যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী এবং দল-সমর্থিত বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের জন্য প্রায় ৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবের ইলন মাস্ক। বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রতি ডলারের মান ১২৩ টাকা হিসেবে এই বিশাল অংকের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫ হাজার ৪৩৯ কোটি টাকা। আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচন সামনে রেখে মাস্কের এই বিপুল অর্থায়ন মার্কিন রাজনীতিতে অতি ধনীদের প্রভাব নিয়ে নতুন করে তীব্র বিতর্ক জন্ম দিয়েছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফোর্বসের এক প্রতিবেদনে বিস্তারিত জানানো হয়েছে যে, অক্টোবরের প্রথম দুই সপ্তাহে ইলন মাস্ক তাঁর সমর্থিত রাজনৈতিক সংগঠন 'আমেরিকা পিএসি'-কে ৭ কোটি ৭০ লাখ ডলার অনুদান দিয়েছেন। এর মধ্যে ৬ থেকে ১৪ অক্টোবরের মধ্যবর্তী সময়ে সরাসরি দেওয়া অর্থের পরিমাণ ৭ কোটি ৪৮ লাখ ডলার। এছাড়া তাঁর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান 'ইউনাইটেড স্টেটস অব আমেরিকা ইনকরপোরেশন'-এর মাধ্যমে আরও প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার প্রদান করা হয়েছে। সব মিলিয়ে চলতি মধ্যবর্তী নির্বাচনে মাস্কের মোট রাজনৈতিক অনুদানের পরিমাণ প্রায় ৪৪ কোটি ৩০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে।

নির্বাচনী অর্থায়নের নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বর্তমান নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পক্ষে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইলন মাস্ক এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্থদাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। তাঁর এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের প্রধান লক্ষ্য হলো কংগ্রেসের দুই কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে সহায়তা করা।

উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন প্রেসিডেন্টের চার বছরের মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এবারের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সবকটি আসন এবং সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট গ্রহণ করা হবে। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফলের ওপর অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ভর করছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং কংগ্রেসে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের ক্ষেত্রে এই নির্বাচনের বড় প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

ইলন মাস্কের অর্থায়নের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে দেখা যাচ্ছে টেক্সাসের সিনেট নির্বাচনকে। ফোর্বসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকোর বিরুদ্ধে প্রচারণার জন্য 'আমেরিকা পিএসি' প্রায় ২ কোটি ৭৯ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। পাশাপাশি রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনকে সমর্থন জানাতে আরও ৪৮ লাখ ডলার খরচ করা হয়েছে। এছাড়া ওহাইও, মিশিগান, আইওয়া এবং মেইনের নির্বাচনেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে অর্থ ব্যয় করেছে এই সংগঠনটি।

মাস্কের এই অর্থায়নের পরিধি কেবল বিজ্ঞাপন প্রচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভোটারদের কাছে প্রচারসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া, বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন এবং এমনকি ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে উৎসাহিত করার মতো মাঠপর্যায়ের কার্যক্রমেও এই অর্থ ব্যয় করা হচ্ছে। ফলে নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে রিপাবলিকানদের তৃণমূল পর্যায়ের প্রচারণাকে আরও শক্তিশালী করতে তাঁর এই অর্থ বড় ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে মাস্কের এই বিপুল অর্থায়ন নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক বেড়েই চলেছে। টেক্সাসের ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জেমস তালারিকো অভিযোগ করে বলেছেন, ইলন মাস্ক এই রাজ্যের সিনেট আসনটি নিজের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছেন। তাঁর দাবি, “এমন অতি ধনী ব্যক্তির বিপুল অর্থ ব্যয়ের কারণে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সাধারণ ভোটারদের প্রভাব খর্ব হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।”

আশ্চর্যের বিষয় হলো, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইলন মাস্ক যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছিলেন, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তার চেয়েও বেশি ব্যয় করছেন। ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও অন্যান্য রিপাবলিকান প্রার্থীদের সমর্থনে মাস্ক প্রায় ২৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয় করেছিলেন। বর্তমান মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁর অনুদানের পরিমাণ ইতিমধ্যে সেই অঙ্ককে ছাড়িয়ে গেছে।

২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে ও পরে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মাস্কের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তবে পরবর্তী সময়ে মাস্ক প্রশাসনে যুক্ত হওয়ার পর তাঁদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয় এবং একপর্যায়ে তিনি প্রশাসন থেকে সরে আসেন। তা সত্ত্বেও মাস্কের কোম্পানিগুলো এখনো সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির আওতায় কাজ করে যাচ্ছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের একটি অংশ মাস্কের সরকারি কার্যক্রম এবং তাঁর প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের সরকারি চুক্তিগুলো নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছে।

আগামী ৩ নভেম্বরের এই নির্বাচন এখন কেবল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারণের লড়াই নয়, বরং মার্কিন রাজনীতিতে অতি ধনীদের প্রভাব কতটা বিস্তৃত হতে পারে, সেটিও একটি বড় প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।