ইরানের শাসনব্যবস্থা পতনের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমাগত আক্রমণাত্মক অবস্থান। সেখানে বোমাবাজিতে প্রাণ হারিয়েছেন হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ এবং ধ্বংস হয়েছে প্রায় দশ হাজার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এমনকি ‘সব বোমার মা’ নামক এক ভয়াবহ মারণাস্ত্র ব্যবহারের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। তবে আট মাস অতিবাহিত হওয়ার পরও ইরানের সরকার এখনো অটল।

এর বিপরীতে গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের ভোটাররা কোনো অস্ত্র বা রক্তপাত ছাড়াই নিজেদের দেশে এক ধরনের ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসন পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। ভোটাররা ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরিয়ে না দিলেও কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়ে তাঁর একচ্ছত্র ক্ষমতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছেন। ট্রাম্প তাঁর সমর্থকদের অনুরোধ করেছিলেন, ব্যালটে তাঁর নাম না থাকলেও যেন তাঁরা ধরে নেন যে তাঁর নাম সেখানে রয়েছে। ভোটাররা যেন সেই কথাটিই মাথায় রেখে ট্রাম্প ও ট্রাম্পবাদের বিরুদ্ধে নিজেদের রায় দিয়েছেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটি কেবল একটি নীল বা ডেমোক্রেটিক ঢেউ নয়, বরং রীতিমতো এক সুনামি।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঐতিহাসিকভাবেই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর দলের শাসনকালের ওপর একটি গণভোট হিসেবে বিবেচিত হয়। গত এক শতাব্দীতে মাত্র তিনবার ব্যতিক্রম ছাড়া প্রতিবারই ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে ভোটারদের কাছে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১০ সালে বারাক ওবামার প্রথম মেয়াদে মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর দল ৬৩টি আসন হারিয়েছিল।

এবারের চূড়ান্ত আসন সংখ্যা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট না হলেও বেসরকারি হিসাব অনুযায়ী ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করেছেন। সিনেটে তাঁরা রিপাবলিকানদের কাছ থেকে অন্তত সাতটি আসন ছিনিয়ে নিয়েছেন। এছাড়া টেক্সাস, জর্জিয়া ও ওহাইওর মতো রক্ষণশীল অঙ্গরাজ্যগুলোতে রিপাবলিকানদের হাত থেকে গভর্নরের পদও চলে গেছে ডেমোক্র্যাটদের কাছে। উল্লেখ্য, টেক্সাসে মাত্র দুই বছর আগে ট্রাম্প দুই অঙ্কের ব্যবধানে জয়লাভ করেছিলেন। সেখানেও এমন ফলাফল প্রমাণ করে যে ডেমোক্র্যাটদের এই ঢেউ কতটা বিস্তৃত।

ক্ষমতার দাপট ধরে রাখতে ট্রাম্প ও তাঁর রিপাবলিকান প্রশাসন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিল। প্রচলিত নিয়ম ভেঙে নির্বাচনী মানচিত্র নতুন করে কাটাছেঁড়া করা হয়। কারচুপির অভিযোগ তুলে বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয় এবং অবৈধ অভিবাসীদের ভোটার তালিকায় থাকার অভিযোগে তালিকা সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়। এক হাজারের বেশি ফেডারেল নির্বাচনী পরিদর্শক নিয়োগ করা হয় এবং দলীয় সমর্থকদের বুথ আগলে রাখতে বলা হয়। এমনকি সব চেষ্টা ব্যর্থ হলে ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে শোনা যায়। কিন্তু এসব কিছুই কাজে আসেনি, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ এই প্রশাসনের দুর্নীতি, অনাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহার আর মেনে নিতে রাজি ছিলেন না।

