২০২৬ সালের ব্যালন ডি’অর বিজয়ীদের বিস্তারিত ভোটের হিসাব প্রকাশ করেছে এই সম্মানজনক পুরস্কারের আয়োজক প্রতিষ্ঠান ‘ফ্রান্স ফুটবল’ সাময়িকী। বর্তমান ভোটদান প্রক্রিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে কম ব্যবধানে এবার এই পুরস্কারটি জিতেছেন ইংল্যান্ডের তারকা ফুটবলার হ্যারি কেইন। দ্বিতীয় স্থানে থাকা কিলিয়ান এমবাপ্পেকে মাত্র ২৮ পয়েন্টের ব্যবধানে পেছনে ফেলে শিরোপাটি নিজের করে নিয়েছেন তিনি।

২০০১ সালে মাইকেল ওয়েনের পর প্রথম ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে ব্যালন ডি’অর জয়ের গৌরব অর্জন করলেন কেইন। ১০০ জন সাংবাদিকের সমন্বয়ে গঠিত জুরিবোর্ডের মধ্যে ৪০ জন তাকে প্রথম স্থানে ভোট দিয়েছেন। সব মিলিয়ে কেইনের মোট পয়েন্ট দাঁড়িয়েছে ১,০৫৫। অন্যদিকে, ২৩ জন সাংবাদিকের কাছে প্রথম পছন্দ হওয়া কিলিয়ান এমবাপ্পের মোট পয়েন্ট ১,০২৭।

এর আগে সবচেয়ে কম ব্যবধানে ব্যালন ডি’অর জয়ের রেকর্ড ছিল ৪১ পয়েন্টের। ২০২৪ সালে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে ৪১ পয়েন্ট ব্যবধানে হারিয়ে রদ্রি এই পুরস্কার জিতেছিলেন।

গত বছর পিএসজির ফরাসি তারকা উসমান দেম্বেলে ১,৩৮০ পয়েন্ট নিয়ে ব্যালন ডি’অর জয় করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ৩২১ পয়েন্টের ব্যবধানে পিছিয়ে দ্বিতীয় হয়েছিলেন বার্সেলোনার স্প্যানিশ তারকা লামিনে ইয়ামাল। গত জুলাইয়ে বিশ্বকাপজয়ী ইয়ামাল এবার ৮৮১ পয়েন্ট পেয়ে তৃতীয় স্থান অধিকার করেন। কেইনের চেয়ে ১৭৪ পয়েন্ট কম পাওয়া ইয়ামাল ১৩ জন সাংবাদিকের ভোটে প্রথম স্থান পান। তাঁর ক্লাব ও জাতীয় দল সতীর্থ রদ্রি ৭২৬ পয়েন্ট এবং ১০টি প্রথম স্থানসূচক ভোট পেয়ে চতুর্থ হয়েছেন।

পুরস্কারটি প্রদানের ক্ষেত্রে ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের পুরুষ বিভাগে শীর্ষ ১০০টি এবং নারী বিভাগে শীর্ষ ৫০টি দেশের প্রতিনিধিত্বকারী সাংবাদিকদের (প্রতি দেশ থেকে একজন করে) ভোটের ওপর ভিত্তি করা হয়। ২০২২ সালে বর্তমান এই পদ্ধতি চালু করা হয় এবং নিয়ম পরিবর্তনের মাধ্যমে সে বছরের পর থেকে ক্যালেন্ডার ইয়ার বা বর্ষপঞ্জির বদলে মৌসুমের পারফরম্যান্সকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ফরাসি সংবাদমাধ্যম ‘লেকিপ’ জানিয়েছে, ব্যালন ডি’অরের ৭০ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে চতুর্থ সর্বনিম্ন ভোট ব্যবধানে এবার পুরস্কারটি জিতেছেন কেইন। ২০১৯ সালে লিওনেল মেসি মাত্র ৭ পয়েন্ট ব্যবধানে ভার্জিল ফন ডাইককে হারানোর পর এটাই সবচেয়ে কম ব্যবধানের জয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

পয়েন্ট পদ্ধতি অনুযায়ী, সাংবাদিকদের ভোটে প্রথম স্থান অধিকারকারী ১৫ পয়েন্ট, দ্বিতীয় ১২ পয়েন্ট এবং তৃতীয় স্থান অধিকারকারী ১০ পয়েন্ট পান। এরপর শীর্ষ দশে থাকা বাকিদের জন্য যথাক্রমে ৮, ৭, ৫, ৪, ৩, ২ এবং ১ পয়েন্ট বরাদ্দ থাকে।

