রাজধানীর মিরপুর এলাকার শেওড়াপাড়ার ভেতরের গলিগুলোতে বর্তমান পরিস্থিতি এমন যে, মানুষ এখন আর সাধারণ রাস্তার পথ ব্যবহার করেন না, বরং পরিখা পার হয়ে যাতায়াত করেন। অনেক জায়গায় রাস্তার পাশে ফেলে রাখা বিশাল ড্রেনেজ পাইপের ভেতর দিয়ে ঢুকে অন্য পাশে বের হওয়াই এখন একমাত্র পথ। একজন তরুণের কাছে এই পরিস্থিতি বিরক্তিকর মনে হলেও, একজন বয়স্ক মানুষ, স্কুলব্যাগ কাঁধে কোনো শিশু কিংবা কোলে সন্তান নিয়ে একজন মায়ের জন্য এটি রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ।
এই খোঁড়াখুঁড়ির কাজ শুরু হয়েছিল রমজানের আগে। কোনো দৃশ্যমান পরিকল্পনা ছাড়াই একসঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় খনন কাজ শুরু হয়। এরপর রমজান গেল, দুই ঈদ পার হলো এবং পুরো বর্ষাকাল কেটে গেল। ১২ জুলাই ভোরে মাত্র ছয় ঘণ্টায় ৭৬ মিলিমিটার বৃষ্টিতে শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও মণিপুর এলাকা তলিয়ে গিয়েছিল; আর এই খোঁড়া গলি ও অসমাপ্ত নালার কারণেই এলাকাটি সেই বর্ষার চরম ভোগান্তি সহ্য করেছে। আট মাস অতিবাহিত হওয়ার পরেও বর্তমান অবস্থা দেখে মনে হয়, চলতি বছরে এই কাজ শেষ করার কোনো আগ্রহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নেই।
অথচ গলির ড্রেন ও রাস্তা নির্মাণ এ দেশের সবচেয়ে সহজ নির্মাণকাজগুলোর একটি। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে যে কাজ দুই মাসে শেষ হওয়া সম্ভব, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) সেটিকে যেন প্রায় একটি মেগা প্রকল্পে পরিণত করেছে। শুধু শেওড়াপাড়াই নয়, খিলগাঁও, মোহাম্মদপুর, উত্তরা কিংবা পুরান ঢাকার পরিস্থিতিও একই রকম। খিলগাঁওয়ের সিপাহীবাগে ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন লাইনের জন্য ঠিক আমাদের মতোই রমজানের আগে রাস্তা বন্ধ করা হয়েছিল; এমনকি জুনেও সেখানে কাজ শেষ হওয়ার তারিখ উল্লেখ করে কোনো সাইনবোর্ড লাগানো ছিল না।
মোহাম্মদপুরে একজন প্রতিমন্ত্রী নতুন রাস্তার ফাটল ও ধস প্রত্যক্ষ করেছেন। অন্যদিকে, দক্ষিণ সিটির প্রশাসক ১ অক্টোবর খোদ তাঁর আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রবেশপথে ওয়াসার দীর্ঘদিনের খোঁড়াখুঁড়ির বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। যিনি নিজের অফিসের সামনের গর্ত সামলাতে পারছেন না, তিনি সাধারণ নাগরিকের গলির খবর রাখবেন কীভাবে?
সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে। ঢাকা ওয়াসার ৫ হাজার ১৮৭ কোটি টাকার স্যানিটেশন প্রকল্পে দুই সিটিতে মোট ৫২৯ কিলোমিটার সড়ক কাটা হবে। এর আগে পানির লাইনের জন্য ২০১৭ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই শহরের রাস্তা একবার খোঁড়া হয়েছে। ওয়াসার এমডি নিজেই মুক্তকণ্ঠকে বলেছেন, “প্রযুক্তিগত” জ্ঞানের অভাবে অতীতে একই সড়ক বারবার খুঁড়তে হয়েছে।
চলতি অর্থবছরে ডিএনসিসির ৪ হাজার ৫২৭ কোটি টাকার বাজেটে সবচেয়ে বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে সড়ক, ফুটপাত ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়, যার পরিমাণ ১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা। দক্ষিণ সিটির বাজেটেও সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সড়কের জন্য।
আসলে নিয়ম তো আছে। ‘ঢাকা মহানগরীর সড়ক খনন নীতিমালা ২০১৯’ অনুযায়ী, পুরো সড়ক একসঙ্গে খোঁড়া যাবে না, কাজ হবে ১৫ দিনের ছোট ছোট ভাগে, খননের মাটি সরাতে হবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, আর জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জরুরি কাজ ছাড়া খোঁড়াখুঁড়ি নিষিদ্ধ। ২০২৫ সালের মার্চে ডিএমপি জানিয়েছে, রাস্তা খোঁড়া যাবে শুধু রাতে, কোনো রাস্তা সর্বোচ্চ সাত রাত খোঁড়া থাকবে এবং পরবর্তী তিন রাতের মধ্যে তা মেরামত করতে হবে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, আগামী বছর থেকে বর্ষায় খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধ থাকবে, আর সেজন্য অর্থবছর পরিবর্তন করে এপ্রিল থেকে মার্চ করা হচ্ছে।
অর্থাৎ ‘এক দিকে কাটা, আরেক দিকে মেরামত’, যেকোনো সাইট ইঞ্জিনিয়ারের প্রথম পাঠ এবং এটি সরকারেরই লিখিত নিয়ম। সাত রাতের নিয়মের বিপরীতে আমাদের আট মাসের ভোগান্তির তুলনা নিজেই কথা বলে। নিয়ম যে প্রয়োগ করা সম্ভব, তার প্রমাণ রয়েছে: ২০২৪ সালের জুলাইয়ে বিনা অনুমতিতে খননের দায়ে দক্ষিণ সিটি ওয়াসাকে খনন ফির পাঁচ গুণ, ভ্যাটসহ ১৩ লাখ ৭১ হাজার টাকা জরিমানা করেছিল। তাহলে বাকি সময় নিয়ম কেন কার্যকর হয় না?
আমাদের গলিগুলোতে মাত্র দুই বছর আগে ড্রেনেজ পাইপ বসানো হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও এসব রাস্তা অন্তত দুবার মেরামত করা হয়েছে। তখনো ভোগান্তি ছিল, তবে কাউকে পাইপের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হয়নি। পাইপের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর কারিগরি যুক্তি থাকতে পারে, কিন্তু সেক্ষেত্রে আগের নকশার মূল্যায়ন কোথায়? নতুন নকশার যৌক্তিকতা এবং বাড়তি খরচের হিসাব কি জনসমক্ষে আনা হয়েছে?
৭ অক্টোবর একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নির্দেশ দিয়েছেন, রাস্তার সঙ্গে ড্রেনেজ বাধ্যতামূলক এবং নির্মাণের তিন বছরের মধ্যে বড় ত্রুটি দেখা দিলে ঠিকাদারকেই তা ঠিক করে দিতে হবে। চুক্তিতে থাকবে গ্যারান্টি ক্লজ। এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। আমাদের গলির ভাষায় এর অর্থ হলো: দুই বছর আগের কাজ ত্রুটির কারণে আবার খুঁড়তে হলে সেই খরচ জনগণের নয়, বরং আগের ঠিকাদারের। কেউ কি সেই হিসাবটি করেছেন?
