ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত সম্মান ব্যালন ডি’অর জিতেছেন হ্যারি কেইন। তবে বায়ার্ন মিউনিখের এই ইংলিশ স্ট্রাইকারের সঙ্গে কিলিয়ান এমবাপ্পের লড়াই যে এতটাই তীব্র ছিল, তা বিস্তারিত ভোটের ফলাফল প্রকাশের পর এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মাত্র ২৮ পয়েন্টের ব্যবধানে রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি তারকাকে পেছনে ফেলে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো এই পুরস্কারটি জয় করেছেন কেইন। বর্তমান ভোটদান প্রক্রিয়ায় এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কম ব্যবধানের জয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) জনপ্রিয় ফরাসি সাময়িকী ফ্রান্স ফুটবল এবারের ব্যালন ডি’অরের বিস্তারিত ভোটের ফলাফল প্রকাশ করে। সেখানে দেখা যায়, বিজয়ী হ্যারি কেইন মোট ১ হাজার ৫৫ পয়েন্ট অর্জন করেছেন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা কিলিয়ান এমবাপ্পের সংগ্রহ ১ হাজার ২৭ পয়েন্ট। আর ৮৮১ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হয়েছেন বার্সেলোনার স্প্যানিশ বিস্ময় লামিনে ইয়ামাল।
গত সোমবার (২৬ অক্টোবর) লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে ব্যালন ডি’অরের ৭০তম আসরে কেইনের নাম বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল। ২০০১ সালে মাইকেল ওয়েনের পর তিনি প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে এই অনন্য সম্মান অর্জন করলেন। তবে পুরস্কার ঘোষণার দিন ভোটের নির্দিষ্ট হিসাব প্রকাশ করা হয়নি, যার ফলে ফুটবলপ্রেমীদের মনে কৌতূহল ছিল যে এমবাপ্পেকে ঠিক কতটা ব্যবধানে পেছনে ফেলেছেন কেইন।
বিস্তারিত তথ্যে দেখা গেছে, শুধু মোট পয়েন্টেই নয়, প্রথম স্থানের ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রেও কেইন এগিয়ে ছিলেন। এবারের ব্যালন ডি’অরে বিশ্বের ১০০ জন নির্বাচিত ক্রীড়া সাংবাদিক ভোট দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ৪০ জন কেইনকে নিজেদের প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিয়েছেন। অন্যদিকে, এমবাপ্পে প্রথম স্থানের ভোট পেয়েছেন ২৩টি এবং ইয়ামালকে সেরা হিসেবে বেছে নিয়েছেন ১৩ জন সাংবাদিক।
তবে ভোট গণনার শুরু থেকেই কেইন এগিয়ে ছিলেন না। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের পর ফ্রান্স ফুটবলের প্রধান সম্পাদক ভিনসেন্ট গার্সিয়া জানিয়েছিলেন, গণনার একপর্যায়ে এমবাপ্পেই এগিয়ে ছিলেন। তবে পরবর্তীতে ব্যবধান ঘুচিয়ে জয় নিশ্চিত করেন কেইন। সেদিনই তিনি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ২০২৪ সালের রদ্রি ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের লড়াইয়ের চেয়েও এবারের ব্যবধান অনেক কম।
উল্লেখ্য, দুই বছর আগে ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অরে ১ হাজার ১৭০ পয়েন্ট পেয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন রদ্রি। দ্বিতীয় স্থানাধিকারী ভিনিসিয়ুস পেয়েছিলেন ১ হাজার ১২৯ পয়েন্ট। তাদের মধ্যকার ব্যবধান ছিল ৪১ পয়েন্ট। এবার সেই ব্যবধান আরও কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৮ পয়েন্টে। বর্তমান ভোটদান ব্যবস্থায় এত অল্প ব্যবধানে ব্যালন ডি’অর নির্ধারিত হওয়ার ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি।
