একজন নাগরিকের জীবনচক্রের সবচেয়ে মৌলিক রাষ্ট্রীয় নথির একটি হলো জন্মনিবন্ধন। শিক্ষাগ্রহণ, পাসপোর্ট সংগ্রহ, জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি, চাকরির আবেদন কিংবা ব্যাংকিং সেবার মতো প্রায় প্রতিটি প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবায় এই নথির অপরিহার্যতা অপরিসীম। তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, এই গুরুত্বপূর্ণ নথিতেই নিবন্ধন কার্যালয়ের চরম গাফিলতির কারণে ‘ক্জ্ক্ল্জ্’, ‘লক্জ্ক্’, ‘দতককা’ কিংবা ‘LJKLJF’-এর মতো অদ্ভুত ও অর্থহীন নাম লেখা থাকছে। এই ধরনের ভুলের ব্যাপকতা এতটাই বেশি যে, একে কেবল সাধারণ কারিগরি ত্রুটি হিসেবে গণ্য করে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। প্রকৃতপক্ষে, এটি রাষ্ট্রীয় সেবাব্যবস্থার এক চরম ও সুস্পষ্ট ব্যর্থতা।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ব্যর্থতা কোনো বিচ্ছিন্ন বা একক ঘটনা নয়। বছরের পর বছর ধরে বিপুল সংখ্যক নাগরিককে এই একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের দেওয়া তথ্যানুসারে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত দেশে নতুন জন্মনিবন্ধন করা হয়েছে ৫৩ লাখ ২৪ হাজারেরও বেশি। একই সময়ে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে জন্মনিবন্ধন সংশোধন করা হয়েছে প্রায় ৩৫ লাখ। এছাড়া গত বছর জন্ম ও মৃত্যুনিবন্ধন সংশোধন করা হয়েছে প্রায় ৭৯ লাখ ১৭ হাজার।

এখানেই বড় প্রশ্নটি সামনে আসে—এত বিপুল সংখ্যক সংশোধনের প্রয়োজন কেন পড়ল? আর সবচেয়ে বড় কথা, যে ভুল নাগরিক করেননি, সেই ভুল সংশোধনের দায়ভার কেন নাগরিককেই বহন করতে হবে?

প্রাপ্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগে কেবল বাংলা বা ইংরেজি ভাষায় সনদ নেওয়ার সময় অন্য ভাষার ঘরে যথেচ্ছ তথ্য বসিয়ে দেওয়া হতো। এর ফলে দেখা যেত, এক ভাষার সনদ সঠিক থাকলেও অন্য ভাষায় অদ্ভুত নাম বা ঠিকানা চলে এসেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তরাই স্বীকার করছেন যে, তাঁরা গত কয়েক বছর ধরে এই ধরনের ভুল সংশোধন করে আসছেন। ২০২৩ সালের একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধু বাংলা সনদের ভুলই ছিল প্রায় ১০ কোটি। এত বিশাল পরিমাণ ভুল থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কেন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বিনা মূল্যে তা সংশোধনের উদ্যোগ নিল না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে আমরা দেখছি, উল্টো নাগরিককেই দীর্ঘ ও জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। ঢাকায় অনলাইনে আবেদন করার পর নাগরিককে কাউন্সিলর বা অঞ্চল কার্যালয় এবং স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালকের দপ্তর হয়ে পুনরায় স্থানীয় কার্যালয়ে ফিরে আসতে হয়। ডিজিটাল ব্যবস্থার যুগেও যদি নাগরিককে এভাবে দপ্তরে দপ্তরে ঘুরতে হয়, তবে সেই ডিজিটালাইজেশনের প্রকৃত সার্থকতা কোথায়?

এর পাশাপাশি রয়েছে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির ব্যাপার। নাম ও ঠিকানা সংশোধনের সরকারি ফি নির্ধারিত ৫০ টাকা। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে নাগরিকেরা এই খাতে প্রায় সাড়ে ১৭ কোটি টাকা প্রদান করেছেন; গত বছর এই অংক ছিল ৩৯ কোটি ৫৮ লাখ টাকার বেশি। সরকারি ফি ছাড়াও কম্পিউটারের দোকান, যাতায়াত খরচ এবং কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার যে আর্থিক ক্ষতি হয়, তা তো গণনার বাইরে।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি হলো, নিবন্ধন কার্যালয়ের এই ভুলগুলো পরিকল্পিত বা ‘ইচ্ছাকৃত’ এবং এর মাধ্যমে ‘টাকা খাওয়ার’ ফাঁদ পাতা হয়েছে—এমন কথা অহরহ শোনা যায়। সহজ হিসাব হলো, যত বেশি ভুল হবে, তত বেশি সংশোধন করতে হবে এবং তত বেশি অর্থের লেনদেন হবে। এই অভিযোগটি সত্য কি না, তা অবশ্যই গুরুত্বের সাথে তদন্ত করা উচিত। কিন্তু কর্তৃপক্ষ যদি দীর্ঘ সময় ধরে এমন অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত না করে, তবে সন্দেহ থেকেই যায়।

অবশ্য নাগরিকের সচেতনতা অত্যন্ত প্রয়োজন। তবে নাগরিক যদি সঠিক তথ্য প্রদান করেন এবং তারপরও নিবন্ধন কার্যালয় ভুল করে, তবে তার দায়ভার নাগরিকের ওপর চাপানো যাবে না। আমরা মনে করি, পুরোনো ভুলের যথাযথ নিরীক্ষা করে দায় নির্ধারণ করতে হবে, বিনা ফিতে ভুল সংশোধনের ব্যবস্থা করতে হবে, আবেদনকারীর চূড়ান্ত তথ্য যাচাইয়ের সুযোগ দিতে হবে এবং সফটওয়্যারভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জন্মের পরপরই নিবন্ধনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

‘নির্ভুল নিবন্ধন, নিশ্চিত হবে সুশাসন’—এই প্রতিপাদ্যটি তখনই অর্থবহ হবে, যখন নির্ভুল নিবন্ধনকে কেবল নাগরিকের দায়িত্ব নয়, বরং রাষ্ট্রেরও একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হবে। বছরের পর বছর ধরে একই ভুল চলতে দেওয়া এবং তার দায় নাগরিকের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার এই সংস্কৃতি আর চলতে পারে না।