অপেক্ষার প্রহর আর খুব দীর্ঘ নয়। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার (২৭ সেপ্টেম্বর) দিবাগত রাতেই চূড়ান্তভাবে জানা যাবে, ২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর পুরস্কারের মুকুট কার মাথায় বসবে। ফুটবলের এই সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত সম্মানের লড়াইয়ে এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন লামিনে ইয়ামাল, হ্যারি কেইন এবং কিলিয়ান এমবাপ্পে। তবে কে হবেন চূড়ান্ত বিজয়ী, তা নিয়ে পূর্বাভাসগুলোর মধ্যে কোনো একমত নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর বিশ্লেষণে এগিয়ে থাকলেও বার্সেলোনার ইয়ামাল, বাজির বাজারে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে বায়ার্ন মিউনিখের কেইনের। শক্ত অবস্থানে রয়েছেন রিয়াল মাদ্রিদের এমবাপ্পেও। পাশাপাশি আলোচনায় রয়েছেন আটবারের পুরস্কার বিজয়ী লিওনেল মেসিও।
আগামী সোমবার (২৬ অক্টোবর) লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ব্যালন ডি’অরের ৭০তম আসর। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ভোর ২টায় শুরু হবে এই জমকালো অনুষ্ঠান। ব্যালন ডি’অরের দীর্ঘ ইতিহাসে এবারই প্রথম লন্ডনে আয়োজন করা হচ্ছে এই বিশেষ অনুষ্ঠানটি। ১৯৫৬ সালে প্রথম ব্যালন ডি’অর জয় করেছিলেন ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথুস; তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এবারের আয়োজনের জন্য ব্রিটিশ রাজধানীকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
বিজয়ীর নাম ঘোষণার আগেই ফরাসি তথ্য বিশ্লেষণ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান এভিসিয়া (AVISIA) তাদের নিজস্ব পূর্বাভাস প্রকাশ করেছে। তাদের তৈরি মডেল অনুযায়ী, ব্যালন ডি’অর জয়ের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে ইয়ামালের। ১৯ বছর বয়সী এই স্প্যানিশ তারকার জয়ের সম্ভাবনা ধরা হয়েছে ২৩ শতাংশ।
এভিসিয়ার তালিকায় ২১ শতাংশ সম্ভাবনা নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছেন হ্যারি কেইন। তৃতীয় স্থানে থাকা এমবাপ্পের জয়ের সম্ভাবনা ১৯ শতাংশ। ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অরজয়ী রদ্রির ক্ষেত্রেও সমান সম্ভাবনা দেখানো হয়েছে। আর ১৮ শতাংশ সম্ভাবনা নিয়ে পঞ্চম স্থানে রয়েছেন মেসি। অর্থাৎ, এআই-এর হিসাব অনুযায়ী শীর্ষ পাঁচ দাবিদারের মধ্যে ব্যবধান অত্যন্ত সামান্য।
এই পূর্বাভাস তৈরির ক্ষেত্রে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান, ক্লাব ও জাতীয় দলের সাফল্য, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের উপস্থিতি এবং পূর্ববর্তী ব্যালন ডি’অর ভোটের প্রবণতা বিশ্লেষণ করেছে এভিসিয়া। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তাদের মডেলে ‘র্যান্ডম ফরেস্ট’ নামের একটি মেশিন লার্নিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।
এভিসিয়ার দাবি, গত বছর উসমান দেম্বেলের জয় এবং শীর্ষ পাঁচ খেলোয়াড়ের অবস্থানও সঠিক ক্রমে অনুমান করতে পেরেছিল তাদের এই মডেল। তবে এবারের হিসাব যে নিশ্চিত কোনো ফল নয়, সেটিও তারা স্পষ্ট করে জানিয়েছে।
এআই-এর পূর্বাভাসে ইয়ামাল এগিয়ে থাকলেও বুকমেকারদের হিসাবে চিত্রটি ভিন্ন। ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান বেট৩৬৫-এর ২৪ অক্টোবর প্রকাশিত দর অনুযায়ী, কেইনের জয়ের অডস ছিল ২/৫, যা আনুমানিক ৭১ শতাংশ সম্ভাবনার সমতুল্য। দ্বিতীয় পছন্দ হিসেবে রয়েছেন এমবাপ্পে, যার অডস ৫/২। এরপর ৫/১ অডস নিয়ে রয়েছেন ইয়ামাল। তবে অডস থেকে পাওয়া এই হার প্রকৃত জয়ের নিশ্চয়তা নয়, বরং এটি বাজির বাজারের বর্তমান অবস্থানের একটি প্রতিফলন মাত্র।
