কানিজ ফাতেমার ১১ বছর বয়সী ছেলে রাজধানীর একটি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। এবার তার বৃত্তি পরীক্ষা। পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে গত মাসে স্কুল কর্তৃপক্ষ বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষাতেই জন্মনিবন্ধন সনদ জমা দিতে বলে। ২০১৫ সালে ছেলের জন্মসনদ নেওয়ার সময় কানিজ ফাতেমা শুধু ইংরেজি সংস্করণটি নিয়েছিলেন। সম্প্রতি দুই ভাষাতেই সনদ পেতে তিনি জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধনের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে অবাক হয়ে দেখেন, সেখানে বাংলা নামের জায়গায় লেখা অদ্ভুত কিছু শব্দ—‘ক্‌জ্‌ক্‌ল্‌জ্‌’। শুধু ছেলের নামই নয়, তাঁর স্বামীর নামের জায়গায় লেখা হয়েছে ‘লক্‌জ্‌ক্‌’।

গত রবিবার ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৪ কার্যালয়ে (মিরপুর–১০) গিয়ে দেখা যায়, এই ধরনের নামবিভ্রাটের কারণে সংশোধনের জন্য ভিড় করেছেন আরও অনেকে। মিজানুর রহমান নামের এক ব্যক্তি অন্য একজনের জন্মসনদ সংশোধন করতে এসেছিলেন, যেখানে আবেদনকারীর মায়ের নামের জায়গায় ‘শহানা’র পরিবর্তে লেখা ছিল ‘দতককা’। অন্যদিকে, নাছির আহম্মেদ বেলাল নামের একজন জানান, তাঁর বড় মেয়ের ইংরেজি নামের ক্ষেত্রে বড় ভুল হয়েছে। তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর নামের জায়গায় লেখা এসেছে ‘LJKLJF’। ভুক্তভোগীদের দাবি, এই ভুলগুলো তাঁরা করেননি, বরং নিবন্ধন কার্যালয় থেকেই এমন অদ্ভুত নাম বসানো হয়েছে।

এমন সব চ্যালেঞ্জের মধ্যেই আজ ৬ অক্টোবর মঙ্গলবার পালিত হচ্ছে জাতীয় জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য হলো ‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’।

এই প্রতিবেদনটি তৈরির জন্য যে আটজন নাগরিকের সঙ্গে কথা বলা হয়েছে, তাঁদের সবার জন্মসনদ ২০২০ সালের আগে করা। দেখা যাচ্ছে, নিবন্ধন কার্যালয়ের করা ভুলের দায়ভার এখন সাধারণ নাগরিকদের কাঁধে। যদিও নিবন্ধন কর্মকর্তারা দাবি করছেন, গত কয়েক বছর ধরে তাঁরা এই ধরনের অদ্ভুত নামের ভুলগুলো সংশোধন করে আসছেন। তবে বর্তমান সময়ে যেসব ভুল হচ্ছে, তার জন্য নাগরিকদের অসচেতনতাকেও দায়ী করছেন তাঁরা।

ভুক্তভোগীদের মনে তীব্র ক্ষোভ। নাছির আহম্মেদ বেলাল প্রশ্ন তুলেছেন, “যে ভুল আমি করিনি, সে ভুলের দায় কেন আমাকে নিতে হচ্ছে, কেন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে?”

রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের (জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে সারা দেশে ৫৩ লাখ ২৪ হাজারের বেশি জন্মনিবন্ধন করা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে প্রায় ৩৫ লাখ জন্মনিবন্ধন সংশোধন করা হয়েছে। এছাড়া মৃত্যুনিবন্ধন হয়েছে ৫ লাখ ৭৮ হাজারের বেশি এবং সংশোধন করা হয়েছে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার। গত বছর জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন সংশোধন করা হয়েছে প্রায় ৭৯ লাখ ১৭ হাজার ক্ষেত্রে।

নাম ও ঠিকানার ভুল সংশোধনের জন্য সরকার নির্ধারিত ফি ৫০ টাকা। সেই হিসেবে চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নাগরিকেরা সংশোধন বাবদ ফি দিয়েছেন সাড়ে ১৭ কোটি টাকা। গত বছর এই খাতে ভুক্তভোগীরা দিয়েছেন ৩৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি। তবে নাছির আহম্মেদের মতো যারা কম্পিউটারের দোকান থেকে আবেদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন, তাঁদের খরচ আরও বেড়ে যায়। তিনি জানান, দুই মেয়ের জন্মসনদ সংশোধনের আবেদন করতে দোকানের কর্মীকে তিনি দিয়েছেন ৩০০ টাকা। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যে ভুল আমি করিনি, সে ভুলের দায় কেন আমাকে নিতে হচ্ছে, কেন ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে?”

