টানা আটটি ম্যাচে জয়ের দেখা পায়নি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। প্রিমিয়ার লিগের আট ম্যাচে মাত্র সাত পয়েন্ট সংগ্রহ করে বর্তমানে ১৬তম স্থানে রয়েছে দলটি। নিজেদের মাঠের লড়াইয়ে বোর্নমাউথের কাছে ৩-০ গোলে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হওয়ার পর মাইকেল ক্যারিকের চাকরি যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল বলে মনে করা হচ্ছিল। তবে শেষ মুহূর্তে কোচ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়নি ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ। ক্লাবের শীর্ষ কর্মকর্তাদের এক বিশেষ বৈঠকের পর আপাতত পরিস্থিতি কাটিয়ে ওঠার জন্য ক্যারিককে আরও কিছু সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে আগামী শনিবার চেলসির বিপক্ষে ম্যাচেও ডাগআউটে দেখা যাবে এই ইংলিশ কোচকে।

মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম এবং প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ইউনাইটেডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে ক্যারিকের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ক্যারিংটন অনুশীলন কেন্দ্রে এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নেন ক্লাবের প্রধান নির্বাহী ওমর বেরাদা এবং ফুটবল পরিচালক জেসন উইলকক্স। আলোচনার পর তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোচ পরিবর্তন না করে ক্যারিক ও তার খেলোয়াড়দের এই সংকটময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

গত রোববার ওল্ড ট্রাফোর্ডে বোর্নমাউথের কাছে ৩-০ গোলে হেরেছে ইউনাইটেড। সফরকারী দলের হয়ে রায়ান, মার্কাস টাভার্নিয়ার ও এভানিলসনের গোলে বড় জয় পায় বোর্নমাউথ। এর আগে চ্যাম্পিয়নস লিগে ইতালিয়ান ক্লাব কোমোর কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল ক্যারিকের দল। টানা দুই ম্যাচে সাতটি গোল হজম করার পর ইংলিশ এই কোচের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা চরমে পৌঁছেছিল।

চলতি মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগের প্রথম আটটি ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতে জয়লাভ করতে পেরেছে ইউনাইটেড। চারটি ম্যাচ ড্র করার পাশাপাশি তিনটি ম্যাচে তারা পরাজিত হয়েছে। মাত্র সাত পয়েন্ট নিয়ে ১৬তম স্থানে থাকা দলটি অবনমন অঞ্চলের চেয়ে মাত্র এক পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৮৬-৮৭ মৌসুমের পর প্রথম আটটি লিগ ম্যাচে এটিই ইউনাইটেডের সবচেয়ে কম পয়েন্ট সংগ্রহের রেকর্ড। সেবার প্রথম আট ম্যাচে দলটি মাত্র চার পয়েন্ট পেয়েছিল। প্রায় চার দশক পর আবারও মৌসুমের শুরুতে ইংল্যান্ডের অন্যতম সফল এই ক্লাব এমন চরম সংকটের মুখে পড়েছে।

তবে ইউনাইটেডের ব্যর্থতা কেবল প্রিমিয়ার লিগে সীমাবদ্ধ নয়। সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা আট ম্যাচে জয়ের দেখা পায়নি তারা। চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত মোট ১২টি ম্যাচের মধ্যে ছয়টিতেই পরাজিত হয়েছে ক্যারিকের দল।

এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ক্যারিককে বরখাস্ত করার বিষয়ে জোরালো আলোচনা শুরু হয়। তবে সোমবার নির্ধারিত ছুটি থাকায় মূল দলের ফুটবলাররা অনুশীলনে না এলেও ক্যারিংটনে উপস্থিত ছিলেন ইউনাইটেড কোচ। সেখানে তিনি ক্লাবের অনূর্ধ্ব-২১ দলের সঙ্গে হাল সিটির একটি প্রস্তুতি ম্যাচ পর্যবেক্ষণ করেন।

ঠিক একই সময়ে বেরাদা ও উইলকক্স ক্যারিকের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। যদিও কোচের সঙ্গে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি। সোমবার কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা না করে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যায় ক্লাব কর্তৃপক্ষ।

মঙ্গলবার সকালে আবারও স্বাভাবিক সময়ে ক্যারিংটনে হাজির হন ক্যারিক এবং তার তত্ত্বাবধানেই দলের অনুশীলন কার্যক্রম পরিচালিত হয়। প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, আগামী শনিবার চেলসির বিপক্ষে ম্যাচেও তার দায়িত্ব পালনের কথা রয়েছে।

