দীর্ঘ ২৫ বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে ব্যালন ডি’অর জয় করলেন ইংলিশ তারকা হ্যারি কেইন। অন্যদিকে, চার বছর পর আবারও বিশ্বসেরার স্বীকৃতি পেলেন স্পেনের অ্যালেক্সিয়া পুতেলিয়াস। ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই ব্যক্তিগত পুরস্কারের ৭০তম আসরে আলো ছড়িয়েছেন এই দুই তারকা।
লন্ডনের এক জমকালো আয়োজনে শুধু এই দুই তারকা নয়, আরও বেশ কয়েকজন ফুটবলার, কোচ এবং ক্লাব তাদের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি পেয়েছেন। সেরা তরুণ ফুটবলারের পুরস্কার জিতেছেন লামিনে ইয়ামাল এবং মানবিক কাজের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনের জন্য সম্মানিত হয়েছেন আর্সেনালের বুকায়ো সাকা। এবারের এই বর্ণিল আয়োজনে মোট ১৩টি বিভাগে পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) রাতে ইংল্যান্ডের লন্ডন প্যালাডিয়াম থিয়েটারে ব্যালন ডি’অরের ৭০তম আসর অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোরে শেষ হওয়া এই অনুষ্ঠানে পুরুষদের সেরা ফুটবলারের পুরস্কারটি জিতে নেন বায়ার্ন মিউনিখের ইংলিশ স্ট্রাইকার হ্যারি কেইন। লামিনে ইয়ামাল ও কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের পেছনে ফেলে ক্যারিয়ারে প্রথমবারের মতো এই গৌরবময় পুরস্কারটি নিজের করে নেন তিনি।
গত মৌসুমে ক্লাব এবং জাতীয় দল মিলিয়ে মোট ৭৩টি গোল করেছিলেন কেইন। বায়ার্ন মিউনিখের হয়ে তিনি বুন্দেসলিগা, জার্মান কাপ ও জার্মান সুপার কাপ জয়ের স্বাদ পান। পাশাপাশি ইংল্যান্ড জাতীয় দলকে বিশ্বকাপে তৃতীয় স্থানে নিয়ে যেতে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ ব্যালন ডি’অরের পাশাপাশি পুরুষদের সেরা স্ট্রাইকারের জন্য নির্ধারিত গার্ড মুলার ট্রফিও জিতেছেন ৩৩ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।
নারীদের বিভাগে ব্যালন ডি’অর জিতেছেন স্পেনের অ্যালেক্সিয়া পুতেলিয়াস। ২০২১ ও ২০২২ সালের পর তৃতীয়বারের মতো এই অনন্য সম্মাননা পেলেন তিনি। এর মাধ্যমে সাবেক বার্সেলোনা সতীর্থ আইতানা বনমাতির সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ তিনবার নারী ব্যালন ডি’অর জয়ের রেকর্ড গড়লেন পুতেলিয়াস। গত মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে চারটি শিরোপা জেতার পর এই মিডফিল্ডার ইংলিশ ক্লাব লন্ডন সিটি লায়নেসেসে যোগ দিয়েছেন।
বার্সেলোনার তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামাল এবার মূল ব্যালন ডি’অর জিততে না পারলেও হতাশ হতে হয়নি তাকে। টানা তৃতীয়বারের মতো পুরুষদের সেরা তরুণ ফুটবলারের কোপা ট্রফি জিতেছেন ১৯ বছর বয়সী এই স্প্যানিশ তারকা। নারীদের বিভাগে টানা দ্বিতীয়বার একই পুরস্কারটি পেয়েছেন বার্সেলোনার ভিকি লোপেজ।
সেরা গোলরক্ষকের ইয়াশিন ট্রফির দুটি পুরস্কারই এবার স্পেনের দখলে গেছে। পুরুষদের বিভাগে অ্যাথলেটিক বিলবাওয়ের উনাই সিমন এবং নারীদের বিভাগে বার্সেলোনার কাতা কোল সেরা নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে, নারীদের সেরা স্ট্রাইকারের গার্ড মুলার ট্রফি জিতেছেন মেক্সিকোর ক্লাব পাচুকায় খেলা চার্লিন কোরাল।
