ফুটবলের রাজদণ্ড কি তবে নতুন প্রজন্মের হাতে চলে গেছে?

গত জুলাইয়ে লিওনেল মেসিকে দর্শক বানিয়ে লামিনে ইয়ামাল যখন বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরলেন, তখন অন্তত তেমনই মনে হয়েছিল। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও তখন দর্শকের কাতারে। ফুটবলের মঞ্চে যেন নতুন যুগের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। মেসি-রোনালদোর দিন ফুরিয়ে আসছে, শুরু হচ্ছে ইয়ামালদের দিন।

কিন্তু ফুটবল তো শুধু মাঠের খেলা নয়। মাঠের বাইরেও আরেকটি খেলা চলে। সেখানে গোল নেই, অ্যাসিস্ট নেই, ট্রফিও নেই। আছে ডলারের হিসাব। আর সেই খেলায় এখনো দুই বৃদ্ধ সিংহের দাপট। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মেসি-রোনালদো বুঝিয়ে দিচ্ছেন, ফুটবলের আর্থিক সাম্রাজ্যে তাঁদের সিংহাসন এত সহজে দখল করা যাবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য সাময়িকী ‘ফোর্বস’ ২০২৬ সালে বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়কারী ফুটবলারদের তালিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে যথারীতি এক নম্বরে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো, দুইয়ে লিওনেল মেসি। টানা চতুর্থ মৌসুমে এবং গত ১৩ বছরের মধ্যে ১২তমবার বিশ্বের সর্বোচ্চ আয়কারী দুই ফুটবলারের নাম রোনালদো ও মেসি।

ভাবা যায়! মাঠে নতুন প্রজন্মের দাপট যতই বাড়ুক, টাকার অঙ্কে এখনো সেই পুরোনো দ্বৈরথ। যে দ্বৈরথ একসময় বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদের মাঠ কাঁপাত, সেটিই এখন চলছে ব্যাংক হিসাব আর বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যে।

রোনালদোর আয় শুনলে চোখ কপালে উঠতে পারে। ফোর্বসের হিসাবে এ বছর তাঁর আনুমানিক আয় ৩০ কোটি ডলার। এর মধ্যে মাঠ থেকে ২৫ কোটি ডলার, মাঠের বাইরে থেকে আরও ৫ কোটি ডলার।

সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসর থেকে বেতন-বোনাস মিলিয়ে চলতি মৌসুমে আনুমানিক ২৫ কোটি ডলার পাবেন পর্তুগিজ তারকা। আর বিভিন্ন পণ্যের প্রচার ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ থেকে আসবে আরও ৫ কোটি ডলার। গত বছর তাঁর মোট আয় ছিল ২৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় বেড়েছে ২ কোটি ডলার।

রোনালদোর আর্থিক সাম্রাজ্যের বিশালত্ব বোঝাতে আরেকটি তথ্যই যথেষ্ট। চলতি বছরের শুরুতে প্রথম সক্রিয় ক্রীড়াবিদ হিসেবে ক্যারিয়ারে করের হিসাব বাদ দিয়ে মোট ২০০ কোটি ডলার আয়ের মাইলফলক পেরিয়েছেন তিনি।

একসময় রোনালদোর পরিচয় ছিল দুর্দান্ত এক গোলমেশিন। এখন তিনি নিজেই যেন একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। তাঁর ‘সিআর সেভেন’ ব্র্যান্ডের অধীনে বিভিন্ন পণ্য ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ রয়েছে। ফুটবল মাঠে গোল করার পাশাপাশি ব্যবসার মাঠেও যে তিনি সমান দক্ষ, সেটি আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না।

মেসির গল্পটা একটু অন্য রকম।

আর্জেন্টাইন মহাতারকা রোনালদোর মতো নিজের নামকে কেন্দ্র করে বিশাল ব্র্যান্ড গড়ে তোলার চেয়ে বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক আর ব্যবসায়িক বিনিয়োগে বেশি মনোযোগ দিয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ক্লাবের মালিকানায় বিনিয়োগের উদ্যোগ।

ফোর্বসের হিসাবে এ বছর মেসির আনুমানিক আয় ১৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ইন্টার মায়ামিতে খেলে পাবেন প্রায় ৭ কোটি ডলার। আর মাঠের বাইরে থেকে আয় করবেন সাড়ে সাত কোটি ডলার। অর্থাৎ মেসির ক্ষেত্রে মাঠের বাইরের আয় মাঠের আয়ের চেয়েও বেশি!

গত বছর তাঁর আয় ছিল ১৩ কোটি ডলার। এবার বেড়েছে দেড় কোটি ডলার। রোনালদোর মতো মেসিও এগিয়ে যাচ্ছেন ক্যারিয়ারে ২০০ কোটি ডলার আয়ের মাইলফলকের দিকে। আগামী এক বছরের মধ্যেই সেটি ছুঁয়ে ফেলতে পারেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা।

দুই কিংবদন্তির ব্যবসায়িক দর্শন আলাদা। একজন নিজের নামকেই বানিয়েছেন ব্র্যান্ড, অন্যজন বড় বড় ব্র্যান্ডের সঙ্গে সম্পর্ক আর বিনিয়োগকে করেছেন আয়ের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু ফলাফল প্রায় একই। ফুটবলের অর্থনীতিতে এখনো তাঁদের দাপটই সবচেয়ে বেশি।

ফোর্বসের হিসাবে, সর্বোচ্চ আয়কারী ১০ ফুটবলারের এ বছরের সম্মিলিত আয় প্রায় ৯৪ কোটি ২০ লাখ ডলার। এর মধ্যে শুধু রোনালদো ও মেসির আয়ই ৪৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। অর্থাৎ শীর্ষ দশের মোট আয়ের প্রায় অর্ধেক এই দুজনের পকেটে যাচ্ছে!

