ব্যালন ডি’অর জয়ের অত্যন্ত নিকটবর্তী পর্যায়ে পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পাননি কিলিয়ান এমবাপ্পে। বায়ার্ন মিউনিখের তারকা হ্যারি কেইনের কাছে পরাজিত হয়ে দ্বিতীয় স্থানে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে রিয়াল মাদ্রিদের এই ফরাসি ফরোয়ার্ডকে। তবে এই দুই তারকার লড়াই কতটা তীব্র ও হাড্ডাহাড্ডি ছিল, তা সম্প্রতি সামনে এনেছেন ফ্রান্স ফুটবলের প্রধান সম্পাদক ভিনসেন্ট গার্সিয়া। তার দাবি অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রদ্রি ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের মধ্যে যে পয়েন্টের ব্যবধান ছিল, এবার কেইন ও এমবাপ্পের মধ্যকার ব্যবধান তার চেয়েও অনেক কম। এমনকি ভোট গণনার দীর্ঘ একটি সময় পর্যন্ত এমবাপ্পেই এগিয়ে ছিলেন।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে ব্যালন ডি’অরের ৭০তম আসরের জমকালো আয়োজনে প্রথমবারের মতো এই সম্মানজনক পুরস্কারটি জয় করেন হ্যারি কেইন। ২০০১ সালে মাইকেল ওয়েনের পর তিনি প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে এই অনন্য গৌরব অর্জন করেন। এই লড়াইয়ে দ্বিতীয় স্থানটি দখল করেন এমবাপ্পে এবং তৃতীয় স্থানে থাকেন বার্সেলোনার স্প্যানিশ বিস্ময় লামিনে ইয়ামাল।

পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর ফরাসি সংবাদমাধ্যম লেকিপের টেলিভিশন চ্যানেলে ভোটের ব্যবধান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন গার্সিয়া। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কেইন ও এমবাপ্পের মধ্যে জয়-পরাজয়ের ব্যবধান ছিল অত্যন্ত সামান্য। ভোট গণনার এক পর্যায়ে ফরাসি এই তারকা এগিয়ে থাকলেও পরবর্তীতে তাকে পেছনে ফেলে ইংল্যান্ড অধিনায়ক কেইন শিরোপাটি জিতে নেন।

ভিনসেন্ট গার্সিয়া বলেন, ‘কেইন ও এমবাপ্পের মধ্যে লড়াইটা ছিল অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি। ২০২৪ সালে রদ্রি ও ভিনিসিয়ুসের মধ্যে যে ব্যবধান ছিল, এবার তা আরও কম। তখন ব্যবধান ছিল ৪১ পয়েন্ট, সেটিও খুব কম ছিল। এমবাপ্পে দীর্ঘ সময় এগিয়ে ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেইন জয়ী হয়েছেন। এমবাপ্পে অসাধারণ একটি মৌসুম কাটিয়েছেন।’

ভোট গণনার সময়কার পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানিয়েছেন ফ্রান্স ফুটবলের প্রধান সম্পাদক। পুরো প্রক্রিয়ায় তিনি নিয়মিতভাবে ভোটের হিসাব পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তার ভাষ্যমতে, একপর্যায়ে এমবাপ্পে এগিয়ে থাকলেও ধীরে ধীরে ব্যবধান কমিয়ে আনেন কেইন। শেষ পর্যন্ত মাত্র কয়েক পয়েন্টের ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করেন এই ইংলিশ স্ট্রাইকার।

উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ব্যালন ডি’অরে ম্যানচেস্টার সিটির তৎকালীন মিডফিল্ডার রদ্রি ১ হাজার ১৭০ পয়েন্ট পেয়েছিলেন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা রিয়াল মাদ্রিদের ভিনিসিয়ুসের সংগ্রহ ছিল ১ হাজার ১২৯ পয়েন্ট। অর্থাৎ তাদের মধ্যকার ব্যবধান ছিল মাত্র ৪১ পয়েন্ট। সেবার রদ্রির কাছে হেরে ভিনিসিয়ুসের ব্যালন ডি’অর হাতছাড়া হওয়া ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

