মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক যন্ত্রপাতিসহ দুটি কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের লক্ষ্যে চীনের কাছ থেকে ৩৪ কোটি মার্কিন ডলার ঋণ গ্রহণ করছে বাংলাদেশ সরকার। চীনা মুদ্রায় এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৪০ কোটি আরএমবি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকার সমান।
চীনের এক্সপোর্ট–ইমপোর্ট ব্যাংক সরকারকে এই ঋণ সহায়তা প্রদান করবে। এই লক্ষ্যে গত শনিবার ব্যাংকটির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন করেছে সরকার। গতকাল সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীনে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের গৃহীত ‘মোংলা বন্দরের সুবিধাদি সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের যুগ্ম সচিব আলিয়া মেহের এবং চীন এক্সিম ব্যাংকের পক্ষে সহকারী মহাব্যবস্থাপক ফেংজুন থিয়ান চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করেন।
চীনের এই ঋণের অর্থ ব্যবহার করে মোংলা বন্দরে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ দুটি টার্মিনাল, কনটেইনার ইয়ার্ড, কনটেইনার ডেলিভারি ইয়ার্ড এবং কার্গো হ্যান্ডলিং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে, যার ফলে বন্দরের সামগ্রিক আধুনিকায়ন ঘটবে। চুক্তির শর্তানুযায়ী, চীন সরকার এই প্রকল্পের জন্য ২ শতাংশ সুদে নমনীয় ঋণ প্রদান করবে। এই ঋণের পরিশোধকাল হবে মোট ২০ বছর, যার মধ্যে প্রথম ৫ বছর গ্রেস পিরিয়ড হিসেবে গণ্য হবে।
উল্লেখ্য যে, ১৯৫০ সালে মোংলা বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়। শুরুতে খুলনা জেলার চালনা এলাকায় এর যাত্রা হলেও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতার কারণে মাত্র তিন বছরের মাথায় বন্দরটি বাগেরহাটের মোংলায় স্থানান্তরিত হয়। ‘দ্য সিটি অব লিয়নস’ নামক একটি ব্রিটিশ বাণিজ্যিক জাহাজের আগমনের মাধ্যমে মোংলা বন্দরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বর্তমানে এখানে সীমিত পরিসরে কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তবে পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর থেকে মোংলা বন্দর হয়ে পণ্য আমদানি ও রপ্তানির পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের সিংহভাগ এখনো চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। এনবিআরের হিসাব অনুযায়ী, গত ২০২৫–২৬ অর্থবছরে দেশের মোট বৈদেশিক বাণিজ্যের ৮৫ শতাংশ এই বন্দর দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। এছাড়া সমুদ্রপথে কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৯৯ শতাংশই হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে, যেখানে মোংলা বন্দরের অবদান মাত্র ১ শতাংশ।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যানুসারে, গত ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এই বন্দরে মোট ৯৮৭টি জাহাজ ভিজিট করেছে এবং ৯৯৪টি জাহাজ বন্দর ছেড়ে গিয়েছে। আসা জাহাজগুলোর মধ্যে ৪৭টি ছিল কনটেইনারবাহী, যার মাধ্যমে মোট ২৯ হাজার ৭১৪টি কনটেইনার পণ্য আমদানি ও রপ্তানি করা হয়েছে। এটি গত ২০২৪–২৫ অর্থবছরের তুলনায় ৮ হাজার ২৫৮টি কনটেইনার বেশি হ্যান্ডলিং করার সমান।
এছাড়া গত অর্থবছরে মোংলা বন্দর দিয়ে আমদানি করা ১২ হাজার ৭৫টি গাড়ি খালাস করা হয়েছে, যেখানে তার আগের অর্থবছরে এই সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৫৭৯টি। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এই বন্দর দিয়ে ৩ হাজার ৬৪৩টি আমদানি করা গাড়ি খালাস করা সম্ভব হয়েছে।