গত বছর শীর্ষ দশের সম্মিলিত আয় ছিল ৯৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার। এবার তা সামান্য কমেছে। তবে তালিকায় থাকা বেশির ভাগ ফুটবলারের ব্যক্তিগত আয় বেড়েছে।

তারপরও শীর্ষ দশের সম্মিলিত আয় কিছুটা কমার কারণ গত বছর শীর্ষ দশে থাকা ফ্রান্সের সাবেক স্ট্রাইকার করিম বেনজেমা এবার বাদ পড়েছেন। গত বছর তাঁর আয় ছিল ১০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের মতো। তবে আল হিলালের সঙ্গে চুক্তি বাতিলের পর বেনজেমা এখন ফ্রি এজেন্ট। তাঁর জায়গায় ৯ নম্বরে উঠে এসেছেন বায়ার্ন মিউনিখের ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন।

এই রাজত্বে অবশ্য নতুন প্রজন্মের পদধ্বনিও শোনা যাচ্ছে। সবচেয়ে জোরে কড়া নাড়ছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে।

রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি তারকা এক ধাপ এগিয়ে এবার উঠে এসেছেন তিন নম্বরে। তাঁর আনুমানিক আয় ১০ কোটি ডলার। এর মধ্যে মাঠ থেকে ৭ কোটি এবং মাঠের বাইরে থেকে ৩ কোটি ডলার। গত বছরের তুলনায় আয় বেড়েছে ৫০ লাখ ডলার।

মেসি-রোনালদোর আর্থিক সাম্রাজ্যে যে কখনো হানা দেওয়া যায় না, তা কিন্তু নয়। ২০২২ সালেই সেটি দেখিয়েছিলেন এমবাপ্পে। পিএসজির সঙ্গে চুক্তি নবায়নের সময় বিশাল অঙ্কের সাইনিং বোনাস পেয়ে সেবার সর্বোচ্চ আয়কারী ফুটবলার হয়েছিলেন তিনি। তবে সেই সিংহাসন ধরে রাখতে পারেননি।

এমবাপ্পের ঠিক পেছনেই ম্যানচেস্টার সিটির আর্লিং হলান্ড। নরওয়ের এই গোলমেশিনের আনুমানিক আয় ৮ কোটি ৫০ লাখ ডলার। ক্লাবের বেতন-বোনাস থেকে ৬ কোটি এবং মাঠের বাইরের বিভিন্ন খাত থেকে আড়াই কোটি ডলার।

পাঁচ নম্বরে রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাজিলিয়ান তারকা ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তাঁর আনুমানিক আয় ৭ কোটি ৬০ লাখ ডলার।

এমবাপ্পে, হলান্ড ও ভিনিসিয়ুসের মধ্যে একটা মিল আছে। তিনজনেরই বয়স ২৬ কিংবা ২৭ বছর। ফুটবলের সেরা সময়টা তাঁদের সামনে পড়ে আছে। মাঠের পারফরম্যান্সের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাণিজ্যিক মূল্যও। মেসি-রোনালদোর কাছ থেকে আয়ের ব্যাটন নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার দৌড়ে আপাতত এগিয়ে এই তিনজন।

তবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় দাবিদার সম্ভবত এমন একজন, যাঁর বয়স এখনো ২০ বছরও হয়নি।লামিনে ইয়ামাল!

বার্সেলোনার এই বিস্ময়বালক মাঠে যত দ্রুত প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙছেন, মাঠের বাইরেও তত দ্রুত এগোচ্ছেন বাণিজ্যিক সাম্রাজ্য গড়ার পথে। আমেরিকান ঈগল, কোকা-কোলা ও ম্যাকডোনাল্ডসের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন স্পনসরশিপ চুক্তি করেছেন তিনি।

ফোর্বসের হিসাবে, চলতি মৌসুমে ইয়ামালের আনুমানিক আয় ৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার। সর্বোচ্চ আয়কারী ফুটবলারদের তালিকায় তিনি ছয় নম্বরে। গত বছর তাঁর আয় ছিল ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে আয় বেড়েছে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার।

বয়সের তুলনায় এই অঙ্ক অবিশ্বাস্যই বলতে হবে। যে বয়সে অনেক ফুটবলার মূল দলে জায়গা পাওয়ার স্বপ্ন দেখেন, সেই বয়সেই ইয়ামাল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আয় করা ফুটবলারদের একজন।

তবে সব হিসাবের শেষে আবার ফিরে আসতে হয় সেই মেসি-রোনালদোর কাছেই।একসময় তাঁদের লড়াই ছিল কে বেশি গোল করবেন, কে বেশি ব্যালন ডি’অর জিতবেন, কে হবেন সর্বকালের সেরা। এখন সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেকটাই সরে এসেছে মাঠের বাইরে। কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা কমেনি।

ওদিকে ইয়ামাল, এমবাপ্পে, হলান্ডরা অপেক্ষায় আছেন। মাঠের রাজত্বের পাশাপাশি আর্থিক সাম্রাজ্যটাও নিজেদের করে নিতে চান তাঁরা।

ফুটবলে প্রজন্মের পালাবদল হয়তো শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু টাকার খেলায় মেসি-রোনালদোর যুগ এখনো শেষ হয়নি।

মাঠের সিংহাসনে নতুন রাজা আসতে পারেন। কিন্তু সাম্রাজ্যের কোষাগারের চাবি এখনো দুই পুরোনো সম্রাটের হাতেই।