চার বছর পর আবারও নারী ফুটবলের সিংহাসনে বসলেন অ্যালেক্সিয়া পুতেলিয়াস। ২০২১ ও ২০২২ সালের পর তৃতীয়বারের মতো ব্যালন ডি’অর জিতলেন স্পেনের এই তারকা। এবারের পুরস্কার জিতে সাবেক বার্সেলোনা সতীর্থ আইতানা বনমাতির রেকর্ডেও ভাগ বসিয়েছেন তিনি। নারী ফুটবলের ইতিহাসে এখন যৌথভাবে সর্বোচ্চ তিনবার করে ব্যালন ডি’অর জয়ের কীর্তি দুজনের। দীর্ঘ চোট, পুনর্বাসন ও ক্লাব পরিবর্তনের পর পুতেলিয়াসের এই অর্জন যেন আরও একটি প্রত্যাবর্তনের গল্প।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) লন্ডনের প্যালাডিয়াম থিয়েটারে ব্যালন ডি’অরের ৭০তম আসরে নারী বিভাগের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে পুতেলিয়াসের নাম ঘোষণা করা হয়। ৩২ বছর বয়সী এই মিডফিল্ডার বর্তমানে ইংলিশ ক্লাব লন্ডন সিটি লায়নেসেসের হয়ে খেলছেন। তবে এবারের পুরস্কার জয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান বার্সেলোনার জার্সিতে কাটানো তার শেষ মৌসুমের পারফরম্যান্স।

২০২৫-২৬ মৌসুমে বার্সেলোনাকে চারটি শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন পুতেলিয়াস। তার নেতৃত্বে নারী চ্যাম্পিয়নস লিগ, স্প্যানিশ লিগ, কোপা দে লা রেইনা ও স্প্যানিশ সুপার কাপ জেতে কাতালান ক্লাবটি। ব্যক্তিগত নৈপুণ্যেও ছিলেন দুর্দান্ত। গত মৌসুমে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলিয়ে ২৪ গোল করার পাশাপাশি ১৩টি গোলে সহায়তা করেন স্প্যানিশ তারকা।

বিশেষ করে চ্যাম্পিয়নস লিগে পুতেলিয়াসের পারফরম্যান্স ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রতিযোগিতার কোয়ার্টার ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। সেমিফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের বিপক্ষেও জোড়া গোল করেন। ফাইনালে লিওঁকে হারিয়ে ইউরোপসেরার মুকুট পুনরুদ্ধার করে বার্সেলোনা। পুরো আসরে অসাধারণ নৈপুণ্যের স্বীকৃতি হিসেবে চ্যাম্পিয়নস লিগের মৌসুমসেরা খেলোয়াড়ও নির্বাচিত হন পুতেলিয়াস।

অথচ চোটের কারণে একটা সময় তার ক্যারিয়ারই অনিশ্চয়তায় পড়ে গিয়েছিল। ২০২২ সালের জুলাইয়ে হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্টে (এসিএল) গুরুতর চোট পাওয়ার পর দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে ছিলেন পুতেলিয়াস। ২০২৩ সালের এপ্রিলে মাঠে ফিরলেও পুরোপুরি ছন্দে ফিরতে সময় লেগেছে। তবে সেই কঠিন সময় পেছনে ফেলে আবারও নিজের সেরা রূপে ফিরেছেন তিনি।

পুতেলিয়াসের আগের দুটি ব্যালন ডি’অর এসেছিল ২০২১ ও ২০২২ সালে। এরপর টানা তিন বছর এই পুরস্কার জেতেন তারই বার্সেলোনা সতীর্থ বনমাতি। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে নারী ফুটবলের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সম্মান নিজের করে নেন তিনি। এবার সেই ধারাবাহিকতার অবসান ঘটালেন পুতেলিয়াস। ফলে সর্বোচ্চ তিনটি করে ব্যালন ডি’অর নিয়ে দুজনই এখন যৌথভাবে শীর্ষে।

নারীদের ব্যালন ডি’অরে স্প্যানিশ ফুটবলারদের আধিপত্যও অব্যাহত থাকল। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মেগান র‍্যাপিনো এই পুরস্কার জেতার পর আর কোনো দেশের ফুটবলার এটি জিততে পারেননি। ২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। এরপর অনুষ্ঠিত ছয় আসরের সব কটিতেই বিজয়ী হয়েছেন পুতেলিয়াস কিংবা বনমাতি।

