জন্মসনদে নামের একটি অক্ষর ভুল। কোথাও জন্মতারিখ, কোথাও মা–বাবার নাম, আবার কোথাও ঠিকানা। আপাতদৃষ্টিতে এসব ছোটখাটো প্রশাসনিক ভুল। কিন্তু এই ভুল যখন জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট বা অন্য কোনো সরকারি নথির সঙ্গে অসামঞ্জস্য তৈরি করে, তখন ছোট ভুলটি নাগরিকের জন্য বড় ভোগান্তিতে পরিণত হয়।

৬ অক্টোবর মুক্তকণ্ঠয় প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ৮ মাসে দেশে প্রায় ৩৫ লাখ জন্মনিবন্ধন সংশোধন করা হয়েছে। সংশোধনের নির্ধারিত ফি হিসেবেই নাগরিকদের এতে দিতে হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকা। অথচ এসব ভুলের বেশির ভাগই নাগরিকের তৈরি নয়। ভুল যারই হোক, সংশোধনের ভোগান্তি শেষ পর্যন্ত নাগরিককেই পোহাতে হচ্ছে। তারপরও এসব ভুলের দায় অপরিমেয়, যা মানুষের উৎপাদনশীলতা ও জীবনমানকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

প্রশ্ন হলো, ভুল হয় কেন? তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, ভুলের দায় কার এবং তার খরচ কে বহন করবে? এখানেই জন্মসনদ বা জাতীয় পরিচয়পত্রের মতো নাগরিকসেবা একটি রাজনৈতিক অর্থনীতির প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

অর্থনীতিতে লেনদেনের খরচ বলতে কোনো কাজ সম্পন্ন করার মূল খরচের বাইরে তথ্য সংগ্রহ, যাতায়াত, সময়, শ্রম ও অনিশ্চয়তার মতো অতিরিক্ত খরচকে বোঝানো হয়। সরকারি কোনো নথিতে ভুল সংশোধনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি হয়তো সামান্য। কিন্তু অফিসে যাওয়া, অপেক্ষা করা, কাগজ সংগ্রহ করা, কাজের সময় নষ্ট করা এবং বারবার যোগাযোগ করার খরচ অনেক বেশি হতে পারে। অর্থাৎ প্রশাসনের একটি ভুলের সামাজিক খরচ নাগরিকের ঘাড়ে পড়ে।

এখানে ‘প্রশাসনিক বোঝা’র ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনিক বোঝার প্রথমটিই হচ্ছে শিক্ষণ ব্যয়। নাগরিককে প্রথমে জানতে হয় কী করতে হবে এবং কোথায় যেতে হবে। এরপর তাঁকে ফর্ম, কাগজপত্র, যাচাই ও অফিসে উপস্থিতির মতো নানা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এগুলো নিয়মাচারের খরচ তথা কমপ্লায়েন্স কস্ট। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও হতাশার মতো মানসিক খরচ বা সাইকোলজিক্যাল কস্ট। এ ছাড়া এসব প্রশাসনিক বোঝার কারণে নষ্ট হওয়া উৎপাদনশীলতা তৈরি করে সুযোগ ব্যয় বা অপরচুনিটি কস্ট। এর বোঝা, যা সামষ্টিক অর্থে দেশের জন্য ক্ষতিকর।

কিন্তু ভুলটি যদি নাগরিকের না হয়, তাহলে এই বোঝা নাগরিক বহন করবেন কেন?

নাগরিকের ভোগান্তিকে পরিমাপযোগ্য করতে হবে। প্রতিটি নাগরিকসেবার জন্য একটি ‘নাগরিক ভোগান্তি ও সেবা-জবাবদিহি ড্যাশবোর্ড’ তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে কোন সেবায় কত অভিযোগ এসেছে, কতগুলো ভুল সংশোধনের আবেদন হয়েছে, গড়ে কত দিনে কাজ হয়েছে, কত আবেদন নির্ধারিত সময় অতিক্রম করেছে, একই ধরনের ভুল কতবার হয়েছে এবং ভুলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে নাগরিকের ভোগান্তি আর বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা না হয়ে পরিমাপযোগ্য সরকারি কর্মদক্ষতার তথ্যে পরিণত হবে।

