পায়রা বন্দরে বিদেশি জাহাজের আসা ক্রমাগত কমছে, যা বন্দর কর্তৃপক্ষের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিন বছর আগে ২০২২–২৩ অর্থবছরে এই বন্দরে মোট ১১১টি বিদেশি জাহাজ ভিজিট করেছিল। তার পরবর্তী অর্থবছরে এই সংখ্যা বেড়ে ১২৩টিতে উঠলেও, এরপর থেকেই নিম্নমুখী হতে শুরু করে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদেশি জাহাজের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৮৫টিতে। আর সর্বশেষ ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এই বন্দরে বিদেশি জাহাজের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়ে মাত্র ২৯টিতে নেমে এসেছে।
রোববার নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির এক বৈঠকে পেশ করা প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
প্রতিবেদনে বন্দরটির বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা, নাব্যতার সংকট, শুল্কায়ন প্রক্রিয়ার জটিলতা এবং সড়ক যোগাযোগের প্রতিবন্ধকতাকে এই পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, প্রতিবেদনে পায়রা বন্দরের নির্দিষ্ট কিছু সীমাবদ্ধতার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো রাবনাবাদ চ্যানেলের পলিপ্রবণতা। প্রতিবেদনে বলা হয়, “রাবনাবাদ চ্যানেলটি অত্যন্ত পলিপ্রবণ হওয়ায় চ্যানেলের নাব্য বজায় রাখা এবং নিরাপদ নৌযান চলাচল নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।”
পণ্য ছাড়করণের জটিলতার বিষয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই প্রক্রিয়াটি কেবল বন্দর কর্তৃপক্ষের ওপর নির্ভরশীল নয়; বরং এটি কাস্টম হাউস, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং বিভিন্ন শিপিং লাইনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বর্তমানে পায়রা বন্দর ব্যবহারকারীদের এই যাবতীয় কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হলে বরিশাল ও খুলনা কাস্টম হাউসের ওপর নির্ভর করতে হয়। তাই বন্দর ব্যবহারকারীদের আরও বেশি আকৃষ্ট করতে পায়রা বন্দর সংলগ্ন এলাকায় একটি পূর্ণাঙ্গ কাস্টম হাউস স্থাপন করা জরুরি বলে সুপারিশ করা হয়েছে।
সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রতিবন্ধকতার বিষয়টিও প্রতিবেদনে গুরুত্ব পেয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ভাঙ্গা থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত সড়কের একটি বড় অংশ এখনো দুই লেনবিশিষ্ট থাকায় পায়রা বন্দরের সঙ্গে নির্বিঘ্ন সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হচ্ছে। যদিও সড়কটি চার লেনে উন্নীতকরণের বিষয়টি ইতিমধ্যে একনেকে অনুমোদিত হয়েছে, তবে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এছাড়া ঢাকা-পায়রা রুটে মোট ছয়টি স্থানে টোল আদায় করা হয়, যার ফলে পণ্য পরিবহনের সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিস্থিতি পায়রা বন্দরের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে জানানো হয়েছে।
বৈঠক শেষে সংসদ সচিবালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ বিভিন্ন অধিদপ্তর, পরিদপ্তর, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের প্রধানেরা তাদের প্রতিষ্ঠানের সার্বিক কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন। এ সময় কমিটির পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয় যে, “কাজ যে যারাই করুক না কেন, প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। সতর্কতার সঙ্গে কাজ সম্পন্ন করতে হবে। একই সঙ্গে দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে।”
বৈঠকে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং রপ্তানি পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যে রপ্তানি বাণিজ্যের বিদ্যমান ব্যবধান, সম্ভাবনা এবং তা সম্প্রসারণের বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পায়। এছাড়া ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থলবন্দরের বিদ্যমান বাণিজ্য-সম্পর্কিত চুক্তিগুলোর বিস্তারিত তথ্য পরবর্তী বৈঠকে উপস্থাপনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, বৈঠকে স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, দেশে বর্তমানে ১৭টি স্থলবন্দরের কার্যক্রম চালু রয়েছে। এসব স্থলবন্দরের মাধ্যমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ কোটি ৫২ লাখ ৮৬ হাজার ৬০৬ টন পণ্য আমদানি এবং ১২ লাখ ৭২ হাজার ৩২৮ টন পণ্য রপ্তানি করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৬৪ লাখ ১২ হাজার ৫৪৭ টন এবং রপ্তানি হয়েছে ৯ লাখ ৬৫ হাজার ১৮৯ মেট্রিক টন। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আমদানি হয়েছে ৩৯ লাখ ৮৬ হাজার ২২৩ টন এবং রপ্তানি হয়েছে ৩ লাখ ১৫ হাজার ৩৩৮ টন পণ্য।
জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত এই কমিটির বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন জয়নুল আবদিন ফারুক। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান এবং কমিটির সদস্য মো. হাফিজ ইব্রাহিম, আনিছুর রহমান, সাঈদ আহমেদ, সানজিদা ইয়াসমিন, মো. নাজমুল হুদা ও আবদুল হান্নান মাসউদ।