অথচ মাত্র কয়েক মাস আগেও ইউনাইটেডের সমর্থকদের কাছে ক্যারিক ছিলেন বড় আশার আলো। গত জানুয়ারিতে রুবেন আমোরিমের বিদায়ের পর অন্তর্বর্তী কোচের দায়িত্ব পান সাবেক এই মিডফিল্ডার। দায়িত্ব নেওয়ার সময় প্রিমিয়ার লিগে সপ্তম স্থানে ছিল ইউনাইটেড। এরপর তার অধীনে শেষ ১৭ ম্যাচে ১২ জয় ও তিন ড্রয়ে মোট ৩৯ পয়েন্ট তুলে তৃতীয় স্থানে মৌসুম শেষ করে দলটি।

সেই অভাবনীয় সাফল্যের পুরস্কার হিসেবে গত মে মাসে ২০২৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী চুক্তির স্বাক্ষর করেন ক্যারিক। কিন্তু নতুন মৌসুমে আগের সেই ছন্দ ধরে রাখতে পারেনি দল। প্রিমিয়ার লিগে একের পর এক ব্যর্থতার পাশাপাশি কারাবাও কাপ থেকেও বিদায় নিয়েছে তারা। গত সেপ্টেম্বরে ব্রাইটনের কাছে ঘরের মাঠে ৩-২ গোলে হেরে প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে যায় ইউনাইটেড।

মাঠের ব্যর্থতার পাশাপাশি দলের ভেতরেও দেখা দিয়েছে অস্বস্তি। কোমোর বিপক্ষে হারের পর অধিনায়ক ব্রুনো ফার্নান্দেজ প্রকাশ্যে ক্যারিকের কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এর আগে আতলেটিকো মাদ্রিদের কাছে হারের পর ক্লাবের দলবদল নীতি এবং ফুটবল পরিচালক জেসন উইলকক্সের সমালোচনা করেছিলেন ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। যদিও পরবর্তীতে এই আর্জেন্টাইন ডিফেন্ডার তার মন্তব্যের জন্য ক্ষমা চান।

এরপর বোর্নমাউথের বিপক্ষে ম্যাচে ব্রুনো ফার্নান্দেজকে শুরুর একাদশের বাইরে রাখেন ক্যারিক। এমনকি পুরো ম্যাচেই তাকে বেঞ্চে বসিয়ে রাখা হয়। তবে ম্যাচ শেষে ইউনাইটেড কোচ দাবি করেন, অধিনায়ককে না খেলানোর সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি ফুটবলীয় কারণে নেওয়া হয়েছে।

এত ব্যর্থতার মাঝেও সমর্থকদের সমর্থন হারাননি ক্যারিক। বোর্নমাউথের কাছে হারের পর ওল্ড ট্রাফোর্ডের দর্শকদের অভিবাদন জানাতে গেলে গ্যালারি থেকে তার নাম ধরে স্লোগান দেওয়া হয়। অন্যদিকে ফুটবলার ও ক্লাব কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন সমর্থকেরা।

ম্যাচ শেষে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ক্যারিক বলেছিলেন, “পরিস্থিতিটা আমি পুরোপুরি বুঝতে পারছি। তবে নির্দিষ্ট কিছু প্রত্যাশা করছি না। স্বাভাবিকভাবেই কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। এই ক্লাবকে আমি ভালোবাসি। ক্লাবের জন্য যেটা সবচেয়ে ভালো মনে হবে, সেটাই করব।”

সমর্থকদের ভালোবাসা নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে ক্যারিক বলেন, “সত্যি বলতে, সমর্থকদের কাছ থেকে এমন প্রতিক্রিয়া আশা করিনি। সব সময় তাদের সমর্থন অনুভব করেছি। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতেও তারা যেভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন, সেটি আমার কাছে অনেক কিছু।”

এদিকে ক্যারিককে আপাতত দায়িত্বে রাখা হলেও সম্ভাব্য বিকল্প কোচদের নিয়ে আলোচনা চলছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, সাবেক নিউক্যাসল কোচ এডি হাউ এবং জার্মানির সাবেক কোচ ইউলিয়ান নাগেলসমান ইউনাইটেডের বিবেচনায় রয়েছেন। তাদের পাশাপাশি আলোচনায় আছে আন্তোনিও কন্তের নামও।

তবে ক্যারিককে ঠিক কত দিনের জন্য সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। তাকে দীর্ঘমেয়াদে দায়িত্বে রাখার বিষয়েও আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি ক্লাব কর্তৃপক্ষ।

আগামী শনিবার (৩১ অক্টোবর) স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে চেলসির মুখোমুখি হবে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শুরু হবে এই ম্যাচ। টানা আট ম্যাচের জয়খরা কাটানোর পাশাপাশি নিজের ওপর ক্লাব কর্তৃপক্ষের আস্থার প্রতিদান দেওয়ার বড় সুযোগ থাকছে ক্যারিকের সামনে। তবে চেলসির বিপক্ষেও ব্যর্থ হলে ইউনাইটেডের ডাগআউটে তার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়ে উঠতে পারে।