আমি জানতে চাই, এই কাজের দায়িত্বে কোন প্রকৌশলী নিয়োজিত আছেন? প্রতিটি সরকারি পূর্তকাজে চুক্তির ভাষায় একজন ‘ইঞ্জিনিয়ার’ থাকেন, যাঁর স্বাক্ষর ছাড়া ঠিকাদারের বিল পাস হয় না। ঠিকাদার আট মাস পরিখা খুলে রাখলে প্রশ্ন উঠবেই: তিনি কী ব্যবস্থা নিয়েছেন, প্রকল্প পরিচালককে কবে জানিয়েছেন এবং চুক্তি অনুযায়ী বিলম্বের জরিমানা কত আদায় করা হয়েছে? বিলম্ব ঠিকাদারের হলে দায় তাঁর, আর তদারকিতে গাফিলতি থাকলে দায় কর্মকর্তারও।
দক্ষিণের প্রশাসক ২৩ সেপ্টেম্বর বলেছেন, বিগত সরকারের আমলে টেন্ডার পাওয়া অনেক ঠিকাদার কাজ শেষ না করেই সরে গেছেন। কাজ পাওয়ার যোগ্যতা যখন রাজনৈতিক পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়, তখন সরকার বদলালে ঠিকাদারও উধাও হয়ে যান। কিন্তু ক্রয় বিধিমালা অনুযায়ী চুক্তি বাতিল, জামানত বাজেয়াপ্ত এবং নতুন দরপত্র আহ্বানের কাজগুলো দুই বছরেও হলো না কেন? যে প্রকৌশলী সেই ঠিকাদারের অগ্রগতি প্রত্যয়ন করেছিলেন, তিনি তো এখনো চাকরিতেই আছেন।
আমি নিজে একজন প্রকৌশলী, তাই লিখতে কষ্ট হয়: কিছু সরকারি প্রকৌশলীর কারণে সমাজে আজ ‘ইঞ্জিনিয়ার মানেই ঘুষখোর’ ধারণা তৈরি হয়েছে, যার ফলে সৎ প্রকৌশলীদেরও বদনামের ভাগ নিতে হচ্ছে। শাস্তি যে একেবারেই হয় না, তা নয়। মোহাম্মদপুরে প্রতিমন্ত্রী ফাটল দেখার পরদিনই ডিএনসিসির একজন নির্বাহী প্রকৌশলী সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন। কিন্তু শাস্তি যদি কেবল মন্ত্রীর পরিদর্শনে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে শেওড়াপাড়ার গলিতে কোন মন্ত্রী যাবেন?
ভারতে দুর্নীতি কম নয়, তবে তারা নিজেদের কাজে পেশাদার। ২০২৫ সালের এপ্রিলে মুম্বাই পৌরসভা আকস্মিক পরিদর্শনে নিম্নমানের কাজ পেয়ে সাইটের জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ারকে বরখাস্ত করেছে এবং ঠিকাদারকে ৫০ লাখ ও মান যাচাইকারী সংস্থাকে ২৫ লাখ রুপি জরিমানা করেছে। মুম্বাইও তখন প্রশাসক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছিল, তাই ‘জনপ্রতিনিধি নেই’ এই অজুহাত এখানে খাটবে না। বেঙ্গালুরুতে সদ্য পিচ করা রাস্তা কাটার কারণে এয়ারটেলকে ৬৮ লাখ রুপি গুনতে হয়েছে, আর এলাকার প্রকৌশলী নিজেই থানায় অভিযোগ করেছেন। কারণ চুক্তিতে শর্ত ছিল, ১২ মাসের মধ্যে পিচ করা রাস্তা আর খোঁড়া যাবে না।
লন্ডনে ২০১২ সাল থেকে ব্যস্ত সময়ে ব্যস্ত রাস্তা খুঁড়ে রাখলে দিনে সর্বোচ্চ আড়াই হাজার পাউন্ড ‘লেন ভাড়া’ দিতে হয়। এর ফলে পরিকল্পিত ইউটিলিটি কাজে গুরুতর যানজট ৫৫ শতাংশ কমেছে। রাস্তা যখন বিনামূল্যে পাওয়া জিনিস থাকে না, তখন কেউ তা আট মাস দখল করে রাখে না। তারাও নিখুঁত নয়, তবে সেখানে দায় একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর বর্তায়। আমাদের ক্ষেত্রে দায় পড়ে ‘সমন্বয়হীনতা’ নামের এক অদৃশ্য ভূতের ওপর।
বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের হিসাব অনুযায়ী, যানজটে ঢাকায় প্রতিদিন ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়, যার ফলে বছরে ক্ষতি হয় ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর অনেক কারণের মধ্যে অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি অন্যতম। একটি গলি আট মাস অচল থাকলে যাতায়াতের সময় ও রিকশাভাড়া বাড়ে, দোকানের বিক্রি কমে এবং অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে পারে না। অথচ কোনো প্রকল্পের মূল্যায়নে এই ক্ষতি ধরা হয় না। একজন প্রকৌশলী-অর্থনীতিবিদ হিসেবে আমি মনে করি, কত মিটার পাইপ বসানো হলো তা প্রকল্পের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না; কত দিনে কাজ শেষ হলো এবং সেই সময়ে মানুষ কতটা কষ্ট পেল, সেটিও প্রকল্পের খরচের অংশ।
নতুন নীতিমালার প্রয়োজন নেই, যা আছে তা প্রয়োগ করলেই চলবে। আমার প্রস্তাবনাগুলো হলো ছয়টি:
প্রথমত, আগামী ১৫ দিনের মধ্যে দুই সিটি করপোরেশন চলমান সব খনন সাইটের তালিকা মানচিত্রসহ ওয়েবসাইটে প্রকাশ করুক: যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর নাম ও মুঠোফোন নম্বর, ঠিকাদার, চুক্তিমূল্য, শুরু ও শেষের তারিখ উল্লেখ থাকবে। প্রতিটি সাইটে একই তথ্যের সাইনবোর্ড থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি খোলা গর্তে এখনই রেলিং, পায়ে চলার পথ এবং রাতের জন্য আলো নিশ্চিত করতে হবে।
তৃতীয়ত, চুক্তি অনুযায়ী বিলম্বের জরিমানা আদায় করতে হবে। কাজ ফেলে চলে যাওয়া ঠিকাদারের চুক্তি বাতিল, জামানত বাজেয়াপ্ত ও কালোতালিকাভুক্তি করতে হবে এবং বাকি কাজ নতুন দরপত্রের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে।
চতুর্থত, অনুমোদিত সময়ের পর প্রতিটি খোলা পরিখার জন্য বাস্তবায়নকারী সংস্থা দৈনিক ‘সড়ক ভাড়া’ প্রদান করবে, যা সড়ক মেরামত তহবিলে জমা হবে।
পঞ্চমত, নতুন বা সদ্য মেরামত করা রাস্তা অন্তত ১২ মাস খোঁড়া নিষিদ্ধ করতে হবে। একনেকের তিন বছরের গ্যারান্টি সিটি করপোরেশনের গলির ড্রেন-রাস্তার চুক্তিতেও যুক্ত করতে হবে। তিন বছরের কম পুরোনো পাইপ পুনরায় খোঁড়ার প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন কারিগরি পর্যালোচনা বুয়েটকে দিয়ে করিয়ে তা প্রকাশ করতে হবে।
ষষ্ঠত, প্রকৌশলীদের মূল্যায়ন ও পদোন্নতি সময়মতো এবং মানসম্মত কাজের সাথে যুক্ত করতে হবে। দীর্ঘ মেয়াদে মাটির নিচের সব ইউটিলিটির ডিজিটাল মানচিত্র এবং সব সংস্থার সমন্বিত খনন পরিকল্পনা প্রয়োজন। বড় প্রকল্পে বেসরকারি খাতের অভিজ্ঞ প্রকল্প ব্যবস্থাপকদের প্রকল্প পরিচালক করার কথা আমি অনেক দিন ধরে বলছি; সময়মতো কাজ শেষ করা ছাড়া যাঁদের টিকে থাকার উপায় নেই, তাঁদের অভিজ্ঞতা রাষ্ট্রের কাজে লাগানো দরকার।
দুই মাসের একটি কাজ নিয়ে কীভাবে বছর পার করা যায়, ঢাকার মানুষ তা প্রতিদিন দেখছেন—কেউ শেওড়াপাড়ায়, কেউ খিলগাঁওয়ে, আবার কেউ মোহাম্মদপুরে। উন্নয়ন মানে শুধু খোঁড়া নয়, সময়মতো কাজ বুঝিয়ে দেওয়াও উন্নয়নের অংশ।
যে বয়স্ক মানুষটি আজ মাথা নিচু করে পাইপের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন, তাঁর কাছে উন্নয়নের মানে একটাই: নিরাপদে বাসায় ফেরা। সেই ন্যূনতম নিশ্চয়তা দিতে না পারলে দুই সিটি করপোরেশনের প্রকল্পের নাম মেগা হলেও কাজ থেকে যাবে মাইক্রো।
সুবাইল বিন আলম
প্রকৌশলী-অর্থনীতিবিদ, টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক লেখক।
মতামত লেখকের নিজস্ব।