যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের দুটি কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তবে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে যদি ডেমোক্র্যাটরা এই দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়, তবে ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরের রাজনৈতিক সমীকরণ সম্পূর্ণ বদলে যেতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে ডেমোক্র্যাটরা যদি প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ লাভ করে, তবে রিপাবলিকানদের জন্য যেকোনো আইন পাস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে, কারণ সেক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন অপরিহার্য হবে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হবে এই যে, ডেমোক্র্যাট সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রতিনিধি পরিষদ তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যাপক তদন্ত শুরু করার আইনি ক্ষমতা পাবে।

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ হারালে রিপাবলিকান পার্টির সামনে আরও গুরুতর বিপদ আসতে পারে। তদন্ত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ডেমোক্র্যাটরা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র তলব করতে পারবেন এবং সাক্ষীদের হাজির করার নির্দেশ দিতে পারবেন। এমনকি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তৃতীয়বারের মতো অভিশংসনের প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করার উদ্যোগও নিতে পারে তারা।

অন্যদিকে সিনেটের পরিস্থিতি বিবেচনা করলে দেখা যায়, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, রাষ্ট্রদূত এবং কেন্দ্রীয় বিচারপতিদের নিয়োগের চূড়ান্ত অনুমোদন সিনেটের হাতে থাকে। ডেমোক্র্যাটরা যদি সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে, তবে তারা ট্রাম্পের মনোনীত অনেক নিয়োগ আটকে দিতে পারবেন। এর ফলে বিভিন্ন আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউসকে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সমঝোতা করতে বাধ্য হতে হবে।

এমনকি রিপাবলিকানরা যদি কংগ্রেসের একটি বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতেও পারে, তবুও সংখ্যাগরিষ্ঠতার হার কমে গেলে সরকার পরিচালনা করা তাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষ করে কোনো নির্দিষ্ট আইন পাসের জন্য যদি দলের প্রায় সব সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন হয়, তবে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

রাজনৈতিক প্রতিবেদক জোসেফ গিডিয়নের মতে, কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেলে ডেমোক্র্যাটরা বেশ কিছু স্পর্শকাতর বিষয়ে তদন্ত শুরু করতে পারেন। এর মধ্যে প্রধান বিষয়গুলো হলো—

দুর্নীতির অভিযোগ: প্রতিনিধি পরিষদের ওভারসাইট কমিটিতে থাকা শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য রবার্ট গার্সিয়া ট্রাম্প পরিবারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে তাঁর অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে রেখেছেন। পাশাপাশি প্রতিনিধি জেমি রাসকিন ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার এবং ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত তথ্য চেয়েছেন।

এপস্টিন ও ই-মেইল বিতর্ক: প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য রো খান্না ও টমাস ম্যাসির যৌথ প্রচেষ্টায় গত বছর যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টিন-সংশ্লিষ্ট লাখ লাখ নথি প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছে বিচার বিভাগ। তবে শুরুতে আইন অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এই নথিগুলো প্রকাশ করতে বিচার বিভাগ ব্যর্থ হয়। পরবর্তীতে ৬০ লাখ পৃষ্ঠার মধ্যে প্রায় ৩৫ লাখ পৃষ্ঠা প্রকাশ করা হলেও বাকি নথিগুলো একই ধরনের হওয়ার কারণে প্রকাশ করা হয়নি বলে জানানো হয়। প্রকাশিত কিছু নথিতে অতিরিক্ত তথ্য গোপন করা এবং ভুলবশত ভুক্তভোগীদের নাম প্রকাশ পাওয়ার ঘটনায় দুই দলের আইনপ্রণেতারাই গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, যার ফলে বিচার বিভাগ মামলার মুখে পড়েছে।

উল্লেখ্য যে, ওভারসাইট কমিটির রিপাবলিকান চেয়ারম্যান জেমস কোমারের নেতৃত্বে এপস্টিন ইস্যুতে দুই দলের সদস্যদের মধ্যে এক ধরণের সহযোগিতা দেখা গেছে। এই বিষয়ে কেউ সহযোগিতা না করলে তাঁর বিরুদ্ধে কংগ্রেসের অবমাননার অভিযোগ আনার ক্ষেত্রে উভয় দলের সদস্যরা প্রায়ই একযোগে কাজ করেছেন। নতুন কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটরা নিয়ন্ত্রণ পেলেও এই তৎপরতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পেন্টাগন ও যুদ্ধসংক্রান্ত ব্যয়: কলোরাডোর কংগ্রেস সদস্য জেসন ক্রো, যিনি সশস্ত্র বাহিনী ও গোয়েন্দাবিষয়ক কমিটির সদস্য এবং হাউসের দুর্নীতিবিরোধী ককাসের সহসভাপতি, জানিয়েছেন যে তদন্ত শুরু হলে তিনি প্রথমেই পেন্টাগনের দিকে নজর দেবেন। তাঁর অভিযোগ, প্রতিরক্ষা খাতের অর্থ ট্রাম্প পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পেছনে ব্যয় করা হচ্ছে।

অভিশংসন: প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যালঘু নেতা হাকিম জেফরিস বলেছেন, “এবারও ট্রাম্পের অভিশংসনের বিষয়টি তাঁরা একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছেন না।” অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের নেতা স্টিভ স্ক্যালিস আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, “কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেলে ডেমোক্র্যাটরা প্রথম দিন থেকেই অভিশংসনের উদ্যোগ নেবেন।”