ব্যালন ডি’অরের ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় চূড়ান্ত লড়াইটি মূলত সীমাবদ্ধ ছিল তিন ফুটবলারের মধ্যে—হ্যারি কেইন, কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং লামিনে ইয়ামাল। পারফরম্যান্সের দিক থেকে কেউ কারও চেয়ে খুব বেশি পিছিয়ে ছিলেন না। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক থিয়েরি অঁরি এই প্রতিযোগিতার তীব্রতা বোঝাতে বারবার বলেছেন, ‘ভেরি ক্লোজ।’ অর্থাৎ লড়াইটি ছিল অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি।
তবে সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ইয়ামাল ও এমবাপ্পেকে পেছনে ফেলে ক্যারিয়ারের প্রথম ব্যালন ডি’অর জয় করে নিয়েছেন কেইন। এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে খুব বড় কোনো বিতর্ক তৈরি হয়নি। বরং অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, যোগ্য খেলোয়াড়ের হাতেই এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার পৌঁছেছে।
তবুও মনে প্রশ্ন জাগে, ইয়ামাল ও এমবাপ্পের মতো তারকাদের পেছনে ফেলে কেইন কীভাবে এই সাফল্য অর্জন করলেন?
এর উত্তর পেতে হলে তিন ফুটবলারের পুরো মৌসুমের দিকে তাকাতে হবে।
২০২৫-২৬ মৌসুমে বার্সেলোনা ও স্পেনের হয়ে মোট ৫৭ ম্যাচে ২৫টি গোল করেছেন ইয়ামাল। এছাড়া ২০টি গোল করতে সহায়তা করেছেন তিনি। তার নৈপুণ্যে বার্সেলোনা লা লিগা ও স্প্যানিশ সুপার কাপ জয় করেছে এবং স্পেন জিতেছে বিশ্বকাপ।
অন্যদিকে, এমবাপ্পে মৌসুম শেষ করেছেন ৫৮টি গোল করে। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে তার গোলের সংখ্যা ৪২টি, যার মধ্যে লা লিগায় সর্বোচ্চ ২৫টি এবং চ্যাম্পিয়নস লিগে ১৫টি। বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জেতার পাশাপাশি ২২ গোল করে তিনি হয়ে দাঁড়িয়েছেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। এছাড়া ফ্রান্সকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে গেছেন তিনি।
আর হ্যারি কেইনের পরিসংখ্যান দেখুন। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ৬৫ ম্যাচে তিনি করেছেন ৭৩টি গোল! সতীর্থদের মাধ্যমে আরও ৮টি গোল করিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ মোট ৮১টি গোলে সরাসরি অবদান রেখেছেন কেইন। এমবাপ্পের ক্ষেত্রে এই সংখ্যাটি ৭১ এবং ইয়ামালের ক্ষেত্রে ৪৫। এখানেই প্রথম বড় ব্যবধানটি পরিলক্ষিত হয়।
ফরাসি সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’ এই পুরস্কার প্রদান করে। সাময়িকীটির প্রধান সম্পাদক ভিনসেন্ট গার্সিয়া ফরাসি সংবাদমাধ্যম লেকিপকে জানিয়েছেন, কেইনের এই জয় মোটেও সহজ ছিল না। স্পেনের দুই তারকার মধ্যে ভোটের ভাগাভাগি হওয়ার কারণে সুবিধা পেয়েছেন ইংলিশ স্ট্রাইকার। গার্সিয়ার ভাষায়, ‘আমি মন থেকে বিশ্বাস করি, রদ্রি, লামিন ইয়ামাল থেকে কিছু ভোট কেড়েছেন। বিশ্বকাপজয়ী স্পেন জাতীয় দলে রদ্রি ও লামিনের মধ্যে স্পষ্ট ভোট ভাগাভাগি হয়েছে, আর এই ভাগাভাগির মাশুল তাদের বড়ভাবেই গুনতে হলো।’ অর্থাৎ মাঠে বিশ্বকাপ জিতে ইয়ামাল যা অর্জন করেছিলেন, ভোটের লড়াইয়ে তার পুরো সুফল পাওয়া সম্ভব হয়নি।
ব্যালন ডি’অরের জন্য পারফরম্যান্স বিবেচনার সময়সীমা ছিল ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত। এই নির্দিষ্ট সময়ে কেইনের মোট ৭৩টি গোলের মধ্যে ৬১টিই এসেছে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের অন্য যেকোনো ফুটবলারের চেয়ে তিনি ১৯টি গোল বেশি করেছেন। এই পরিসংখ্যানের গুরুত্ব বুঝতে হলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হবে।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগে খেলা ফুটবলারদের মধ্যে এক মৌসুমে ৭০র বেশি গোল করার বিরল কীর্তি এর আগে শুধু লিওনেল মেসির ছিল। আর সেই মৌসুমে আর্জেন্টাইন মহাতারকা ব্যালন ডি’অরও জিতেছিলেন। কেইন এবার সেই অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছেন।
শুধুমাত্র গোল নয়, শিরোপার হিসেবেও কেইন এগিয়ে। তিনি বায়ার্নকে বুন্দেসলিগা, জার্মান কাপ ও জার্মান সুপার কাপ জিতিয়েছেন। চ্যাম্পিয়নস লিগে দলকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে গেছেন, যদিও সেখানে পিএসজির কাছে হেরে বিদায় নিতে হয় বায়ার্নকে। বিপরীতে ইয়ামালের বার্সেলোনা ও এমবাপ্পের রিয়াল মাদ্রিদ বিদায় নিয়েছে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই।
ইয়ামালের সবচেয়ে বড় সাফল্য বিশ্বকাপ জয়। তবে পুরো টুর্নামেন্টে তিনি গোল করেছেন মাত্র একটি। এছাড়া মৌসুমের শেষ দিকে তিনি ইনজুরিতে পড়েছিলেন।
এমবাপ্পে বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফর্ম করলেও ফ্রান্সকে শিরোপা জেতাতে পারেননি। রিয়ালের হয়েও তিনি কোনো ট্রফি জিততে পারেননি।
কেইনের ইংল্যান্ড দল বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নিলেও ফ্রান্সকে হারিয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছে। বিশ্বকাপে ৬টি গোল করেছেন কেইন এবং ইংল্যান্ডের হয়ে পুরো মৌসুমে তার গোলের সংখ্যা ১২টি। এর মাধ্যমে তিনি বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড গড়েছেন।
সার্বিকভাবে দেখা যায়, তিনজনের মধ্যে বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ পেয়েছেন শুধু ইয়ামাল। কিন্তু পুরো মৌসুমের ধারাবাহিকতায় কেইনের পাল্লাই ছিল ভারী।
ব্যালন ডি’অর কেবল কয়েকটি অসাধারণ মুহূর্তের পুরস্কার নয়, বরং এটি পুরো মৌসুমের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি। সেই বিচারে কেইনের ৭৩ গোল, তিনটি ঘরোয়া শিরোপা এবং বিশ্বকাপ ও চ্যাম্পিয়নস লিগের সেমিফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছানো—সব মিলিয়েই বড় পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। ইয়ামালের কাছে বিশ্বকাপ আছে, এমবাপ্পের আছে গোলের রেকর্ড, কিন্তু কেইনের আছে গোল, শিরোপা এবং ধারাবাহিকতার এক অনন্য সমন্বয়। আর এই সমন্বিত সাফল্যই তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে সোনালি বলের কাছে।