এবার সেই ৪১ পয়েন্টের চেয়েও কম ব্যবধানে পুরস্কারটি হারিয়েছেন এমবাপ্পে। তবে কেইন ঠিক কত পয়েন্টের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, আগামী শনিবার পূর্ণাঙ্গ ভোটের হিসাব প্রকাশ করা হবে, যেখানে প্রত্যেক ভোটারের পছন্দের তালিকা বিস্তারিতভাবে জানা যাবে।

এবারের ব্যালন ডি’অরের দৌড়ে এমবাপ্পে ছিলেন অন্যতম প্রধান দাবিদার। গত মৌসুমে রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে ব্যক্তিগতভাবে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পাশাপাশি ফ্রান্সের হয়েও তিনি আলো ছড়িয়েছেন। লা লিগায় ২৫ এবং চ্যাম্পিয়নস লিগে ১৫ গোল করে দুটি প্রতিযোগিতাতেই সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার গৌরব অর্জন করেন তিনি। এছাড়া ২০২৬ বিশ্বকাপে ১০ গোল করে জিতেছেন গোল্ডেন বুট। তবে ব্যক্তিগত এই সাফল্যের বিপরীতে বড় কোনো দলীয় শিরোপার অভাব ছিল তার অর্জনে।

অন্যদিকে, বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে গত মৌসুমে জার্মান বুন্দেসলিগা, জার্মান কাপ ও জার্মান সুপার কাপ জয় করেন হ্যারি কেইন। ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে তিনি মোট ৭৩টি গোল করেন। চ্যাম্পিয়নস লিগেও তার সংগ্রহ ছিল ১৪ গোল। ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থানে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও এই স্ট্রাইকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

এদিকে ব্যালন ডি’অরের লড়াইয়ে স্পেনের দুই তারকা ইয়ামাল ও রদ্রির মধ্যে ভোট ভাগ হয়ে যাওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন গার্সিয়া। তার মতে, বিশ্বকাপজয়ী স্পেনের সাফল্য কোনো নির্দিষ্ট একজনের চেয়ে দলীয় পারফরম্যান্সের ওপর বেশি নির্ভরশীল ছিল। ফলে ইয়ামাল ও রদ্রির মধ্যে ভোট বিভক্ত হয়ে যায়।

গার্সিয়া বলেন, ‘আমার মনে হয়, বিশ্বকাপজয়ী স্পেন দলের ক্ষেত্রে রদ্রি ও ইয়ামালের মধ্যে ভোট ভাগ হয়েছে। রদ্রি কিছু ভোট পেয়েছেন, যেগুলো অন্যথায় ইয়ামাল পেতে পারতেন। স্পেন মূলত দল হিসেবে অসাধারণ ছিল। তাই একজনের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সকে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে রাখা কঠিন ছিল।’

এবারের ব্যালন ডি’অরে ইয়ামাল তৃতীয় এবং রদ্রি চতুর্থ স্থান অধিকার করেছেন। বিশ্বকাপের মতো বড় শিরোপা জেতার পরও তাদের কেউই সর্বোচ্চ পুরস্কারটি পাননি। তবে গার্সিয়ার এই বিশ্লেষণটি ভোটের ফল নির্ধারণের কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা নয়।

এবারের ভোটাভুটিতে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০টি দেশের একজন করে নির্বাচিত ক্রীড়া সাংবাদিক অংশ নিয়েছেন। প্রত্যেকে ৩০ জনের সংক্ষিপ্ত তালিকা থেকে ১০ জনকে বেছে নিয়েছেন। প্রথম পছন্দের ফুটবলার ১৫ পয়েন্ট, দ্বিতীয় পছন্দের ১২ এবং তৃতীয় পছন্দের ফুটবলার ১০ পয়েন্ট পেয়েছেন। এভাবে দশম পছন্দের ফুটবলারের জন্য দেওয়া হয়েছে এক পয়েন্ট।

শেষ পর্যন্ত ইংল্যান্ডের কেইনের হাতেই উঠেছে ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার। আর নিজের প্রথম ব্যালন ডি’অরের খুব কাছে পৌঁছেও অপেক্ষা বাড়ল ২৭ বছর বয়সী এমবাপ্পের। পূর্ণাঙ্গ ভোটের হিসাব প্রকাশের পরই জানা যাবে, ঠিক কত সামান্য ব্যবধানে রিয়াল মাদ্রিদ তারকার স্বপ্নপূরণ হলো না।