নারী বিভাগে সাবেক বার্সেলোনা সতীর্থ ইভা পাযোরকে (৫৩২ পয়েন্ট) ৮৬ পয়েন্টের ব্যবধানে হারিয়ে নিজের তৃতীয় ব্যালন ডি’অর জিতেছেন আলেক্সিয়া পুতেয়াস (৬১৮ পয়েন্ট)। বর্তমানে লন্ডন সিটি লায়নেসেস ক্লাবে খেলা পুতেয়াস ৫০ জন বিচারকের মধ্যে ২৮ জনের কাছে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ৩৪৪ পয়েন্ট নিয়ে তৃতীয় হন ম্যানচেস্টার সিটির ফরোয়ার্ড খাদিজা শ।

ফিফা র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ১০০ দেশের ভোটারদের মধ্যে মাত্র দুটি দেশের প্রতিনিধি কেইনকে সেরা দশের তালিকায় রাখেননি; দেশ দুটি হলো মেক্সিকো ও আইভরি কোস্ট। এমবাপ্পেকে সেরা দশের বাইরে রেখেছেন তিনটি দেশের ভোটাররা—গ্রিস, স্কটল্যান্ড ও ইউক্রেন। অন্যদিকে বেলারুশ, ক্যামেরুন, ক্রোয়েশিয়া ও গ্রিস—এই চার দেশ তাদের সেরা দশের তালিকা থেকে ইয়ামালকে বাদ দিয়েছে।

রদ্রি ১০টি দেশের ভোটারের কাছ থেকে প্রথম স্থানসূচক ভোট পেয়েছেন। দেশগুলো হলো নাইজেরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, গুয়াতেমালা, দক্ষিণ কোরিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, সার্বিয়া, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ক্রোয়েশিয়া ও আইসল্যান্ড। ব্যালন ডি’অর ভোট তালিকায় দশম স্থানে থাকা স্পেনের ফাবিয়ান রুইজকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নিয়েছেন গ্যাবন, পেরু, সিরিয়া ও ইউক্রেনের ভোটাররা।

পঞ্চম স্থান অধিকারী লিওনেল মেসি ব্রাজিলসহ মোট ছয়টি দেশ থেকে প্রথম স্থানসূচক ভোট পেয়েছেন। অন্য দেশগুলো হলো আর্জেন্টিনা, পানামা, বেলারুশ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও চীন। উল্লেখ্য, মাও সেতুংকে নিয়ে রসিকতাসূচক মন্তব্য করে চীনের বিরাগভাজন হয়েছেন এমবাপ্পে। রিয়াল তারকাকে ভোটের তালিকায় পাঁচে রেখেছেন চীনের প্রতিনিধি।

বিশ্বকাপে এমবাপ্পের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়ানো প্যারাগুয়ের প্রতিনিধি তাঁকে ভোটে তৃতীয় স্থানে রেখেছেন। তবে আফ্রিকার ২০টি দেশের মধ্যে ৯টি দেশের প্রতিনিধিই এমবাপ্পেকে প্রথম স্থানসূচক ভোট দিয়েছেন।

গত বছর ব্যালন ডি’অর জয়ী ফরাসি তারকা উসমান দেম্বেলেকে এবার কোনো দেশের প্রতিনিধি প্রথম স্থানসূচক ভোট দেননি। তবে সপ্তম হওয়া পিএসজি তারকা সাতটি দেশের (বুরকিনা ফাসো, চীন, ফ্রান্স, জর্জিয়া, হাইতি, উত্তর মেসিডোনিয়া ও নাইজেরিয়া) ভোটারদের কাছ থেকে দ্বিতীয় স্থানসূচক ভোট পেয়েছেন।

আর্লিং হলান্ডকেও কোনো দেশের প্রতিনিধি প্রথম স্থানসূচক ভোট দেননি। তবে ক্রোয়েশিয়া, উত্তর আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ের প্রতিনিধির কাছে তিনি দ্বিতীয় স্থানসূচক ভোট পেয়েছেন। ভোট নিয়ে আরেকটি কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য হলো, ফরাসি তারকা মাইকেল ওলিসে মাত্র একটি দেশের প্রতিনিধির কাছ থেকে প্রথম স্থানসূচক ভোট পেয়েছেন, আর সেই দেশটি হলো কুরাসাও।