জন্মনিবন্ধন সনদে নামের এমন এক উদ্ভট বানান লেখা হয়েছে, যা দেখে খোদ মা-বাবাও তাঁদের সন্তানকে নতুন করে চিনতে বসেছেন। সরকারি দপ্তরের এই চরম গাফিলতির শিকার হয়ে এক নাগরিক এখন নিজের প্রকৃত পরিচয় ফিরে পাওয়ার লড়াইয়ে নেমেছেন। জন্মনিবন্ধন অধিদপ্তরের প্রতি লেখা এক খোলা চিঠিতে তিনি তাঁর এই চরম ভোগান্তি ও মানসিক যন্ত্রণার কথা ফুটিয়ে তুলেছেন।
আবেদনকারী নাগরিক তাঁর চিঠিতে লিখেছেন, “জন্মের পর আমার মা-বাবা শখ করে আমার একটি নাম রেখেছিলেন। সেই নামেই তাঁরা আমাকে ডাকতেন, আত্মীয়স্বজন চিনতেন, পাড়া–প্রতিবেশী চিনতেন। আমিও দিব্যি জানতাম, আমি কে। কিন্তু জন্মনিবন্ধন সনদ হাতে পেয়ে দেখলাম, আমার নামটি আর আমার নেই। সরকারি খাতায় আমার নামের যে বানান লেখা হয়েছে, তা দেখে আমার মা-বাবাও আমাকে নতুন করে চিনতে বসেছেন!”
তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, সনদে ব্যবহৃত বানানটি এতটাই অদ্ভুত যে তা বাংলা ভাষার কোনো বর্ণমালার সাথে মেলে না। এই বিষয়ে তিনি বলেন, “সেখানে এমন এক উদ্ভট বানান লেখা হয়েছে, নামের সেই বানান বাংলা ভাষার কোন বর্ণমালার অন্তর্ভুক্ত, তা জানতে অভিধান ঘেঁটেছি। অভিধান কিছু বলতে পারেনি। বাংলা ব্যাকরণও নীরব। শেষ পর্যন্ত মনে হয়েছে, বানানটি হয়তো কোনো গোপন ভাষায় লেখা, যার পাঠোদ্ধারের ক্ষমতা আমার মতো আম–পাবলিকের নেই। মনে হচ্ছে, কি–বোর্ডের ওপর কেউ ঘুমিয়ে পড়েছিলেন, আর কম্পিউটারটি সেই সুযোগে আমার নাম লিখে দিয়েছে!”
এই প্রশাসনিক ত্রুটির ফলে নাগরিককে এখন চরম ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, “বিপত্তি হলো, ভুলটি আমি করিনি; ভুলটি করেছে আপনার দপ্তর, অথচ সংশোধনের দায়িত্ব আমার। আমাকে আবেদন করতে হবে, কাগজপত্র জোগাড় করতে হবে, ফি দিতে হবে, দিনের পর দিন দপ্তরের বারান্দায় অপেক্ষা করতে হবে। অর্থাৎ আমার নামের বানান আপনারা বদলে দিয়েছেন, আর সেই বানান ফেরত পেতে আমার সময়, শ্রম ও অর্থ—তিনটিই জমা দিতে হবে।”
সরকারি ব্যবস্থার এই বৈপরীত্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “এ এক অভিনব ব্যবস্থা, মহোদয়! এখানে ভুল করার অধিকার এক পক্ষের, আর ভুলের খেসারত দেওয়ার দায়িত্ব অন্য পক্ষের। ভুলটি সরকারি, কিন্তু ভোগান্তিটি ব্যক্তিগত।”
নিজের মৌলিক অধিকার ফিরে পাওয়ার আকুতি জানিয়ে তিনি লিখেছেন, “মহোদয়, আমি নাম পরিবর্তনের আবেদন করিনি; আমি শুধু আমার নিজের নামটি ফেরত চাই। যে নাম নিয়ে জন্মেছি, যে নামে মা-বাবা ডাকেন, সে নামে পরিচিত হতে চাই—সেটুকু অধিকার ফিরে পেতে আর কতবার নিজের পরিচয় প্রমাণ করতে হবে?”
আবেদনকারী জন্মনিবন্ধন অধিদপ্তরের কাছে অনুরোধ করেছেন যেন দ্রুত তাঁর নামটি সংশোধন করা হয়। একইসাথে তিনি একটি বিশেষ প্রস্তাব দিয়েছেন, “অতএব, আপনার নিকট আকুল আবেদন, আমার নামটি সংশোধন করে আমাকে ফিরিয়ে দেওয়া হোক। আর সম্ভব হলে, যিনি নামটি ভুল লিখেছেন, তাঁকেও একবার সেটি পড়ে শোনানোর ব্যবস্থা করা হোক—তিনি যেন অন্তত বুঝতে পারেন, নিজের লেখা আর মানুষের পরিচয় এক জিনিস নয়।”
ভুল সংশোধনের প্রক্রিয়ায় যেন পুনরায় কোনো নতুন ভুল না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, “পরিশেষে একটি ছোট অনুরোধ। আমার নামের বানানটি সংশোধন করার আগে দয়া করে নিশ্চিত হবেন, সংশোধন করতে গিয়ে আবার নতুন কোনো নামের জন্ম হচ্ছে না। কারণ, আমার জন্ম একবার হয়েছে; প্রতিটি সংশোধনে নতুন করে জন্ম নেওয়ার মতো সময়, সামর্থ্য কিংবা শখ—কোনোটিই আমার নেই।”
চিঠির শেষে নিজেকে একজন ‘নামবিভ্রান্ত নাগরিক’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন যে, তাঁর জন্ম ও নিবন্ধন হয়ে থাকলেও প্রকৃত নামটি তিনি পাননি। তিনি লিখেছেন, “বিনীত নিবেদক, একজন নামবিভ্রান্ত নাগরিক, যাঁর জন্ম হয়েছে একবার, নিবন্ধনও হয়েছে—শুধু নামটি এখনো তাঁর হয়নি। নাম লেখা হয়েছে অন্যভাবে, আর নিজের পরিচয় ফিরে পেতে যাঁকে বারবার প্রমাণ করতে হচ্ছে—তিনি আসলে তিনিই।”
উল্লেখ্য, ওই নাগরিকের জন্মসনদে নামের পরিবর্তে যা লেখা হয়েছে তা হলো “ক্জক্ল্জ্”।