ইংলিশ ফুটবলের দীর্ঘ ২৫ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষা কি এবার শেষ হতে যাচ্ছে? সেই সুযোগ এখন সামনে দাঁড়িয়েছে হ্যারি কেইনের। তবে এই লড়াই মোটেও সহজ হবে না। একদিকে বার্সেলোনার বিস্ময়কর তরুণ লামিনে ইয়ামাল, অন্যদিকে রিয়াল মাদ্রিদের গোলমেশিন কিলিয়ান এমবাপ্পে। এই তিন তারকার লড়াইয়ে শেষ হাসি কে হাসবেন, তার উত্তর মিলবে আজ রাতে লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে। সেখানেই ঘোষণা করা হবে এবারের বর্ষসেরা ফুটবলারের নাম। বাংলাদেশ সময় রাত ২টায় শুরু হবে মূল অনুষ্ঠান। ব্যালন ডি’অর পুরস্কারের ৭০ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম লন্ডনে এই আয়োজন করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, ১৯৫৬ সালে প্রথম এই পুরস্কারটি জিতেছিলেন সাবেক ইংলিশ উইঙ্গার স্ট্যানলি ম্যাথুস।
শেষ মুহূর্তের হিসাব অনুযায়ী, বায়ার্ন মিউনিখের ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইনকেই পুরস্কার জয়ের ক্ষেত্রে ফেবারিট মনে করা হচ্ছে। গত মৌসুমে ক্লাব এবং জাতীয় দল মিলিয়ে মোট ৬৫ ম্যাচে অবিশ্বাস্য ৭৩টি গোল করেছেন ইংল্যান্ড অধিনায়ক। তাঁর এই গোলের বন্যায় প্রতিপক্ষ দলগুলো দিশেহারা হয়ে পড়েছিল, যার ফলে বায়ার্ন জার্মান লিগ ও কাপের শিরোপা জয় করতে সক্ষম হয়।
তবে এত সাফল্যের পরও কেইনের জয় নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। চ্যাম্পিয়নস লিগে বায়ার্ন মিউনিখ এবং যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের যাত্রা সেমিফাইনালে এসে থেমে গিয়েছিল। বড় এই দুটি প্রতিযোগিতায় ব্যর্থতা তাঁর পুরস্কার পাওয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে।
৩৩ বছর বয়সী সাবেক টটেনহাম স্ট্রাইকার এই পুরস্কারটি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা গোপন করেননি। তিনি বলেন, “এমন কিছু অর্জন করতে পারলে আমার খুব ভালো লাগবে। এটা হবে আমার ক্যারিয়ারের বিশাল এক মাইলফলক।”
পুরস্কার ঘোষণার আগে পরিবারের উৎকণ্ঠার কথা উল্লেখ করে ইংল্যান্ড অধিনায়ক বলেন, “আমার মনে হয়, আমার স্ত্রী ও পরিবার আগে থেকেই ফলটা জানতে পারলে বেশি খুশি হতো। ব্যাপারটা সবার জন্যই খুব চাপের।”
ইংল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসের চারজন খেলোয়াড় এখন পর্যন্ত ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। তাঁরা হলেন স্ট্যানলি ম্যাথুস, ববি চার্লটন, কেভিন কিগান এবং মাইকেল ওয়েন। সর্বশেষ ২০০১ সালে এই গৌরব অর্জন করেছিলেন মাইকেল ওয়েন।
বায়ার্ন কোচ ভিনসেন্ট কোম্পানি ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে কেইনের দলীয় সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক বছরগুলোয় হ্যারিকে সবচেয়ে বেশি আনন্দ দিয়েছে দলীয় ট্রফিগুলো জিততে পারা। এখন সে যদি ব্যালন ডি’অর জিতে নিজের ক্যারিয়ার কিংবা মৌসুমকে পূর্ণতা দিতে পারে, দারুণ ব্যাপার হবে। দলের জন্য যেভাবে খেলেছে, তাতে সে এই পুরস্কারের বড় দাবিদার।”
গত বছর পিএসজির উসমান দেম্বেলের পেছনে থেকে ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন লামিনে ইয়ামাল। বার্সেলোনার ১৯ বছর বয়সী এই বিস্ময়বালক একদিন এই পুরস্কার জিতবেন, বলে অনেকে বিশ্বাস করেন। তবে এবার তাঁর সামনে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইনজুরি। হ্যামস্ট্রিংয়ের চোটে ক্লাব মৌসুম আগেভাগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল ইয়ামালের। এরপর স্পেনের বিশ্বকাপজয়ী অভিযানেও তিনি নিজের সেরা ছন্দে ছিলেন না। স্পেনের সাফল্যের মূল ভিত্তি ছিল দুর্দান্ত দলীয় সমন্বয়।
