মানুষের সব চাওয়া কি আর পূরণ হয়! কখনো কখনো ভাগ্য এমন কিছু হাতে তুলে দেয়, যা পেয়ে হাসতে হয় ঠিকই, কিন্তু মন পড়ে থাকে অন্য কোথাও। লামিনে ইয়ামালের ক্ষেত্রেও ঠিক তেমনটাই ঘটেছে।
লন্ডনে আয়োজিত ব্যালন ডি’অরের জমকালো মঞ্চে প্রথমবার ডাক পড়ল তাঁর। হাসিমুখে মঞ্চে উঠে গেলেন বার্সেলোনার এই স্প্যানিশ উইঙ্গার। ইউক্রেনের কিংবদন্তি আন্দ্রেই শেভচেঙ্কোর হাত থেকে তিনি গ্রহণ করলেন কোপা ট্রফি, যা দেওয়া হয় অনূর্ধ্ব ২১ বছর বয়সী সেরা ফুটবলারকে। টানা তৃতীয়বারের মতো এই সম্মাননা জিতলেন তিনি।
তবে ১৯ বছর বয়সী ইয়ামালের দৃষ্টি ছিল অন্য একটি ট্রফির দিকে। পুরো হলরুমে তখন ‘ব্যালন ডি’অর! ব্যালন ডি’অর!’ স্লোগান প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। ইয়ামালের এই মানসিক অবস্থা লক্ষ্য করে ফরাসি কিংবদন্তি এবং অনুষ্ঠানের সঞ্চালক থিয়েরি অঁরি কিছুটা রসিকতা করার সুযোগ নিলেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘এ নিয়ে তিনটি হলো, তাই না? কিন্তু এটাই কি সেই ট্রফিটি, যা তুমি খুব করে জিততে চাও?’ ইয়ামাল তাঁর হাসি চেপে রাখতে পারলেন না। মাথাটি সামান্য নিচু করে এক শব্দে উত্তর দিলেন, ‘না।’
উত্তরটি ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে থাকা স্বপ্নটি ছিল অত্যন্ত বিশাল।
চলতি বছর ব্যালন ডি’অর জয়ের অন্যতম ফেভারিট হিসেবে বিবেচিত হয়েছিলেন ইয়ামাল। সেই অনুযায়ী আগাম প্রস্তুতিও নিয়ে রেখেছিলেন তিনি। লন্ডনের এই অনুষ্ঠানে তাঁর ঘনিষ্ঠজনদেরও আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। শোনা যাচ্ছে, পুরস্কার জিতলে কীভাবে উদ্যাপন করবেন, তার একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনাও তৈরি ছিল তাঁর। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ালেন হ্যারি কেইন। ইংল্যান্ডের এই ফরোয়ার্ডই শেষ পর্যন্ত ব্যালন ডি’অর জয় করেন। দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং ইয়ামালের অবস্থান হয় তৃতীয় স্থানে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, ইয়ামালের পারফরম্যান্সে কোনো ঘাটতি ছিল না। ২০২৫-২৬ মৌসুমে বার্সেলোনা ও স্পেনের হয়ে ৫৭টি ম্যাচে তিনি ২৫টি গোল করেছেন এবং সতীর্থদের দিয়ে করিয়েছেন আরও ২০টি গোল। তাঁর হাত ধরে বার্সেলোনা লা লিগা জয় করেছে এবং স্পেনের হয়ে জিতেছেন বিশ্বকাপ।
মাত্র ১৯ বছর বয়সে মাঠের ফুটবল এবং অর্জনের দিক থেকে তিনি ইতিমধ্যেই বিশ্বের সেরাদের কাতারে জায়গা করে নিয়েছেন। সম্ভবত এই কারণেই কোপা ট্রফি জিতলেও তাঁর মধ্যে খুব একটা উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি। বরং বার্সেলোনার ১৯ বছর বয়সী ডিফেন্ডার পাউ কুবারসিকে মঞ্চে টেনে নিয়ে তিনি বললেন, ‘কুবারসিকে এই জায়গায় দেখলে ভালো লাগত। কারণ আমি মনে করি, এই ট্রফিটি তাঁর। বেশ কিছুদিন ধরেই সে খুব দারুণ খেলছে। আমি সব পুরস্কারই চাই। তবে এটার বিষয়ে বললে, ট্রফিটি কুবারসির প্রাপ্য ছিল।’
বার্সেলোনার রক্ষণভাগে কুবারসি যেমন নির্ভরযোগ্য, আক্রমণে ইয়ামাল ঠিক তেমনই বিস্ময়কর। একজন প্রতিপক্ষের আক্রমণ রুখে দেন, অন্যজন প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেন। এই দুই তরুণই বার্সেলোনার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।
তবে অঁরির ওই প্রশ্নটি করা সঠিক ছিল কি না, তা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্ক শুরু হয়েছে। অনেক ফুটবলপ্রেমীর কাছে প্রশ্নটি অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। একজন লিখেছেন, ‘এটা একদমই অগ্রহণযোগ্য।’ অন্য একজন মন্তব্য করেছেন, ‘থিয়েরি অঁরির জায়গা থেকে ব্যাপারটাকে খুবই অসম্মানজনক বলে মনে করি।’
অবশ্য কোপা ট্রফির সঙ্গে ইয়ামালের সম্পর্ক এখন ইতিহাসের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের পর এবারও এই পুরস্কারটি জিতলেন তিনি। ২০১৮ সালে চালু হওয়া এই পুরস্কারটি প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা তিনবার জেতার অনন্য কীর্তি গড়লেন তিনি। এই ট্রফির সঙ্গে বার্সেলোনার সম্পর্কও বেশ গভীর। এখন পর্যন্ত পাঁচবার বার্সার ফুটবলাররা এটি জিতেছেন। ২০২১ সালে পেদ্রি এবং ২০২২ সালে গাভি এটি জেতার পর ইয়ামাল এখন হ্যাটট্রিক করলেন।
কিন্তু তিনটি কোপা ট্রফিও ইয়ামালের মুখে পূর্ণ হাসি ফোটাতে পারেনি। কেইনের হাতে ব্যালন ডি’অর ট্রফিটি ওঠার পর তাঁর মুখটি কিছুটা মলিন হয়ে যায়। অঁরি নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিলেন, মঞ্চে করা প্রশ্নটির উত্তর ইয়ামাল কেন ‘না’ বলেছিলেন।
অবশ্য সামনে আরও অনেক সময় বাকি। অনূর্ধ্ব ২১ বছর বয়সীদের তালিকায় আরও দুই বছর থাকতে পারবেন ইয়ামাল। এই দুই বছরেও যদি তিনি একই রকম ফুটবল উপহার দেন, ব্যালন ডি’অর জয়ের ফেভারিট হয়ে অনুষ্ঠানে যান, আর শেষ পর্যন্ত আবারও কেবল কোপা ট্রফি নিয়েই ফিরতে হয়?
তখন হয়তো অঁরির সেই প্রশ্নটি আবারও তাঁর মনে পড়বে।