১৯৯২ সালে বিল ক্লিনটনের নির্বাচনী কৌশলবিদ জেমস কারভিলের একটি বিখ্যাত কথা ছিল, ‘ইটস দ্য ইকোনমি, স্টুপিড।’ এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সেই পুরনো মন্ত্রই মনে রেখেছেন। তাঁদের প্রচারণার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল জীবনযাত্রার ব্যয়। সাধারণ ভোটাররা বাজারের বিল এবং পেট্রলপাম্পের দামের মাধ্যমেই অর্থনীতির প্রকৃত অবস্থা বিচার করেছেন। বার্তা সংস্থা এপির এক জরিপে অধিকাংশ ভোটার জানিয়েছেন, ট্রাম্পের নীতিতে তাঁদের ব্যক্তিগত খরচ আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যার ফলে প্রায় সব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। নির্বাচনের পর ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেছেন, ‘আমাদের হারের কারণ যুদ্ধ।’ তাঁর এই স্বীকারোক্তি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ যে যুদ্ধের বোঝা ভোটারদের বইতে হয়েছে, সেই যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে ইরান যুদ্ধ ছাড়াও বাণিজ্যযুদ্ধের বড় ভূমিকা রয়েছে। ক্ষমতা গ্রহণের পর ট্রাম্প ঢালাও আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, ‘আমরা শুল্ক থেকে ট্রিলিয়ন ডলার আয় করছি।’ তবে সেই ট্রিলিয়ন ডলার যে আসলে কর হিসেবে সাধারণ ভোক্তাদের পকেট থেকে গেছে, তা তিনি উপলব্ধি করেননি।

জীবনযাত্রার ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে—এই বাস্তবতাকে ট্রাম্প বিশ্বাস করতে পারেননি। তিনি একে ডেমোক্র্যাটদের তৈরি একটি ‘হোক্স’ বা প্রতারণা বলে অভিহিত করেছেন। নির্বাচনের আগের সপ্তাহেও তিনি জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধিতে সৃষ্ট সংকট স্বীকার করেননি। তিনি বলেছিলেন, ‘দাম হয়তো একটু বেড়েছে, কিন্তু ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংসের জন্য এতটুকু ত্যাগ তো স্বীকার করাই যায়।’ এমনকি এক নির্বাচনী সভায় তিনি দাবি করেন, ‘জ্বালানির দাম বাড়ায় আমরা দারুণ লাভবান হয়েছি।’ তবে এই ‘আমরা’ বলতে তিনি সম্ভবত নিজেকে, তাঁর পরিবার এবং আমেরিকার কোটিপতি শ্রেণিকে বুঝিয়েছেন।

ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা মাগা আন্দোলনের মূল ভিত্তি ছিল অশ্বেতকায় এবং বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের বাদামি মানুষের প্রতি ঘৃণা। তাঁদের বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করে যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিষ্টান ও শ্বেতসভ্যতার প্রতি হুমকি বলা হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স দাবি করেছিলেন, বহিরাগতদের উপস্থিতির কারণে যুক্তরাষ্ট্র ‘সভ্যতাগত নিশ্চিহ্নকরণ’, তাঁর ভাষায় ‘সিভিলাইজেশনাল ইরেজারের’ মুখোমুখি।

২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পের জয়ের অন্যতম কারণ ছিল অবৈধ অভিবাসনের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোর অবস্থান। দক্ষিণ সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অভিবাসীদের প্রবেশ কার্যত বন্ধ করার জন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছিলেন। তবে অভিবাসন বন্ধের নামে দেশজুড়ে সামরিক কায়দায় যে অভিযান চালানো হয়, তার প্রধান লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ আমেরিকা, বিশেষ করে মেক্সিকো থেকে আসা অভিবাসীরা। তাঁদের বহিষ্কারের নামে মুখোশধারী অভিবাসন পুলিশ (আইস এজেন্ট) বিভিন্ন শহরে তাণ্ডব চালায়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুপুত্রের সামনেই মা-বাবাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং পায়ে শিকল বেঁধে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আইসের গুলিতে বেশ কয়েকজন মার্কিন নাগরিকের মৃত্যুও হয়েছে।

রিপাবলিকানদের এই পরাজয়ের অন্যতম কারণ এই অভিবাসনবিরোধী অভিযান। ২০২৪ সালে টেক্সাস বা অ্যারিজোনার মেক্সিকান-আমেরিকানরা ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দিলেও এবার তাঁরা বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। টেক্সাসে এই হিস্পানিক ভোটের কারণেই গত ৪০ বছরে প্রথমবারের মতো একজন ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন এবং একজন হিস্পানিক নারী গভর্নর হয়েছেন। একই সাথে টেক্সাসের প্রতিনিধি পরিষদও রিপাবলিকানদের হাতছাড়া হয়েছে।

