কম প্রত্যাশার মাঝে এক ধরণের স্বাধীনতা খুঁজে পাওয়া যায়। মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকানদের জন্য যে পূর্বাভাসগুলো ছিল, তা এতটাই হতাশাজনক যে মতামত জরিপ পর্যবেক্ষণকারীরা এক ধরণের রসিকতা শুরু করেছিলেন—এই ফলাফলের অর্থ হবে হয় ট্রাম্প–যুগের অবসান, না হয় জরিপ ব্যবস্থার অবসান।
এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে রিপাবলিকানদের যেকোনো জয়কেই একটি অলৌকিক ঘটনা হিসেবে গণ্য করা হতো। ধারণা করা হয়েছিল ডেমোক্র্যাটরা বিপুল ব্যবধানে জয়লাভ করবেন; অন্যদিকে রিপাবলিকানরা মনে করেছিলেন যে মূল গণনার ফলাফল কিছুটা মিশ্র হলেও তারা অন্তত এই দাবি করার সুযোগ পাবেন যে, সবাই যতটা খারাপ ভেবেছিল তারা ততটা খারাপ করেননি।
তবে বর্তমান সময়ে সেই দাবিগুলোর আর কোনো মূল্য দেওয়ার সুযোগ নেই। ভোটাররা ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রতি তাদের তীব্র অসন্তোষের এক স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন এবং তাঁর ক্ষমতা খর্ব করার পক্ষে একচ্ছত্র রায় দিয়েছেন।
এখন সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের ফলে ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্ট ও তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করতে পারবেন, নিজেদের এজেন্ডাগুলোকে প্রকাশ্যে আনতে পারবেন, কংগ্রেসের সাংবিধানিক অধিকারসমূহ বজায় রাখতে পারবেন এবং রিপাবলিকানদের বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়াটি আটকে দিতে সক্ষম হবেন।
আগামী দিন এবং সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প হয়তো কখনো বলবেন যে রিপাবলিকানদের এই পরাজয় আসলে ভুয়া—এটি ডেমোক্র্যাট এবং অবৈধ অভিবাসীদের এক গোপন চক্রান্তের ফল। আবার কখনো বলবেন পরাজয় সত্যি, তবে দোষটা অন্য কারও।
তাঁর প্রশাসন গত কয়েক সপ্তাহে ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, বিশেষ করে আলাস্কার মতো তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট আসনগুলোর ফলাফল প্রত্যয়ন বন্ধ করার চেষ্টা করা হতে পারে।
তবে সেই পরিকল্পনার গতি এখন সম্ভবত অনেকটাই স্তিমিত হয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মঙ্গলবার রাতে নিউইয়র্ক টাইমসকে জানিয়েছেন, তিনি এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবেন। এটি নিশ্চিত যে তিনি মাইকের সামনে চিৎকার করবেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বড় অক্ষরের লেখা দিয়ে রাগ প্রকাশ করবেন। কিন্তু এতে বিশেষ কোনো লাভ হবে না। কারণ, মঙ্গলবার রাতে—২০১৬ সালে হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে অপ্রত্যাশিত জয়ের ঠিক ১০ বছর পর—ট্রাম্প যুগের কার্যকর অবসান ঘটেছে।
আগামী দুই বছর গত দুই বছরের মতো একেবারেই হবে না। ক্ষমতায় ফেরার প্রথম কয়েক মাসে, যখন তার নিয়ন্ত্রণে ছিল একচ্ছত্র সরকার এবং বলা হচ্ছিল যে ব্যাপক সামাজিক অসন্তোষ ও ‘অ্যান্টি-ওক’ ভাবাবেগের ওপর ভর করে তিনি ২০২৪ সালে আবার ক্ষমতায় এসেছেন, তখন মনে হয়েছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প হয়তো আমেরিকায় একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থা জোরদার করতে সফল হবেন।
তিনি সরকারি প্রশাসনিক কাঠামো ঢেলে সাজিয়েছিলেন, শত শত চাকরি বিলুপ্ত করেছিলেন এবং হাজার হাজার পদ নিজের অনুগত ও অযোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে পূর্ণ করেছিলেন। তিনি বড় প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিজের সামাজিক এজেন্ডা চাপিয়ে দিয়েছিলেন—যেগুলো ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিশোধের ভয়ে তা মেনে নিয়েছিল।
