানানো এবং হাসপাতালে যাওয়ার আহ্বান জানানো শোনা যায়।

এই ঘটনার প্রেক্ষিতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি এইচ এম শাহীন মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”