এবারের ভোটে ইয়ামাল তৃতীয় হলেও কেইনের সঙ্গে তার ব্যবধান ছিল ১৭৪ পয়েন্ট। বিশ্বকাপজয়ী স্পেনের তারকা রদ্রি ৭২৬ পয়েন্ট নিয়ে চতুর্থ হয়েছেন। আর ৬১২ পয়েন্ট সংগ্রহ করে পঞ্চম স্থানে রয়েছেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী কিংবদন্তি লিওনেল মেসি।
শীর্ষ দশের বাকি পাঁচজনের মধ্যে ৫৪১ পয়েন্ট নিয়ে ষষ্ঠ হয়েছেন পিএসজির খভিচা কাভারাস্কেইয়া। সপ্তম স্থানে থাকা উসমান দেম্বেলে পেয়েছেন ৪১৮ পয়েন্ট। ৩৭৮ পয়েন্ট নিয়ে অষ্টম হয়েছেন ম্যানচেস্টার সিটির আর্লিং হলান্ড। বায়ার্নের মাইকেল ওলিসে ২৯৬ পয়েন্ট নিয়ে নবম এবং পিএসজির ফাবিয়ান রুইজ ২০১ পয়েন্ট নিয়ে দশম স্থানে অবস্থান করছেন।
অন্যদিকে, রিয়াল মাদ্রিদের জুড বেলিংহাম ১০৭ পয়েন্ট নিয়ে একাদশ হয়েছেন। মাত্র ২৬ পয়েন্ট পেয়ে ১৭তম স্থানে শেষ করেছেন ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। আর্জেন্টিনার লাউতারো মার্তিনেস ১১ পয়েন্ট পেয়ে ২২তম অবস্থানে রয়েছেন।
পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের ব্যালন ডি’অরের ভোটের হিসাবও প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে ৬১৮ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয়বারের মতো এই পুরস্কার জিতেছেন স্পেনের অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস। বার্সেলোনার হয়ে গত মৌসুমে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর চলতি মৌসুমের আগে তিনি লন্ডন সিটি লায়নেসে যোগ দিয়েছেন।
নারীদের বিভাগে পুতেয়াসের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বার্সেলোনার পোলিশ ফরোয়ার্ড এভা পায়োর। তিনি পেয়েছেন ৫৩২ পয়েন্ট, অর্থাৎ দুজনের ব্যবধান ছিল ৮৬ পয়েন্ট। নারীদের ভোটে অংশ নেওয়া ৫০ জন সাংবাদিকের মধ্যে ২৮ জন পুতেয়াসকে প্রথম স্থানে রেখেছেন এবং পায়োর প্রথম স্থানের ভোট পেয়েছেন ১২টি।
নারীদের তালিকায় তৃতীয় হয়েছেন ম্যানচেস্টার সিটির খাদিজা শ, যার সংগ্রহ ৩৪৪ পয়েন্ট। মাত্র দুই পয়েন্ট কম নিয়ে চতুর্থ হয়েছেন হাইতির মেলশি দুমোর্নে। পঞ্চম স্থানে থাকা পাত্রি গুইহারো পেয়েছেন ২২১ পয়েন্ট। এরপর যথাক্রমে ক্যারোলিন গ্রাহাম হ্যানসেন, পেরনিলে হার্ডার, ক্লদিয়া পিনা, আলেসিয়া রুসো ও তেমওয়া চাওয়িঙ্গা শীর্ষ দশ পূর্ণ করেছেন।
ব্যালন ডি’অরের নিয়ম অনুযায়ী, পুরুষদের বিভাগে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০ দেশের একজন করে নির্বাচিত সাংবাদিক ভোট দেন। নারীদের ক্ষেত্রে ভোটদাতা থাকেন শীর্ষ ৫০ দেশের ৫০ জন সাংবাদিক। প্রত্যেকে ৩০ জন মনোনীত ফুটবলারের মধ্য থেকে সেরা ১০ জন বেছে নেন। প্রথম স্থানের জন্য দেওয়া হয় ১৫ পয়েন্ট, দ্বিতীয় স্থানের জন্য ১২ এবং তৃতীয় স্থানের জন্য ১০ পয়েন্ট। এভাবে দশম স্থানের জন্য দেওয়া হয় এক পয়েন্ট।
এই জটিল ভোট গণনার মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত হয়েছে কেইন ও এমবাপ্পের ভাগ্য। মাত্র ২৮ পয়েন্টের ব্যবধানে নিজের প্রথম ব্যালন ডি’অর জয়ের স্বপ্ন পূরণ করেছেন কেইন। আর ক্যারিয়ারে প্রথমবার দ্বিতীয় স্থানে উঠলেও অল্পের জন্য ফুটবলের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিগত পুরস্কারটি অধরাই থেকে গেল এমবাপ্পের।