নিবন্ধন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই ধরনের ভুলের মূল কারণ হলো বাংলা ও ইংরেজির মধ্যে যেকোনো একটি ভাষায় সনদ চেয়ে আবেদন করা। তিন বছর আগে একই সঙ্গে বাংলা ও ইংরেজি সনদ দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি শুধু ইংরেজি সনদ চেয়ে আবেদন করতেন, তবে নিবন্ধন কার্যালয়ে বা দোকানের মাধ্যমে আবেদনপত্রে শুধু ইংরেজি ঘর পূরণ করা হতো। বাংলা ঘরে তখন যত্রতত্র কিছু টাইপ করে দেওয়া হতো। ফলে ইংরেজি সনদ সঠিক হলেও বাংলা সনদে নাম-ঠিকানা ভুল হয়ে যেত। একইভাবে যারা শুধু বাংলা সনদ নিয়েছিলেন, তাঁদের ইংরেজি নামের ক্ষেত্রে এই সমস্যা দেখা দিয়েছে।

তবে এই ভুল সংশোধনের পুরো চাপ এখন নাগরিকদের ওপর। বর্তমানে জন্মসনদ বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় এক পাতায় থাকে। ফলে যেকোনো একটি ভাষায় ভুল থাকলে পুরো সনদটিই অকেজো হয়ে পড়ে এবং সংশোধন ছাড়া তা ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। রাজধানী ঢাকার মতো সিটি করপোরেশনভুক্ত এলাকায় এই সংশোধনের জন্য ভুক্তভোগীকে চারটি ধাপ পার হতে হয়। প্রথমে অনলাইনে আবেদন করতে হয়, এরপর স্থানীয় কাউন্সিলর কার্যালয় বা সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট অঞ্চল কার্যালয়ে যেতে হয়। সেখান থেকে আবেদনটি জেলা প্রশাসকের অধীনে কর্মরত স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালকের নিবন্ধিত অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয়। তাঁর অনুমোদনের পর তা পুনরায় স্থানীয় কাউন্সিলর বা অঞ্চল কার্যালয়ে ফিরে আসে। পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইন ভিত্তিক হলেও আবেদনকারীকে ধাপে ধাপে এসব কার্যালয়ে যাতায়াত করতে হয়। ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রে এই প্রক্রিয়াটি ইউপি থেকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে এবং পুনরায় ইউপি পর্যন্ত বিস্তৃত।

কানিজ ফাতেমার ছেলের স্কুলের আরও কয়েকজন অভিভাবকও একই ধরনের বিভ্রান্তির কথা জানিয়েছেন। ফারজানা রহমান নামের এক মা জানান, তাঁর সন্তানের সনদে নাম এসেছে ‘ইউওইউও’। তাঁর স্বামী ও মেয়ে—তিনজনের নামই এমন অদ্ভুতভাবে লেখা হয়েছে। তুহিনা আক্তার নামের আরেক মা জানান, তাঁর মেয়ের বাংলা নাম ঠিক থাকলেও স্বামী-স্ত্রীর নামের জায়গায় শুধু ‘০’ আর ‘–’ দেওয়া হয়েছে। ওই তিন অভিভাবকই জানান, স্কুলের বৃত্তি পরীক্ষার্থীদের অনেকেরই নামের সংশোধন প্রয়োজন হবে বলে স্কুল কর্তৃপক্ষ আপাতত আগের ইংরেজি জন্মসনদ গ্রহণ করেছে এবং বাংলা সনদ পরে জমা দিতে বলেছে। এখন সংশোধনের জন্য যে দীর্ঘ প্রক্রিয়া পার হতে হবে, তা ভেবেই তাঁরা দুশ্চিন্তায় আছেন।

জন্মসনদ একটি আন্তর্জাতিক নথি। উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে আধুনিকীকরণ এবং ভিসাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে জালিয়াতি রোধ করতে ২০২৩ সাল থেকে বাংলা ও ইংরেজি সনদ একসঙ্গে দেওয়া শুরু হয়। এর ফলে আগের ভুলগুলো এখন সামনে আসছে এবং সেগুলো সংশোধন করতে হচ্ছে।