এখানে প্রধান প্রতিনিধি তত্ত্ব (প্রিন্সিপাল এজেন্ট থিওরি) প্রাসঙ্গিক। নাগরিকেরা রাষ্ট্রের মালিক ও সেবার অধিকারী। অন্যদিকে সরকারি কর্মী ও প্রতিষ্ঠান নাগরিকের সেবক হিসেবে নাগরিকদের সেবা প্রদান করেন। কিন্তু নাগরিকেরা সব সময় জানেন না কোথায় ভুল হয়েছে, কে ভুল করেছে, কেন হয়েছে এবং সংশোধনে কত সময় প্রয়োজন। ফলে তথ্যের অসমতা তৈরি হয়। এ তথ্যের অসমতার সুযোগে কায়েমি গোষ্ঠী কাজের ক্ষেত্রে কার্যত কোনো অবদান না রেখেই বিশেষ সুবিধা আদায়ের সুযোগ তৈরি করে এবং একটি কাজের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় স্বেচ্ছায় ভুল করে, যাতে ভবিষ্যতেও সুবিধা আদায়ের সুযোগ অব্যাহত থাকে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় দায় বহনের অসমতা। একটি ভুল তথ্য এন্ট্রির কারণে নাগরিককে বিভিন্ন খরচ বহন করতে হয়। কিন্তু যে পর্যায়ে ভুলটি হয়েছে, সেই কর্মী বা প্রতিষ্ঠানের ওপর তার সমপরিমাণ দায় সাধারণত পড়ে না।

আবার এই দায় প্রত্যেক নাগরিকের জন্যও সমান নয়। এটি শহর-গ্রাম থেকে শুরু করে শিক্ষিত-অশিক্ষিতসহ নানা সূচকে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় দায় চাপাতে পারে। একজন সচ্ছল, শিক্ষিত ও শহুরে নাগরিক হয়তো তুলনামূলকভাবে সহজে সমস্যার সমাধান করতে পারেন, কিন্তু নিম্ন আয়ের একজন গ্রামের মানুষের জন্য একই ভুলের অর্থ হতে পারে এক দিনের আয় হারানোর সঙ্গে সঙ্গে শহরে যাতায়াতের খরচ। তাই প্রশাসনিক ভুল প্রত্যেকের জন্য সমান হলেও তার আর্থিক বা সামাজিক খরচ ব্যক্তিভেদে ভিন্নও হতে পারে।

অর্থাৎ এর ফলে রাষ্ট্রে একটি অসম দায়কাঠামো তৈরি হয়, যেখানে ভুল যিনি করেন তাঁর খরচ কম, কিন্তু ভুল সংশোধনের নাগরিক খরচ অনেক বেশি এবং তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন।

এখানে একটি কার্যকর তথ্য প্রস্তুতকারী ও যাচাইকারীর জবাবদিহির ব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি। সরকারি নথিতে কে তথ্য গ্রহণ করলেন, কে তা প্রবেশ করালেন এবং কে যাচাই বা অনুমোদন করলেন, তার ডিজিটাল রেকর্ড থাকা উচিত। সর্বোপরি যে ব্যবস্থার মাধ্যমে ভুল তৈরি হয়েছে, সেই ব্যবস্থার দায়িত্বশীল ব্যক্তির ভুলের জন্য মাত্রাভেদে জবাবদিহি ও শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে সরকারি ভুলের কারণে নাগরিককে সংশোধনের ফি না দেওয়া এবং যুক্তিসংগত ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাও বিবেচনা করা উচিত।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক নির্দেশিকাতেও নিবন্ধন কর্মীদের ভুল, অবহেলা বা ক্ষমতার অপব্যবহারের ক্ষেত্রে জরিমানা ও বিভাগীয় শাস্তির মতো ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ জবাবদিহির ধারণাটি অস্বাভাবিক কিছু নয়, প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে সেটিকে কীভাবে কার্যকর করা যায়?

সমাজবিজ্ঞানী মাইকেল লিপস্কির মাঠপর্যায়ের আমলাতন্ত্রের তত্ত্ব এ ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা দেয়। নাগরিক রাষ্ট্রকে শুধু আইন বা নীতিমালার মাধ্যমে অনুভব করেন না। তিনি রাষ্ট্রকে অনুভব করেন সেই কর্মকর্তা, কাউন্টার, দপ্তর ও ব্যবস্থার মাধ্যমে, যেখানে তাঁর কাজটি সম্পন্ন হওয়ার কথা।

মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের হাতে কিছুটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা থাকেই। প্রশাসনের বাস্তবতা সামলাতে সেটি অনেক ক্ষেত্রেই প্রয়োজন। কিন্তু প্রক্রিয়া যত জটিল ও অনিশ্চিত হয়, নাগরিকের অসহায়ত্ব তত বাড়ে। আর এখানেই অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতাকারী বা কায়েমি গোষ্ঠীর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার যৌক্তিকীকরণ শুধু নয়, বরং অপ্রয়োজনীয় জটিলতা ও অনিশ্চয়তা কমানো এবং সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