বহিরাগতদের একজন হিসেবে মিশিগানের নবনির্বাচিত সিনেটর আবদুল আল-সাইদকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জিহাদি, সন্ত্রাসী এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল মিশিগানের ভোটারদের মনে বহিরাগতদের প্রতি ঘৃণার সঞ্চার করা। গাজায় গণহত্যার কারণে ইসরায়েলের তীব্র সমালোচনা করায় আল-সাইদকে ঠেকাতে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করা হয়েছে। বলা হয়েছিল, নির্বাচিত হলে তাঁকে সিনেটের আশেপাশে যেতে দেওয়া হবে না, আর গেলেও মেটাল ডিটেক্টর পেরিয়ে ঢুকতে হবে।

তবে আল-সাইদ রিপাবলিকানদের এই ফাঁদে পা দেননি। তিনি জানিয়েছেন, তাঁর লক্ষ্য হলো রাজনীতি থেকে অর্থ প্রভাব সরিয়ে তা সাধারণ মানুষের পকেটে পৌঁছে দেওয়া এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। জেডি ভ্যান্স তাঁকে প্রতারক বললেও জয়ের পর আল-সাইদ তাঁকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘হাবিবি, এখন তো আমাকে সিনেটর হিসেবে শপথ করাতে তুমি বাধ্য, সেটা তোমার শাসনতান্ত্রিক দায়িত্ব।’

যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতন্ত্র অনুযায়ী প্রশাসন, সংসদ ও বিচার বিভাগের মধ্যে ক্ষমতা সমানভাবে বিভক্ত। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সমবণ্টন মানেননি। নিউইয়র্ক টাইমস–এর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছিলেন, কোনো আইন তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয় এবং তিনি যা খুশি করতে পারেন। তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কাজে একমাত্র বাধা হচ্ছে আমার নিজস্ব নৈতিকতা।’ অনুগত রিপাবলিকানরা কংগ্রেসে তাঁকে বাধা দেওয়ার সাহস পাননি এবং সুপ্রিম কোর্টও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁকে ছাড় দিয়েছে।

এখন সেই পরিস্থিতি বদলে যাবে। নতুন আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন বা অর্থ বরাদ্দের জন্য ট্রাম্পকে এখন কংগ্রেসের কাছেই আসতে হবে। বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় যুদ্ধ, বাণিজ্যনীতি, অভিবাসন এবং বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিটি ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনকে জবাবদিহির মুখোমুখি করার ক্ষমতা থাকবে আগামী কংগ্রেসের।

প্রশ্ন উঠেছে, ডেমোক্র্যাটরা কি কেবল তদন্তেই সময় ব্যয় করবেন? হাকিম জেফ্রিস স্পষ্ট করেছেন যে, তদন্ত নয়, তাঁদের লক্ষ্য হবে মানুষের জীবনযাত্রাকে কীভাবে সহনীয় করা যায় সেদিকে নজর দেওয়া। এবারের নির্বাচন থেকে তাঁরা সেই বার্তাই পেয়েছেন।

এই মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের পাশাপাশি পরাজিত হয়েছেন ইলন মাস্ক। বিশ্বের শীর্ষ ধনী মাস্ক সতর্ক করেছিলেন যে, ডেমোক্র্যাটরা জয়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের বারোটা বাজবে। এই আশঙ্কা ঠেকাতে তিনি একাই প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করলেও তা বৃথা গেছে।

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম এজেন্ডা ছিল স্থানীয় নাগরিকদের সম্মতি ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সমর্থনে ডেটা সেন্টার নির্মাণে বাধা দেওয়া। সবচেয়ে বেশি ডেটা সেন্টার নির্মিত হচ্ছে টেক্সাসে, যার প্রতিটি ক্ষমতার কেন্দ্র এখন ডেমোক্র্যাটদের হাতে। এই পরিস্থিতিতে হতাশ ইলন মাস্ক সখেদে বলেছেন, ‘আমাকে তাহলে মঙ্গল গ্রহে গিয়েই ডেটা সেন্টার নির্মাণ করতে হবে।’