রুশ জ্বালানি তেল ও গ্যাস আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা এবং শুল্ক আরোপের অনুমোদন দিয়ে মাত্র তিন সপ্তাহ আগে একটি আইনে স্বাক্ষর করেছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে এখন তিনি নিজের সেই অবস্থান থেকে সম্পূর্ণ সরে এসে রাশিয়ার জ্বালানি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাজারে কয়েক লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছেন।
এমন এক সময়ে রুশ ডিজেল আমদানির এই চুক্তির ঘোষণা এল, যখন ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় ট্রাম্প হিমশিম খাচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। এই সংকটময় সময়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন অর্থনীতির ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষকে পাম্পে জ্বালানি কিনতে আগের চেয়ে অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে অন্যান্য পণ্য ও সেবার দামের ওপর। সব মিলিয়ে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাওয়ায় জনমত জরিপে ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন হ্রাস পেয়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিনির্ভর অঙ্গরাজ্যগুলোতে যুদ্ধের প্রভাব অত্যন্ত প্রকটভাবে অনুভূত হচ্ছে। এসব অঙ্গরাজ্যের কৃষিকাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি পরিচালনা এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছে দেওয়ার জন্য ডিজেলের ওপর ব্যাপক নির্ভরশীলতা রয়েছে।
এই পরিস্থিতির কারণে আইওয়া, কানসাস, টেক্সাস ও ওহাইওর মতো অঙ্গরাজ্যগুলো আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে অপ্রত্যাশিতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের হাতে থাকবে কি না, তা মূলত এই নির্বাচনই নির্ধারণ করবে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে ডিজেল আমদানির এই চুক্তিটি ট্রাম্পের ওপর চেপে বসা চাপ সামাল দেওয়ার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে নাটকীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক চাপ থেকে নিজের দলকে মুক্তি দিতে গত কয়েক মাস ধরেই বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন ট্রাম্প। তেলের মজুত থেকে আরও বেশি তেল বাজারে ছাড়ার জন্য সম্প্রতি তিনি ইউরোপের মিত্রদেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন। এছাড়া জ্বালানির ওপর কেন্দ্রীয় সরকারের কর স্থগিত করেছেন তিনি। এমনকি কৃষিকাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ডিজেল অন্য অঙ্গরাজ্যে পণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহারের অনুমতিও দিয়েছেন তিনি।
এর পাশাপাশি মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানে আর কোনো হামলা চালাবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ট্রাম্প। চলমান যুদ্ধ যে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর প্রভাব ফেলছে, এই ঘোষণা যেন তারই এক খোলামেলা স্বীকারোক্তি।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে ডিজেল আমদানির চুক্তি ট্রাম্পের চাপ সামাল দেওয়ার সর্বশেষ এবং সবচেয়ে নাটকীয় উদ্যোগ।
তবে ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে প্রায়ই অসম্পূর্ণ তথ্য থাকে। রাশিয়া ঠিক কীভাবে বিশ্ববাজারে এই জ্বালানি সরবরাহ করবে এবং বিনিময়ে নগদ অর্থের মতো জরুরি বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়া দেশটি আর কী সুবিধা পাবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।
এই চুক্তির ফলে ইউরোপের মিত্রদেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন ট্রাম্প। তাঁদের অভিযোগ, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তাঁর প্রশাসন কার্যত রাশিয়ার যুদ্ধযন্ত্রকে অর্থ জোগাতে সহায়তা করবে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই চুক্তিটিকে পুতিনের জন্য একটি ‘উপহার’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর ভাষায়, রাশিয়া এর প্রতিদান দেবে ‘সন্ত্রাস ও বিশ্বাসঘাতকতা’ দিয়ে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ৩৬ লাখ ব্যারেল ডিজেল ব্যবহৃত হয়। রাশিয়া চলতি মাসে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিন লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের এক দিনের মোট ব্যবহারের প্রায় অর্ধেকের সমান হবে।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি লিখেছেন, “রাশিয়াকে জ্বালানি পণ্য বিক্রির সুযোগ দেওয়া মানে এমন একটি যুদ্ধে বিনিয়োগ করা, যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত নয়, বরং শেষ করা প্রয়োজন।”
তবে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের কতটা সুবিধা এনে দেবে, তা নিয়ে যথেষ্ট অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইউরোপের দেশগুলো মজুত থেকে ডিজেল ছাড়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তাতে জ্বালানির দামে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। রাশিয়ার জ্বালানি কত দ্রুত বাজারে পৌঁছাবে, সে সম্পর্কেও কোনো নির্দিষ্ট তথ্য নেই।
এদিকে ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলায় রাশিয়ার ডিজেল শোধনাগারগুলোর সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব হামলা বন্ধ করতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে উৎসাহিত করেছেন ট্রাম্প।
যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ৩৬ লাখ ব্যারেল ডিজেল ব্যবহৃত হয়। রাশিয়া চলতি মাসে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তিন লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করলেও তা যুক্তরাষ্ট্রের এক দিনের মোট ব্যবহারের প্রায় অর্ধেকের সমান হবে।
ফলে সাধারণ মার্কিন নাগরিকেরা জ্বালানির দামে তাৎক্ষণিকভাবে বড় কোনো পরিবর্তন দেখার সম্ভাবনা খুবই কম।
নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য এক মাসেরও কম সময় বাকি এবং অনেক অঙ্গরাজ্যে আগাম ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে গেছে। ইংরেজি একটি প্রবাদে বলা হয়, কেক তৈরি হয়ে গেলে আর তার উপকরণ বদলানোর সুযোগ থাকে না। অর্থাৎ, নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে প্রভাব ফেলার মতো সময় এখন প্রায় ফুরিয়ে এসেছে।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, “মার্কিন নাগরিকদের, বিশেষ করে আমাদের মহান কৃষক, খামারমালিক ও ট্রাকচালকদের জন্য জ্বালানির দাম কমানোই আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।”
কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন; গত সাত মাসে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও ভোগ্যপণ্যের দাম কেবল বেড়েই চলেছে। যুদ্ধের সফল সমাপ্তি এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব কমে আসার বিষয়ে ট্রাম্প ও তাঁর কর্মকর্তারা বারবার আশ্বাস দিলেও উদ্বিগ্ন সাধারণ মানুষের সেই আশ্বাসে পুরোপুরি ভরসা করার মতো কোনো কারণ তৈরি হয়নি।
কূটনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর দিকগুলো একপাশে রাখলেও ট্রাম্প এখন আশা করতে পারেন যে, পুতিনের সঙ্গে তাঁর এই সর্বশেষ চুক্তি মার্কিন ভোটারদের বোঝাতে সাহায্য করবে—অর্থনৈতিক স্বস্তি আনার বিষয়ে তাঁর প্রতিশ্রুতি নিছক কথার কথা ছিল না।