শুধু অভিযোগ গ্রহণ করলেই হবে না। নাগরিকের ভোগান্তিকে পরিমাপযোগ্য করতে হবে। প্রতিটি নাগরিকসেবার জন্য একটি ‘নাগরিক ভোগান্তি ও সেবা-জবাবদিহি ড্যাশবোর্ড’ তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে কোন সেবায় কত অভিযোগ এসেছে, কতগুলো ভুল সংশোধনের আবেদন হয়েছে, গড়ে কত দিনে কাজ হয়েছে, কত আবেদন নির্ধারিত সময় অতিক্রম করেছে, একই ধরনের ভুল কতবার হয়েছে এবং ভুলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে নাগরিকের ভোগান্তি আর বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা না হয়ে পরিমাপযোগ্য সরকারি কর্মদক্ষতার তথ্যে পরিণত হবে।

এটি রাষ্ট্রের সক্ষমতারও প্রশ্ন। রাষ্ট্রের সক্ষমতা শুধু কতটি সনদ ইস্যু হলো তা দিয়ে মাপা যায় না। রাষ্ট্র কতটা নির্ভুল তথ্য তৈরি করতে পারে, নিজের ভুল কত দ্রুত শনাক্ত করতে পারে এবং ভুলের দায় কতটা কার্যকরভাবে নির্ধারণ করতে পারে, সেটিও প্রশাসনিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।

রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য পরীক্ষা বড় বক্তৃতায় নয়, নাগরিকের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায়। জন্মসনদে একটি ভুল হয়তো একটি ছোট প্রশাসনিক ত্রুটি। কিন্তু যখন লাখ লাখ সংশোধন, কোটি কোটি টাকার নাগরিক ব্যয় এবং অসংখ্য কর্মঘণ্টা হারানোর বিষয় সামনে আসে, তখন সেটি আর ছোট সমস্যা থাকে না। এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার ‘সামাজিক চুক্তি’র প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। নাগরিকের ভুল হলে নাগরিককে জবাবদিহি করতে হয়। তাহলে রাষ্ট্রের ভুল হলে রাষ্ট্রের কোন অংশ জবাবদিহি করবে?

এখানেই রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ আছে। রাজনীতি শুধু বড় অবকাঠামো বা নীতিগত পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে নাগরিকের প্রতিদিনের রাষ্ট্রীয় অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রতিযোগিতা করতে পারে।

কোনো রাজনৈতিক দল চাইলে একটি ‘নাগরিকসেবা জবাবদিহি কর্মসূচি’ দিতে পারে। জন্মনিবন্ধন, জাতীয় পরিচয়পত্র, মৃত্যুসনদ, ভূমি রেকর্ড, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স, করসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো সেবায় নির্দিষ্ট সেবার মান, সর্বোচ্চ সময়সীমা, ভুল হলে দায় নির্ধারণ, নাগরিকের প্রতিকার এবং প্রকাশ্য ভোগান্তি-তথ্যভান্ডারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া যেতে পারে।

এ ধরনের কর্মসূচির রাজনৈতিক মূল্যও কম নয়। কারণ, রাষ্ট্র সংস্কারের সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য পরীক্ষা বড় বক্তৃতায় নয়, নাগরিকের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতায়। জন্মসনদে একটি ভুল হয়তো একটি ছোট প্রশাসনিক ত্রুটি। কিন্তু যখন লাখ লাখ সংশোধন, কোটি কোটি টাকার নাগরিক ব্যয় এবং অসংখ্য কর্মঘণ্টা হারানোর বিষয় সামনে আসে, তখন সেটি আর ছোট সমস্যা থাকে না। এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার ‘সামাজিক চুক্তি’র প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। নাগরিকের ভুল হলে নাগরিককে জবাবদিহি করতে হয়। তাহলে রাষ্ট্রের ভুল হলে রাষ্ট্রের কোন অংশ জবাবদিহি করবে?

একটি সক্ষম রাষ্ট্রের পরিচয় শুধু সে কত দ্রুত সেবা দিতে পারে তা নয়; সে কত কম ভুল করে, ভুল হলে কে দায় নেয় এবং নাগরিকের ভোগান্তি কমাতে রাষ্ট্র নিজে কতটা দায়িত্ব নেয়, সেটিও তার সক্ষমতার মাপকাঠি।

• কামরুল ইসলাম সুশাসন, ব্যাংকিং ও রাজনৈতিক অর্থনীতি বিশ্লেষক।

ই–মেইল: md. kamrulislam 0128 @gmail. com

*মতামত লেখকের নিজস্ব