তা সত্ত্বেও ইয়ামালের আত্মবিশ্বাসে কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি। গত মাসেই তিনি দাবি করেছিলেন, “আমার মতে, এমবাপ্পে ও আমি বিশ্বের সেরা দুই খেলোয়াড়। আমি সত্যিই মনে করি, বিশ্বসেরা হিসেবে হয়তো আমরা দুজনই আছি। আর এ বছর আমি যা জিতেছি, তাতে পুরস্কারটি আমারই প্রাপ্য।”
ইয়ামালের দলীয় সাফল্য থাকলেও কিলিয়ান এমবাপ্পের সম্বল ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান। গত মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদ কিংবা ফ্রান্সের হয়ে বড় কোনো শিরোপা জিততে পারেননি ২৭ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। তবে লা লিগা, চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং বিশ্বকাপ—এই তিন প্রতিযোগিতাতেই তিনি সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে তিনি একাই ১০টি গোল করেন, যার ফলে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২টিতে। এই প্রতিযোগিতার ইতিহাসে এখন তিনিই সর্বোচ্চ গোলদাতা।
নিজের এই অনন্য অর্জন নিয়ে ফরাসি তারকা এমবাপ্পে বলেন, “বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া, ফুটবল ইতিহাসের সব কিংবদন্তিকে ছাড়িয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় শীর্ষে ওঠা, এটা সত্যিই বিশেষ কিছু।”
ব্যালন ডি’অরের ভোট কাকে দেবেন, সেই প্রশ্নেও কোনো রাখঢাক করেননি এমবাপ্পে। এক শব্দেই নিজের পছন্দের কথা জানিয়ে দিয়েছেন তিনি, “নিজেকে।”
ছেলেদের ব্যালন ডি’অর নিয়ে যতটা অনিশ্চয়তা, মেয়েদের ক্ষেত্রে তেমনটি নয়। তৃতীয়বারের মতো এই পুরস্কার জয়ের সবচেয়ে বড় দাবিদার স্পেনের আলেক্সিয়া পুতেয়াস। ২০২১ ও ২০২২ সালে টানা দুবার ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন পুতেয়াস। এরপর টানা তিন বছর পুরস্কারটি জিতেছেন তাঁর স্বদেশি আইতানা বনমাতি। তবে ইনজুরিতে বিপর্যস্ত বনমাতির রাজত্ব এবার শেষ হতে যাচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতেছেন পুতেয়াস। এরপর তিনি যোগ দিয়েছেন লন্ডন সিটি লায়নেসেসে। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক বার্সেলোনা সতীর্থ পোল্যান্ডের এভা পায়োর। বার্সেলোনার সর্বশেষ চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের অভিযানে ১১টি গোল করেছেন পায়োর।
১৯৫৬ সালে ফরাসি সাময়িকী ‘ফ্রান্স ফুটবল’ ব্যালন ডি’অর পুরস্কারের সূচনা করে। প্রথম বিজয়ী ছিলেন ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথুস। বিজয়ী নির্বাচনে ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০টি দেশের একজন করে ফুটবল সাংবাদিক ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে তাঁরা নিজেদের পছন্দের সেরা ১০ ফুটবলারকে বেছে নেন।
ব্যালন ডি’অর জিতলে সরাসরি কোনো অর্থ পুরস্কার দেওয়া হয় না। তবে ক্লাব এবং বাণিজ্যিক পৃষ্ঠপোষকদের কাছ থেকে বড় অঙ্কের বোনাস পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। পাশাপাশি এতে ফুটবলারের বাজারমূল্য বহুগুণ বেড়ে যায়।