ব্রিটিশ শাসনামল থেকেই ভারত ও বাংলাদেশের পণ্য বাণিজ্য এবং যাত্রী পারাপারের অন্যতম ব্যস্ত প্রাণকেন্দ্র ছিল লালমনিরহাটের ঐতিহ্যবাহী ‘মোগলহাট স্থলবন্দর’। এক সময়ের মুখরিত সীমান্ত প্রাঙ্গণজুড়ে প্রতিদিন বাজত ট্রেনের বাঁশি, থাকত ব্যবসায়ীদের কর্মব্যস্ততা। সেখানে আজ কেবলই হাহাকার। পরিত্যক্ত প্ল্যাটফর্ম, ভাঙা রেললাইন আর জীর্ণ ভবনগুলো এখন এই বন্দরের হারানো ঐতিহ্যের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তবে দীর্ঘ তিন দশকের স্তব্ধতা কাটিয়ে অবশেষে ঐতিহাসিক এই স্থলবন্দরটি নতুন করে সচলের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কিন্তু বন্দরটি চালুর বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ভারত।

নয়া দিল্লির সদিচ্ছা, গীতালদহ অংশের পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় এখন ঝুলে আছে উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান এই বাণিজ্যিক পথের ভাগ্য।

ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকেই মোগলহাট ছিল উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক রুট। ভারতের আসাম, মেঘালয় এবং পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম ছিল এই বন্দর ও সংলগ্ন রুটটি। ১৯৮৮ সালের বন্যায় ধরলা নদীর রেলসেতু ভেসে যাওয়ার পর থেকে ভারতের সাথে সরাসরি ট্রেন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং বন্দর কার্যক্রম মারাত্মক ধাক্কা খায়। সেতু ধ্বংসের পর কিছুদিন বিকল্প উপায়ে খুঁড়িয়ে চললেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে ১৯৯৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে কাস্টমস ও বন্দরের যাবতীয় কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। ১৯৯৫ সালের পরও ইমিগ্রেশন চেকপোস্ট চালু থাকায় সাধারণ যাত্রী ও পর্যটকদের যাতায়াত বজায় ছিল। কিন্তু ২০০২ সালে ইমিগ্রেশন চেকপোস্টটিও বন্ধ করে দেওয়া হলে দুই দেশের মধ্যে বৈধ বাণিজ্যিক লেনদেন এবং সাধারণ মানুষের পারাপার চিরতরে থমকে যায়।

দীর্ঘ তিন দশক ধরে বন্ধ থাকা বন্দরটি পুনরায় চালু করতে বিভিন্ন সরকারের আমলে বারবার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অতীত রেকর্ড পর্যালোচনায় দেখা যায়, তৎকালীন নৌপরিবহন মন্ত্রী, পানিসম্পদ মন্ত্রী এবং সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বিভিন্ন মেয়াদে লালমনিরহাটের এই সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেন। তৎকালীন সময়ে তারা স্থানীয় সুধী সমাজ ও সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় মোগলহাট বন্দরকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর হিসেবে ঘোষণা করা এবং ভারতীয় পক্ষের সাথে আলোচনা করে চালু করার জোরালো আশ্বাস দেন। তবে বাস্তবতা ছিল ভিন্ন—প্রতিবারই পরিদর্শন শেষে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি কাগজে-কলমে থেকে যায়।

তবে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর স্থলবন্দরটি পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেয়। সেজন্য সীমান্ত এলাকা রক্ষা, সংযোগ সড়ক আধুনিকায়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ৩০০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পের অধীনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইতোমধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি শুরু হয়েছে। মোগলহাট রেলওয়ে স্টেশন থেকে ধরলা নদীর ঘাট পর্যন্ত প্রধান সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ জোরকদমে এগিয়ে চলছে। ধরলা নদীর অব্যাহত ভাঙন থেকে বন্দর এলাকা, আবাসিক অঞ্চল ও প্রস্তাবিত কাস্টমস অবকাঠামো রক্ষায় প্রতিরোধমূলক বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সম্প্রতি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি যৌথ প্রতিনিধিদল পরিত্যক্ত এই বন্দর এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনও করেছেন। পরিদর্শনকারী প্রতিনিধিদলে উপস্থিত ছিলেন নৌপরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান এবং ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। তারা সীমান্ত অবকাঠামো, নদী ভাঙন পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ করেন।

ঢাকার পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও স্থলবন্দরটি পুনরায় চালু করার ক্ষেত্রে মূল অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে ভারতের দিক থেকে কাঙ্ক্ষিত সাড়া না পাওয়া। বাংলাদেশ সরকার কাস্টমস, ইমিগ্রেশন ও অবকাঠামোগত সংযোগ পুনর্নির্মাণে পুরোপুরি প্রস্তুত। তবে ভারতের গীতালদহ অংশের পরিকাঠামো উন্নয়ন ও দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এখনো প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও সবুজ সংকেত মেলেনি। এছাড়াও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বারংবার বিষয়টি উত্থাপন করা হলেও ভারতীয় পক্ষের সদিচ্ছার অভাবেই বিষয়টি ঝুলে রয়েছে।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান বলেছেন, “উত্তরবঙ্গের মোগলহাট স্থলবন্দরটি অত্যন্ত পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী। একসময় এ বন্দর দিয়ে মানুষের যাতায়াতের পাশাপাশি যানবাহন ও পণ্য পরিবহনও হতো। বন্দরের কার্যক্রম পুনরায় চালু করতে চায় সরকার।”