কোচদের পুরস্কারেও স্পেনের আধিপত্য ছিল চোখে পড়ার মতো। ২০২৬ বিশ্বকাপ জেতানো লুইস দে লা ফুয়েন্তে হয়েছেন পুরুষদের সেরা কোচ। অন্যদিকে, বার্সেলোনার নারী দলের কোচ পেরে রোমেউ জিতেছেন নারীদের সেরা কোচের পুরস্কার। গত মৌসুমে তার নির্দেশনায় চ্যাম্পিয়নস লিগ, স্প্যানিশ লিগ, কোপা দে লা রেইনা ও স্প্যানিশ সুপার কাপ জয় করেছে বার্সেলোনা। দুই বিভাগেই সেরা কোচের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে ইয়োহান ক্রুইফ ট্রফির মাধ্যমে।
সেরা ক্লাবের পুরস্কারে পুরুষদের বিভাগে টানা দ্বিতীয়বার বিজয়ী হয়েছে প্যারিস সেন্ট জার্মেই (পিএসজি)। গত মৌসুমে লিগ ওয়ান ও চ্যাম্পিয়নস লিগ জয় করা এই ফরাসি ক্লাবটি এবারও সেরা নির্বাচিত হয়েছে। নারীদের সেরা ক্লাবের পুরস্কার পেয়েছে বার্সেলোনা। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের পর গত চার বছরের মধ্যে তৃতীয়বার এই স্বীকৃতি পেল কাতালান ক্লাবটি।
মাঠের বাইরের মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য দেওয়া সক্রেটিস পুরস্কার জিতেছেন আর্সেনালের ইংলিশ উইঙ্গার বুকায়ো সাকা। দাতব্য সংস্থা বিগ শুর সঙ্গে কাজ করে নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারে সহায়তা করেছেন তিনি। এ ছাড়া অসহায় শিশুদের শিক্ষাসামগ্রী ও ফুটবল খেলার সরঞ্জাম সরবরাহ এবং বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতেও ভূমিকা রেখেছেন এই ইংলিশ তারকা।
পুরস্কারের তালিকা একনজরে:
১. পুরুষদের ব্যালন ডি’অর: হ্যারি কেইন (বায়ার্ন মিউনিখ, ইংল্যান্ড)
২. নারীদের ব্যালন ডি’অর: অ্যালেক্সিয়া পুতেলিয়াস (লন্ডন সিটি লায়নেসেস, স্পেন)
৩. পুরুষদের কোপা ট্রফি (সেরা তরুণ): লামিনে ইয়ামাল (বার্সেলোনা, স্পেন)
৪. নারীদের কোপা ট্রফি (সেরা তরুণী): ভিকি লোপেজ (বার্সেলোনা, স্পেন)
৫. পুরুষদের ইয়াশিন ট্রফি (সেরা গোলরক্ষক): উনাই সিমন (অ্যাথলেটিক বিলবাও, স্পেন)
৬. নারীদের ইয়াশিন ট্রফি (সেরা গোলরক্ষক): কাতা কোল (বার্সেলোনা, স্পেন)
৭. পুরুষদের গার্ড মুলার ট্রফি (সেরা স্ট্রাইকার): হ্যারি কেইন (বায়ার্ন মিউনিখ, ইংল্যান্ড)
৮. নারীদের গার্ড মুলার ট্রফি (সেরা স্ট্রাইকার): চার্লিন কোরাল (পাচুকা, মেক্সিকো)
৯. পুরুষদের ইয়োহান ক্রুইফ ট্রফি (সেরা কোচ): লুইস দে লা ফুয়েন্তে (স্পেন জাতীয় দল)
১০. নারীদের ইয়োহান ক্রুইফ ট্রফি (সেরা কোচ): পেরে রোমেউ (বার্সেলোনা)
১১. বর্ষসেরা পুরুষ ক্লাব: প্যারিস সেন্ট জার্মেই (ফ্রান্স)
১২. বর্ষসেরা নারী ক্লাব: বার্সেলোনা (স্পেন)
১৩. সক্রেটিস পুরস্কার (মানবিক কর্মকাণ্ড): বুকায়ো সাকা (আর্সেনাল, ইংল্যান্ড)
ব্যালন ডি’অরের ৭০ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম লন্ডনে আয়োজন করা হয় পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান। ১৯৫৬ সালে প্রথম ব্যালন ডি’অরজয়ী ইংল্যান্ডের স্ট্যানলি ম্যাথুসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই তাঁর দেশের রাজধানীকে বেছে নেওয়া হয়েছিল। আর সেই লন্ডনেই দীর্ঘ ২৫ বছর পর কোনো ইংলিশ ফুটবলারের হাতে ফিরল পুরুষদের ব্যালন ডি’অর।