তিনি কংগ্রেসের অর্থ বরাদ্দের ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছিলেন এবং জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের তোয়াক্কা না করে ইচ্ছেমতো করদাতাদের টাকার পুনর্বিন্যাস করেছিলেন।
আর তিনি এই সবকিছু করতে সক্ষম হয়েছিলেন, কারণ তাকে শক্তিশালী মনে হয়েছিল এবং বিরোধী পক্ষকে মনে হয়েছিল দুর্বল। নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে তিনি ধরে নিয়েছিলেন যে মানুষকে তার কথা মেনে চলতে বাধ্য করা যাবে, কারণ অমান্য করলে শাস্তির হুমকি দেওয়ার ক্ষমতা তার ছিল, আর ডেমোক্র্যাটদের তা ঠেকানোর শক্তি ছিল না।
এখন সেই ক্ষমতার চিত্রটি সম্পূর্ণ উল্টে গেছে। ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পুনর্নির্বাচন এখন কোনো ব্যাপক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন বলে মনে হয় না, বরং তা মূলত মূল্যস্ফীতির মতো বস্তুগত কারণগুলোর ফল ছিল। সেই একই অর্থনৈতিক ও সামাজিক কারণগুলো এখন রিপাবলিকানদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। গ্যাসের উচ্চমূল্য, ভোক্তাদের অসহায়ত্ব, ধারাবাহিক বেকারত্ব এবং চোখে পড়ার মতো বৈষম্য ভোটারদের ক্রুদ্ধ করে তুলেছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সমস্যাগুলোর বিষয়ে উদাসীন ও অসচেতন ছিলেন—এমনকি অনেক ক্ষেত্রে তিনি পরিস্থিতি আরও জটিল করেছেন। ইরানের সঙ্গে তার অপ্রয়োজনীয় ও বেপরোয়া যুদ্ধকে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে ট্রাম্প ব্যস্ত ছিলেন সরকারি ভবনে নিজের সুবিশাল ব্যানার টাঙাতে, হোয়াইট হাউসকে সোনায় মুড়ে নতুন রূপ দিতে এবং রাজনৈতিক মঞ্চে পুরুষ রাজনীতিবিদদের পিঠ ও পশ্চাদ্দেশ নিয়ে অদ্ভুত সব কটূক্তি করতে। তাঁকে দেখে মনে হয় তিনি একজন অহেতুক ও বাস্তবতা বিচ্ছিন্ন মানুষ, যেন সস্তা পরচুলা পরা মেরি অ্যান্টোয়ানেট।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৭ সালে পদার্পণ করবেন একটি শত্রুভাবাপন্ন কংগ্রেস, লক্ষণীয়ভাবে হ্রাস পাওয়া মানসিক ও শারীরিক সক্ষমতা, তলানিতে ঠেকে যাওয়া জনপ্রিয়তা এবং নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষের বাধ্যবাধকতা নিয়ে।
তদুপরি, তিনি নতুন বছরে পা দেবেন এক বিভক্ত জোটের মুখোমুখি হয়ে: ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্তে তার ভেতরের ঘনিষ্ঠ বলয়ে ফাটল ধরেছে এবং দলের সাধারণ কর্মীদের কাছে তার নির্ভরযোগ্যতা নষ্ট হয়েছে, যাদের কাছে ২০১৬ সালে তার ‘কোনো নতুন যুদ্ধ নয়’ প্রতিশ্রুতিটি নব্য–রক্ষণশীলদের নীতি থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়েছিল।
উচ্চাভিলাষী ও অপেক্ষাকৃত তরুণ রিপাবলিকানরা ক্ষমতার এই দুর্বলতা বুঝতে পারবেন। নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে তারা ট্রাম্পের বিরুদ্ধে যেতে শুরু করবেন; আর ট্রাম্পও কিছু ক্ষমতাহীন ও করুণ রাজাদের মতো তাদের এই বিশ্বাসঘাতকতায় ক্ষুব্ধ হয়ে নিজের রাজনৈতিক ভিত্তিকে সংগঠিত করার চেষ্টা করবেন। তবে কাউকে নতুন নেতা বানানো বা প্রতিশোধ নেওয়ার তার সেই ক্ষমতা আজকের পর অনেকটাই কমে যাবে।
ট্রাম্পের মূলশক্তি ছিল রিপাবলিকান সমর্থকদের ওপর তার অন্ধ প্রভাব—যার কারণে ভোটাররা তাকে চোখ বন্ধ করে অনুসরণ করত। মঙ্গলবার রাতের ডেমোক্র্যাটদের জয়ের ব্যবধান যদি কোনো সংকেত হয়, তবে ভোটাররা আর তাকে আগের মতো অনুসরণ করছে না।
মইরা ডনিগান দ্য গার্ডিয়ান ইউএস-এর একজন কলামিস্ট। দ্য গার্ডিয়ান থেকে সংক্ষেপে অনূদিত।