অঞ্চল–৪ কার্যালয়ে মোহাম্মদ আমির হোসেন নামের আরেক ভুক্তভোগী মুক্তকণ্ঠকে বলেন, তাঁর বোনের জন্মসনদ সংশোধন করতে গিয়ে তিনি আরও জটিলতায় পড়েছেন। ২০০৮ সালে করা এই নিবন্ধনটি আগে ইব্রাহিমপুরের ঠিকানায় সিটি করপোরেশনের অঞ্চল–৭-এ ছিল। বর্তমানে কর্তৃপক্ষ ওই এলাকা অঞ্চল–৪-এ নিয়ে এসেছে। নিয়ম অনুযায়ী জন্মনিবন্ধন স্বয়ংক্রিয়ভাবে অঞ্চল–৪-এ চলে আসা উচিত ছিল, কিন্তু তা হয়নি। উল্টো জন্মনিবন্ধন দুই অঞ্চলে দুটি দেখাচ্ছে এবং উভয়ই ভুলে ভরা। ভুল সংশোধন ও অঞ্চল স্থানান্তরের জন্য তিনি গত সাত দিন ধরে ছোটাছুটি করছেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন করেন, “কর্তৃপক্ষের ভুলের কারণে আমাদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে কেন?”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, ২০২৩ সালের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধু বাংলা সনদের ভুলই প্রায় ১০ কোটির মতো, যার সম্পূর্ণ দায় নিবন্ধন কার্যালয়ের। সে সময় পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল যেন কার্যালয় থেকে ক্ষমা চেয়ে নাগরিকদের বিনা মূল্যে সংশোধনের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তারা তাতে রাজি হননি। তাঁদের মতে, এটি ব্যক্তির তথ্য, তাই ব্যক্তির আবেদন করেই সংশোধন করা উচিত।

ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা কেবল অন্যের নয়, এই প্রতিবেদককেও নিজের ও সন্তানদের জন্মসনদ সংশোধন করতে হয়েছে। ইংরেজিতে নেওয়া সনদের বাংলা নামের জায়গায় নিবন্ধন কার্যালয় থেকে বানান ভুল ও ইচ্ছেমতো নাম বসানো হয়েছিল।

প্রজ্ঞার নির্বাহী পরিচালক এ বি এম জুবায়ের জানান, তাঁকেও এমন সংশোধনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, যেখানে ভুল তাঁর ছিল না। গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞা জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন নিয়ে কাজ করে। এ বি এম জুবায়ের মুক্তকণ্ঠকে বলেন, নিবন্ধন কার্যালয়ের এ ধরনের ভুল ‘ইচ্ছাকৃত’ বলে অহরহ শোনা যায়। অভিযোগ আছে, এভাবে ‘টাকা খাওয়ার’ ফাঁদ পেতে রাখা হয়েছে। কারণ, যত ভুল হবে, ততবার নাগরিকেরা সংশোধন করতে আসবেন এবং ততবার একটি অসাধু চক্র টাকা আয় করবে। প্রতি সংশোধন বাবদ নাগরিকের ব্যয় হিসাব করলে সম্মিলিতভাবে সে অর্থ বিপুল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৬৭ শতাংশ শিশু স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে জন্ম নেয়। এ বি এম জুবায়ের মনে করেন, এসব প্রতিষ্ঠানকে জন্মের পরপরই শিশুর নিবন্ধনের দায়িত্ব বাধ্যতামূলকভাবে দিলে ভুলের হার ও ভোগান্তি কমে আসবে। এর জন্য জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন আইন, ২০০৪ সংশোধন করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

অদ্ভুত নামের ভুলসহ বর্তমানের ভোগান্তি সম্পর্কে জানতে চাইলে রেজিস্ট্রার জেনারেল (অতিরিক্ত দায়িত্ব) আবু নছর মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ মুক্তকণ্ঠকে বলেন, “আগের সেসব ভুল কয়েক বছর ধরে সংশোধন করতে হচ্ছে। জন্মসনদ একটি আন্তর্জাতিক নথি। মূলত উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে জন্মসনদের আধুনিকীকরণ ও ভিসাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে জালিয়াতি প্রতিরোধে ২০২৩ সাল থেকে বাংলা ও ইংরেজি সনদ একসঙ্গে দেওয়া শুরু হয়। সরকার ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’–এর যে উদ্যোগ নিয়েছে, সেখানে জন্মনিবন্ধনও সম্পৃক্ত। ফলে সরকারের ডিজিটাইজড সুশাসনের সুবিধা তারাই পাবে, যাদের জন্মনিবন্ধন নির্ভুল হবে। এ জন্য নাগরিকদেরও সচেতন হওয়া দরকার। নিজের বা সন্তানের আবেদন অন্য ব্যক্তিকে দিয়ে না করিয়ে নিজে করলে ভুল কম হবে।”