এবারের অর্জনটি পুতেলিয়াসের ক্যারিয়ারে অন্য কারণেও বিশেষ। দীর্ঘ ১৪ বছরের সম্পর্ক ছিন্ন করে গত মে মাসে বার্সেলোনা ছাড়েন তিনি। জুলাইয়ে তিন বছরের চুক্তিতে যোগ দেন ইংলিশ উইমেনস সুপার লিগের ক্লাব লন্ডন সিটি লায়নেসেসে। নতুন ক্লাবে যোগ দেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই আবারও বিশ্বসেরার স্বীকৃতি পেলেন স্প্যানিশ মিডফিল্ডার।

এর মধ্য দিয়ে ইংল্যান্ডের নারী ফুটবল লিগও প্রথমবারের মতো বর্তমানে লিগে খেলছেন, এমন একজন ব্যালন ডি’অরজয়ী পেল। যদিও পুতেলিয়াসের এবারের অর্জনের মূল ভিত্তি বার্সেলোনায় কাটানো অসাধারণ মৌসুম।

পুরস্কার গ্রহণের পর আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পুতেলিয়াস। শুরুতেই বার্সেলোনার সাবেক সতীর্থ ও কোচিং স্টাফকে ধন্যবাদ জানান তিনি। দীর্ঘ মৌসুমে একের পর এক চোট ও প্রতিকূল পরিস্থিতি সামলে দলের সাফল্য অর্জনের কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে বার্সেলোনা কোচ পেরে রোমেউর অবদানের প্রশংসা করেন স্প্যানিশ তারকা। এবারের অনুষ্ঠানে নারী ফুটবলের সেরা কোচের পুরস্কারও জিতেছেন রোমেউ।

বার্সেলোনার সমর্থকদের কথাও ভোলেননি পুতেলিয়াস। দীর্ঘ ১৪ বছরের সম্পর্কের কথা স্মরণ করে জানিয়েছেন, ক্লাবটি তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে। নিজের তৃতীয় ব্যালন ডি’অরও সাবেক ক্লাবকে উৎসর্গ করেছেন তিনি।

পুতেলিয়াসের ভাষায়, ‘এই পুরস্কার বার্সেলোনার জন্য।’

স্পেন জাতীয় দলের সতীর্থদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। গত বছর উয়েফা উইমেনস নেশনস লিগ জয়ের স্মৃতি তুলে ধরে দলের সাফল্যে সবার অবদানের কথা স্মরণ করেন। আগামী বছর ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নারী বিশ্বকাপেও ভালো করার প্রত্যাশা জানিয়েছেন স্প্যানিশ তারকা।

পুরস্কার গ্রহণের বক্তব্যে চোটের কঠিন সময়ের কথাও তুলে ধরেন পুতেলিয়াস। দীর্ঘ পুনর্বাসনপ্রক্রিয়ায় পাশে থাকার জন্য মা, বোন, বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান তিনি। তাদের সমর্থনেই আবার ফুটবল উপভোগ করার আনন্দ ফিরে পেয়েছেন বলে জানান।

বক্তব্যের শেষ দিকে বিশ্বজুড়ে ফুটবল খেলতে আগ্রহী শিশুদের উদ্দেশে বিশেষ বার্তা দেন পুতেলিয়াস। ছেলে কিংবা মেয়ে, যে-ই হোক না কেন, নিজের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। অন্যের নিরুৎসাহে থেমে না গিয়ে কঠোর পরিশ্রম, আত্মবিশ্বাস ও ভালোবাসা দিয়ে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন এই তারকা।

চোট, দীর্ঘ পুনর্বাসন আর ক্লাব পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ক্যারিয়ারের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়েছেন পুতেলিয়াস। তবে ৩২ বছর বয়সেও নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছেন স্প্যানিশ এই মিডফিল্ডার। চার বছর পর তৃতীয় ব্যালন ডি’অর জিতে নারী ফুটবলের ইতিহাসে নিজের জায়গা আরও শক্ত করলেন তিনি।