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বলেন, “বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মানজারুল মান্নানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে মোগলহাট স্থলবন্দরের ভৌত অবকাঠামো ও সার্বিক অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। পরিদর্শনের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদনও প্রস্তুত করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “বন্দরটি চালুর জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি রয়েছে। নদীর ওপারে একটি ব্রিজ, রাস্তা, ছোট একটি স্টেশন ও প্রয়োজনীয় জনবল দরকার। এগুলো তৈরিতে সরকার প্রস্তুত। তবে ভারতের সঙ্গে একটি সমঝোতা চুক্তি প্রয়োজন। ভারত তাদের অংশে কার্যক্রম শুরু না করলে বাংলাদেশের পক্ষেও বন্দর চালু করা সম্ভব হবে না। বর্তমানে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে ঢাকা।”

ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, নদী ভাঙন রোধ ও বন্দরের ভৌগোলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অর্থ বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়েছে। বাংলাদেশের অংশের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাখা হচ্ছে যেন ভারত রাজি হওয়া মাত্রই কাস্টমস চালু করা সম্ভব হয়। তিন দশকের অবহেলা কাটিয়ে বাংলাদেশ অংশ পুনর্গঠনে ৩০০ কোটি টাকার মেগা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হলেও, মোগলহাট বন্দরের ভাগ্যে নতুন সূর্য উঠবে কি না তা এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে ভারতের সীমান্ত খোলার সম্মতির ওপর।

ব্যবসায়িক সম্ভাবনা

ভারতের আসাম, মেঘালয় ও ভুটান সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর সাথে বাংলাদেশের দূরত্ব সবচেয়ে কম এই রুট দিয়ে। ফলে কাঁচামাল আমদানি ও বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে, যা থেকে সরকার প্রতিবছর শত কোটি টাকার রাজস্ব আয় করবে। বুড়িমারী স্থলবন্দরের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে এবং ব্যবসায়ী ও পরিবহন মালিকদের যাতায়াত খরচ ও সময় অর্ধেকের নিচে নেমে আসবে। বন্ধ বন্দর চালু হলে কাস্টমস ক্লিয়ারিং, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, কুলিমজুর, ট্রাক চালক-হেলপার, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও স্থানীয় ব্যবসা বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার বেকার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে যাতায়াত অত্যন্ত সহজ ও সাশ্রয়ী হবে, যা সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও চিকিৎসা প্রত্যাশীদের জন্য বিশাল স্বস্তি বয়ে আনবে।

স্থানীয় বাসিন্দা কাইমুল সরকার বলেন, “মোগলহাট স্থলবন্দর চালুর জন্য বিএনপি সরকার ধারাবাহিক চেষ্টা চালিয়ে আসছে। একই ধরনের চেষ্টার কথা বিগত অন্যান্য সরকারের আমলেও শোনা গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ অংশের রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা বা উদ্যোগ থাকলেও মূলত ওপারে ভারত সরকারের ইতিবাচক মনোভাব ও আন্তরিক সাড়া না থাকায় এত দিন পর্যন্ত স্থলবন্দরটি কোনোভাবেই চালু করা সম্ভব হয়নি।”

মোগলহাট সীমান্ত এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম (৬৫) আক্ষেপ করে বলেন, “একসময় এই বন্দরে শত শত ট্রাক ও ট্রেন চলত। চারপাশ লোকজনে জমজমাট থাকত। বন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এলাকাটি পুরোপুরি ভৌতিক জায়গায় পরিণত হয়েছে। বেকার হয়ে পড়েছেন হাজার হাজার কুলি ও খেটে খাওয়া মানুষ। সংযোগ সড়কের কাজ শুরু হলেও ভারতের বাধার কথা শুনলে মন ভেঙে যায়। ভারতের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত এলে তবেই আমাদের ভাগ্যের চাকা ঘুরবে।”

মোগলহাট ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান প্যানেল চেয়ারম্যান মো. দুলাল হোসেন বলেন, “এই অঞ্চলের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে মোগলহাট স্থলবন্দরটি পুনরায় চালুর জন্য জোরালো দাবি জানিয়ে আসছেন। বিগত দিনের সরকারগুলো বিভিন্ন সময়ে বন্দরটি চালুর নানা চেষ্টা ও প্রতিশ্রুতির কথা বলে মানুষের কাছ থেকে ভোট নিয়েছে। কিন্তু নির্বাচন শেষ হওয়ার পর বাস্তবে কেউই এটি চালুর জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করেনি।”

তিনি বলেন, “এবার নতুন সরকারের ত্রাণমন্ত্রী নিজে এসে বন্দরটি দ্রুত চালুর বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। স্থলবন্দরটি চালু হলে এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের পাশাপাশি সার্বিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্রে আমূল পরিবর্তন আসবে।”

লালমনিরহাট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. সেলিম সবুজ জানান, মোগলহাট বন্দর বন্ধ থাকায় আমাদের বুড়িমারী স্থলবন্দরের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করতে হচ্ছে, এতে পরিবহন খরচ ও সময় দুটোই বেশি লাগে। এছাড়াও একটি মাত্র মহাসড়ক থাকায় ব্যবসায়ীরা দ্রুত যাওয়া-আসা করতে পারে না। এতে খরচ অনেক বেশি। আসাম ও মেঘালয় থেকে পণ্য আমদানিতে মোগলহাট রুটটি সবচেয়ে সাশ্রয়ী। ভারত সরকার যেন দ্রুত তাদের অংশে কাজ শুরু করে, সেজন্য কূটনৈতিক চাপ জোরদার করা প্রয়োজন।

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বলেন, “মোগলহাট স্থলবন্দর পুনরায় চালু হলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে নতুন গতি সঞ্চারিত হবে। একই সঙ্গে লালমনিরহাটসহ এ অঞ্চলের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।”