কেইনের পক্ষে সবচেয়ে বড় যুক্তি হিসেবে ধরা হচ্ছে তার অসাধারণ গোল করার সামর্থ্যকে। ২০২৫-২৬ মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে মোট ৭৩ গোল করেছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। এর মধ্যে বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে ৬১টি এবং ইংল্যান্ডের হয়ে ১২টি গোল। ২০১১-১২ মৌসুমে মেসির ৮২ গোলের পর ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের কোনো খেলোয়াড় এক মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে এত বেশি গোল করতে পারেননি।
বায়ার্নের হয়ে বুন্দেসলিগা, জার্মান কাপ ও জার্মান সুপার কাপ জিতেছেন কেইন। ২০২৬ বিশ্বকাপেও তিনি ছয় গোল করেছিলেন। তবে ইংল্যান্ড জাতীয় দলকে তৃতীয় স্থান নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে দুর্দান্ত মৌসুম কাটালেও চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা বিশ্বকাপের মতো বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেননি এই ইংলিশ ফরোয়ার্ড।
অন্যদিকে ব্যক্তিগত পরিসংখ্যানে পিছিয়ে নেই এমবাপ্পেও। গত মৌসুমে ২৫ গোল করে লা লিগার সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন এই ফরাসি তারকা। চ্যাম্পিয়নস লিগেও তার সর্বোচ্চ ১৫ গোল। ২০২৬ বিশ্বকাপে ১০ গোল করে জিতেছেন গোল্ডেন বুট। সব বিশ্বকাপ মিলিয়ে মোট ২২ গোল করে তিনি হয়ে গেছেন এই প্রতিযোগিতার ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা। তবে রিয়াল মাদ্রিদ কিংবা ফ্রান্সের হয়ে বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেননি তিনি।
ঠিক এই জায়গাতেই অন্য দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে এগিয়ে রয়েছেন ইয়ামাল। বার্সেলোনার হয়ে লা লিগা জয়ের পাশাপাশি স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী দলেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন এই তরুণ। গত ১৯ জুলাই আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয় স্পেন। ব্যক্তিগত গোলের পরিসংখ্যানে কেইন কিংবা এমবাপ্পের সমপর্যায়ে না থাকলেও, দুটি বড় শিরোপা ইয়ামালের দাবিকে অনেক বেশি শক্তিশালী করেছে।
শেষ পর্যন্ত ইয়ামাল জিতলে নতুন ইতিহাস তৈরি হবে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ব্যালন ডি’অর জিতে সবচেয়ে কম বয়সে এই পুরস্কার জয়ের রেকর্ড গড়বেন তিনি। বর্তমানে এই রেকর্ডটি ব্রাজিলের রোনালদোর দখলে। ১৯৯৭ সালে ২১ বছর বয়সে প্রথমবার ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন তিনি।
তবে আলোচনার বাইরে রাখা যাচ্ছে না মেসিকেও। ২০২৬ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা। পুরো আসরে আট গোল করার পাশাপাশি চারটি গোলে সহায়তাও করেছিলেন তিনি। এবার জিতলে নিজের রেকর্ড আরও সমৃদ্ধ করবেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা।
মেসির পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন আতলেতিকো মাদ্রিদের কোচ দিয়েগো সিমিওনে এবং ইতালির সাবেক ফুটবলার মার্কো মাতেরাজ্জিও। তাদের মতে, ক্যারিয়ারের এই পর্যায়েও মেসির পারফরম্যান্স সর্বোচ্চ স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য।
এবারের ব্যালন ডি’অরের বিজয়ী নির্ধারণ করবেন ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০ দেশের একজন করে নির্বাচিত ক্রীড়া সাংবাদিক। প্রত্যেকে ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে ১০ জনকে বেছে নিয়ে ক্রমানুসারে ভোট দেবেন। ব্যক্তিগত নৈপুণ্য, দলীয় সাফল্য এবং খেলোয়াড়সুলভ আচরণ বিবেচনায় নেওয়া হবে। ফলে এআই কিংবা বুকমেকারদের কোনো পূর্বাভাসই চূড়ান্ত ফলের নিশ্চয়তা দিচ্ছে না।
গত বছর পিএসজির হয়ে দুর্দান্ত মৌসুম কাটিয়ে ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন উসমান দেম্বেলে। এবার তার উত্তরসূরি কে হচ্ছেন— ইয়ামাল, কেইন, এমবাপ্পে নাকি চমক দেখাবেন অন্য কেউ, সেই প্রশ্নের উত্তর মিলবে আজ বাংলাদেশ সময় ভোররাতেই।